অপ্রাসঙ্গিক মনে হতে পারে, তবে লিখাটা পড়তে পড়তে চন্ডালিকার একটা গান মাথায় ঘুরছিল…
“ছুঁয়ো না ছুঁয়ো না ছিঃ,
ও যে চন্ডালিকার ঝি!”
বাংলা বইয়ের প্রকাশকদের সঙ্গে বেশ কিছু দিন কথা বলে বিস্মিত হয়েছি যে টিভি কম্পিউটার, এমপি থ্রি, ডিভিডি ইত্যাদিতে মানুষ আঠার মতো লেগে থাকার পরও, যে রকম ভাবা হয়েছিল যে বই বিক্রি কমে যাবে, মোটেও তা কমেনি। ইলেকট্রনিক বই উদয় হওয়ার পর পুস্তক প্রকাশকদের বদ্ধ ধারণা ছিল যে বই কেউ আর কিনবে না, না সেটিও হয়নি। একটি কথা খুব সত্যি, যে, ইন্টারনেট নামের জিনিসটি বই বিক্রি যেমন এক দিকে বাড়িয়েছে, তেমন কমিয়েছে। বইয়ের খোঁজে দোকানে দোকানে ঘুরে এই বই পেলাম তো ওই বই পেলাম না সমস্যার শেষ নেই, কিন্তু ইন্টারনেটের দোকানে বই খুঁজলে যে কোনও দেশের যে কোনও বইই পেয়ে যাচ্ছি, পেতে কয়েকটি ক্লিকের প্রয়োজন, কিনতেও মাত্র দু’-চারটে ক্লিক। এর পর দু’এক দিনের মধ্যেই বই একেবারে ঘরের দরজায় উপস্থিত। উপহার দেওয়ার জন্যও ব্যবস্থাটি চমৎকার। কেবল ক্লিক। রীতিমতো পছন্দের কাগজে বই মুড়িয়ে যে কথাটি লিখতে চাই, সে কথাটি জুড়ে দিয়ে বই পাঠিয়ে দেওয়া হবে যাকে উপহার দিতে চাই তার হাতে। ইন্টারনেটের দৌলতে এ ভাবেই বই বিক্রি বেড়েছে। আবার, এর কারণে বই বিক্রি কিছু কমেছেও, কারণ ইন্টারনেটেই তাবৎ তথ্য মেলে। কোনও বিষয় সম্বন্ধে জানতে আগ্রহী হলে সেই বিষয়ের ওপর লেখা বই খুঁজে সেগুলো পুরো পড়ে তথ্য সংগ্রহ করতে সময় এবং টাকা খরচ বিষম, কিন্তু ইন্টারনেটে সেই বিষয় বা তথ্য নিমেষেই পড়ে নেওয়া যায়। সময়ও বাঁচে, টাকাও বাঁচে। ঘটে বুদ্ধি থাকলে লোকে তাই করে আজকাল।
বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সব চেয়ে বড় বইয়ের দোকান এখন নেটে, আমাজন ডট কম । উনিশশো চুরানব্বই সালে দেখল, ইন্টারনেটের কাজকম্ম শতকরা দু’ হাজার দুশো হারে বাড়ছে দেখে জেফ বিজোস নামের এক ব্যবসায়ী তার পরের বছরই ইন্টারনেটে বইয়ের দোকান শুরু করলেন। আর করতে না করতেই তিনি একশো ষাটটি দেশের চেয়েও বেশি দেশের এক কোটি তিরিশ লক্ষের চেয়েও বেশি খদ্দের পেয়ে গেলেন। আমাজন ডট কমে আছে প্রায় পঞ্চাশ লক্ষ বই, সিডি, ভিডিও; শুধু বই-ই এখন তিরিশ লক্ষ। নেটে ইদানীং বাংলা বইয়ের দোকানও প্রচুর হচ্ছে, ঝামেলার কিচ্ছু নেই, ক্রেডিট কার্ডের চল এ দেশে বাড়ছে, তবে আর পিছিয়ে থাকার কারণ কী! কারণ নেই। তার পরও সাধ জাগে বইয়ের দোকান ঘুরে ঘুরে খুঁজে খুঁজে ছুঁয়ে ছুঁয়ে শুঁকে শুঁকে উল্টেপাল্টে দেখে দেখে বই কিনি। আজ না হোক, অদূর অথবা দূর ভবিষ্যতে এক সময় হয়তো ইন্টারনেটের বইয়ের দোকানও উবে যাবে, বিশেষ করে সে দোকান যদি কাগজের বই-এর দোকান হয়। বই বিক্রি আদৌ যদি হয়, ইলেকট্রনিক বই বিক্রি হবে। ছোট একটি হালকা পাতলা বইয়ের আকারের যন্ত্র, হার্ড ডিস্কে পছন্দের একশো দুশো বই পুরে রাখা যায়, যখন যেটি ইচ্ছে করে পড়া যায়, বইয়ের কোনও পাতা নেই, আঙুলে ওল্টানোর কিছু নেই। প্রথম পাতা পড়া শেষ হলে বোতাম টিপলেই পরের পাতা চলে আসবে যন্ত্রের পর্দায়। কোনও বই যদি পড়া হয়ে যায়, তবে যন্ত্র থেকে নিমেষে বোতাম টিপেই হাওয়া করে দেওয়া যায়। বইয়ের সিডি থেকে যন্ত্রে আবার নতুন বই ঢুকিয়ে নিলেই হল। ইলেকট্রনিক বইয়ের ব্যাপারটি নিঃসন্দেহে চমৎকার। বই বহনের ঝামেলা বাঁচে, বই রাখার জন্য বিস্তর জায়গাও ছেড়ে দিতে হয় না। কিন্তু, মন মানে না। ইচ্ছে করে কাগজের বই থাকুক, যে করেই হোক বেঁচে থাকুক। কাগজের বইয়ের মেলা হোক মাস মাস, বছর বছর। ম্যালা বইয়ের মেলা হোক, হারিয়ে যাওয়ার খেলা হোক, ভালবাসার বেলা হোক। কিন্তু, ইচ্ছে করলেই কি বিজ্ঞানের অগ্রগতি রোধ করতে পারব আমি! আমি বিজ্ঞান-বিরোধী নই মোটেও, বরং একটু বেশি রকমই বিজ্ঞান-বিশ্বাসী। তাই বলে, রোবটে ছেয়ে যাক দুনিয়া, চাই না। মেশিনের ওপর বেশি নির্ভরতা কবে না জানি মনকেও মেশিনের মতো করে দেয়। মুড়িভাজা আর গরম চা খেতে খেতে পাতা উলটে কাগজের বই পড়ার সুযোগ যদি ভবিষ্যতের ছেলেমেয়েরা না পায়, তাদের জন্য আমার করুণাই হবে। কিছু জিনিস আছে, যে জিনিসের কোনও বিকল্প হয় না।
বই কি এখন খুব বেশি কেউ পড়ছে না! পড়ছে। তবে শিক্ষিত মানুষ যে হারে বাড়ছে, সে হারে পড়ুয়া বাড়ছে না। পড়ুয়া কারা বেশি! একবাক্যে কয়েক জন প্রকাশক জানালেন, মেয়েরা। মেয়েদের পরের কাতারে আছে বাচ্চা। বাচ্চারাও পড়ছে বেশ। কম পড়ার দলে আছে পুরুষ। কম পড়বে কিন্তু লিখবে বেশি। পুরুষেরা বিদ্যে যত না আহরণ করে, তার চেয়ে বেশি বিতরণ করে— মুশকিল এখানেই। মেয়েদের পর্যবেক্ষণক্ষমতা পুরুষের চেয়ে অনেক বেশি, তার পরও মেয়েরা কেন কম লেখে! এর একটিই কারণ, সময় নেই । ঘরসংসার সামলাতে হয় মেয়েদের, বাচ্চাকাচ্চা, রান্নাবান্না, মোট কথা সংসারে সাতশো রকম কাজে শারীরিক ভাবে, মানসিক ভাবে, মনস্তাত্ত্বিক ভাবে আটকে থাকতে বাধ্য মেয়েরা। তাই সৃষ্টিশীল কাজে, লেখালেখির কাজে, আঁকাআঁকির কাজে পুরুষের চেয়ে কম সময় পায় মেয়ে। এ সব কাজকে তো এখনও কাজ বলে মনে করা হয় না। বিশেষ করে মেয়েদের জন্য। ঘরসংসারটি হল সবচেয়ে পয়লা, এর পর যদি স্বামী বা শ্বশুরবাড়ি থেকে অনুমতি নিয়ে চাকরিবাকরি বা টাকাপয়সা রোজগারের জন্য কাজকম্ম (তাও সব ধরনের কাজ নয়, যে ধরনের কাজকে মেয়েদের জন্য ভাল বা চলে বলে ধরা হয়, সে সব কাজই), করা যায়— না হয় কষ্টেসৃষ্টে সে সব চালিয়ে নেওয়া যেতে পারে, কিন্তু লেখালেখি করার ফ্যাশনটা তো চলবে না বাপু। মেয়েদের জন্য এ হল ফ্যাশন, এক ধরনের বাড়াবাড়ি, ঢং, আহ্লাদ। মেয়েরা খুব সযত্নে বাড়াবাড়ি করা থেকে তাই নিজেদের বিরত রাখে। পুরুষতন্ত্রের সহায় মেয়েরা যত বেশি, তত হয়তো কোনও পুরুষও নয়। তা ছাড়া মেয়েরা লেখাপড়াই বা করতে শিখছে কবে থেকে! পুরুষতন্ত্র তো এই সুযোগটি মেয়েদের দেয়নি খুব একটা।
