বাংলাদেশে বই রফতানি করার পাট পশ্চিমবঙ্গের প্রায় চুকেছে বলতে হয়। চুকবে না কেন, দেদারসে জাল বই বেরোয় ও-দেশে। আজ এখানে শারদীয়ায় উপন্যাস ছাপা হল, ওখানে কাল সে উপন্যাস বেরিয়ে গেল বই হয়ে। কে কাকে বাধা দেবে! এ সবের বিরুদ্ধে কোনও আইন নেই, থাকলেও তার প্রয়োগ নেই। এ বাংলাদেশের ব্যাপার। কিন্তু, বাংলাদেশের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের পার্থক্য এখন, কেউ লক্ষ করলেই দেখবে যে অনেকটাই কেটে যাচ্ছে। আমি অন্তত, এ রকমই জেনেছিলাম, যে, জাল বই প্রকাশনার সুযোগ আর কোথাও থাকলেও, এই পশ্চিমবঙ্গে নেই। কিন্তু কলেজ ষ্ট্রিটের বইপাড়াতেই প্রকাশকদের নাকের ডগায় দেখি জাল বই বিক্রি হওয়ার ধুম এবং এই ধুম নিয়ে কারও দুশ্চিন্তা না হওয়া এবং কোথাও কোনও প্রতিবাদের কণ্ঠস্বর না ওঠা আমাকে স্তম্ভিত করেছে। কে বা কারা এই জাল বইয়ের প্রকাশক, তা জানার সাধ্য অন্তত আমার মতো অসহায় লেখকের নেই। জাল বই লোকে কিনছে, দেড়শো টাকার নিষিদ্ধ হওয়া বই শুনেছি দেড় হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। লালবাজারের লোকেরা জাল বই-ব্যবসায়ীদের প্রতি মনে হয় অত্যন্ত সহৃদয়, তাদের বিরুদ্ধে কোনও রকম ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোর বিরোধী তারা। অবৈধ ভাবে অবৈধ ব্যবসায়ীরা অবৈধ বই ছাড়ছে বাজারে, এই অভিযোগ বহু করা হয়েছে, কিন্তু প্রশাসনও কোনও তাগিদ দেখায়নি অবৈধতার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার। দ্বিখণ্ডিত নামের একটি বই বছর পার হয়ে গেল— এ দেশে আজও নিষিদ্ধ। পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকার এই বইটির বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা জারি করার পর সামান্য কিছু প্রতিবাদ হয়েছিল। প্রতিবাদে কাজ হয়নি, সরকার বইটি থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করেনি। নিষিদ্ধ জিনিস শেষ অবধি নিষিদ্ধই থেকে গেছে। লেখকের মত প্রকাশের অধিকার, পাঠকের পাঠ করার অধিকার অবলীলায় কেড়ে নিয়েছে সরকার। আমার আশঙ্কা হয়, নির্বিঘ্নে জাল বই বাজারে বিক্রি করে করে এর পর না স্বভাবই হয়ে দাঁড়ায় জাল বই ছাপানোর। যদি বইপাড়া ছেয়ে যায় জাল বইয়ে! ছেয়ে যায় চোরে, ডাকাতে, মিথ্যুকে, কালোবাজারিতে! দৃশ্যটি নিশ্চয়ই আমাদের কল্পনা করতে অসুবিধা হয়। দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দিলে দুর্নীতি মাথায় ওঠে।
বাংলাদেশেও জাল বই একটা দু’টো শুরু হয়েছিল, কেউ তেমন গা করেনি প্রথম, এখন ওখানে জাল বই-ব্যবসায়ীদেরই দাপট বেশি। ওদের দাপটে ঢাকার পুস্তক প্রকাশকদের অনেকে ব্যবসা ছেড়ে পালিয়েছে, এক দল মাটি কামড়ে এখনও পড়ে আছে, আর এক দল নিজেরাই পাইরেসিতে নেমেছে। পশ্চিমবঙ্গ তো অন্তত শিক্ষা নিতে পারে এ সব দেখে। পশ্চিমবঙ্গ তো অন্তত পাইরেসির বিরুদ্ধে যা হোক কিছু রা শব্দ করতে পারে। বই নিষিদ্ধ করার যে আইনটি তিনি খাটিয়েছেন, বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য তো অন্তত সেই আইনটি যথাযথ কায়েম করার চেষ্টা করতে পারেন। নাকি, বইটির বৈধ প্রকাশকের কাছ থেকে অধিকার কেড়ে নিয়ে অবৈধ প্রকাশককে বইটি ছাপাবার অধিকার দেওয়াই ছিল বই নিষিদ্ধ করার পিছনে মূল উদ্দেশ্য? বৈধ বই পড়ে আছে লালবাজারের বদ্ধ ঘরে, অবৈধ বই-এ বাজার ছাওয়া। অবৈধের জয়জয়কার চারিদিকে, নিষিদ্ধের পোয়াবারো।
পশ্চিমবঙ্গের কিছু জনপ্রিয় পুরুষ-লেখক বাংলাদেশে প্রায়ই বেড়াতে যান মোগলাই খানাপিনা, অবাধ খাতির যত্ন আর খানসামাওয়ালা বাড়ির যারপরনাই আরাম পেতে, তাঁরা কিন্তু পাইরেসির বিরুদ্ধে মোটেও ওখানে মুখ খোলেন না। মুখ খুললে বিদেশের আরাম আয়েস যদি কিছু কমে যায়! বই নিষিদ্ধ হয়েছে বলেই পশ্চিমবঙ্গে জাল বইয়ের উৎকট উৎপাত। এখানকার কিছু লেখক ক’জন মুসলমান লেখক সঙ্গে নিয়ে বই নিষিদ্ধ করার আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। বোকা মুসলমান লেখকদের ঘাড়ের ওপর নিষিদ্ধের দায়ও অনেকটা চাপানো গেল, মুসলমানের ধর্ম রক্ষা করার এই আহামরি আবেগ দেখিয়ে বেশ ধর্মনিরপেক্ষ সাজা গেল আর ও দিকে বাংলাদেশের আরাম আয়েসের ব্যবস্থাও বেশ পাকা রইল, আর সাহিত্যজগতের পুরুষতান্ত্রিক নিয়ম মেনে না চলার শাস্তিও আমাকে বেশ আচ্ছা করে দেওয়া হল।
আমি মত প্রকাশের স্বাধীনতায় বিশ্বাসী। যে মৌলবাদীরা আমাকে হত্যা করার জন্য বাংলাদেশ জুড়ে ক্ষেপে উঠেছিল, তাদেরও, আমি ব্যক্তিগত ভাবে মনে করি যে যা খুশি তা বলার অধিকার আছে, যা প্রাণে চায় তা লেখার অধিকার আছে।এখানে এ দেশেও অন্যের মত প্রকাশের স্বাধীনতায় অনেকে বিশ্বাসী নন। এখানেও আমাকে মঞ্চ থেকে নামিয়ে দেবার, সব কিছু থেকে আলগোছে আমাকে সরিয়ে দেবার, আমাকে বাতিল করার, আমাকে ছুড়ে ফেলার, একঘরে করার, একা করার ষড়যন্ত্র শুরু হয়ে গেছে। খুব গোপনে গোপনে এ দেশেও হয়তো আমি পুরোদস্তুর অচ্ছুৎ হয়ে পড়ে থাকব, আমার দিকে চমৎকার হাসি হাসি মুখ নিয়ে তাকিয়ে থাকা শক্তিমান সাহিত্যিকরা হয়তো এক দিন আমাকে আর কলকাতার বইমেলার চৌহদ্দিতে ঢুকতে দেবেন না, যেমন দেয়নি বাংলাদেশে। ভয় হয় এক দিন হয়তো এ দেশে আমার ঢোকার সব পথই বন্ধ করে দেওয়া হবে। আমার শিরদাঁড়া বেয়ে উঠে আসছে একটি আশঙ্কা। এই আশঙ্কা মৌলবাদীদের নিয়ে নয়, এ আশঙ্কা মুক্তবুদ্ধির বুদ্ধিজীবীদের নিয়ে, এ আশঙ্কা বিখ্যাত পুং-সাহিত্যিকদের নিয়ে।
আমি এখানকার কোনও দলাদলিতে নেই। আমার কোনও দল নেই। গোষ্ঠী নেই। আমাকে যারা জন্মের শত্তুর বলে মনে করে, তাদেরও আমি অবন্ধু ভাবতে পারি না। এই না-পারার স্বভাবটি জন্মগত। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের সঙ্গে দেখা হলে রাজনীতি সমাজ শিল্প-সাহিত্য ইত্যাদি যে কোনও বিষয় নিয়ে আড্ডা-আলোচনায় বসে যাই। যদিও তিনি আমার দ্বিখণ্ডিত বইটি অথবা বইয়ের দুটি পাতা অন্তত নিষিদ্ধ করার জন্য প্রস্তাব করেছেন। দ্বিখণ্ডিত বইটি লিখেছি বলে বিখ্যাত লেখক সমরেশ মজুমদার আমাকে বেশ্যারও অধম বলে গালি দিয়েছেন, তাতে কী! দেখা হলে তাঁকেও আমি নমস্কার জানাই। শঙ্খ ঘোষকে চিরকালই শ্রদ্ধা করি। যদিও তাঁর হাতে গুজরাতের দাঙ্গায় ক্ষতিগ্রস্ত মুসলমানের জন্য সাহায্য ঢালার পর, মুসলমানদের পয়গম্বর সম্পর্কে কটু মন্তব্য করেছি— এই অভিযোগ করে দ্বিখণ্ডিত নিষিদ্ধ করায় সায় দিয়েছিলেন তিনি। কবীর সুমন, অশোক দাশগুপ্ত, দিব্যেন্দু পালিত, আজিজুল হক, সুবোধ সরকার, কৃষ্ণা বসু, সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ এবং এমন অনেকের সঙ্গে আমার সম্পর্ক নষ্ট হওয়ার কোনও কারণ কখনও ছিল না, এখনও নেই। তাঁরা নিজেরা লেখক হয়ে অন্য লেখকের বই নিষিদ্ধ করার জন্য পত্র-পত্রিকায় লিখেছেন, রেডিও-টেলিভিশনে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন, আদালতে গিয়েছেন— এ সম্পূর্ণই তাঁদের নিজ নিজ আদর্শ, বিশ্বাস এবং রুচির ব্যাপার। আমাদের মতবিরোধ থাকতে পারে, তাই বলে একে অপরের ওপর হিংস্র হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ার কোনও যুক্তি আমি দেখি না। মতের মিল নিয়ে এবং একই রকম করে মতের বিরোধ নিয়েও সুস্থ বিতর্ক কিংবা আলোচনা হতে পারে। সকলেরই বলার অধিকার আছে, মানুষ মাত্রেরই আছে। কিন্তু এখানকার নামী দামি পুরুষ-কবিলেখকদের কোনও অশোভন আচরণ বা অন্যায় নিয়ে লক্ষ করেছি, মুখ খোলা, পলিটিক্যালি ইনকারেক্ট। এঁদের নমো নমো করে চলার নিয়ম এখানে, নিয়মটি ভাঙলেই সব্বোনাশ। নিয়মিত গুরুদক্ষিণা দিয়ে শিষ্যজাতিকে বেঁচে থাকতে হয়। নামী দামিদের শক্তি এবং দাপট এ অঞ্চলে খুব বেশি। তাঁরা কোনও না কোনও রাজনৈতিক দলের ছত্রচ্ছায়ায় বাস করেন বলেই সম্ভবত এই দাপট। টার্গেট যদি এক বার হয়ে বসো, সাহিত্য-রাজনীতির সন্ত্রাস, তুমি ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র পুঁটি হলেও তোমাকে ছেড়ে দেবে না। মাফিয়া কোথায় নেই! যে বুদ্ধিজীবী মহাশয়গণ বুদ্ধি বিক্রি করে জীবন যাপন করেন, যাঁদের বুদ্ধিতে সমাজের অনেক কিছু ভাঙে এবং গড়ে ওঠে, সেই বুদ্ধিজীবীরা যদি ক্ষুদ্রতা, নীচতা, হীনম্মন্যতা ইত্যাদির ঊর্ধ্বে উঠতে না পারেন, তবে তাঁদের কতটুকু ক্ষতি হয় জানি না, অনেক বেশি ক্ষতি হয় সাধারণ মানুষের। সাধারণ মানুষ তো বুদ্ধিজীবী থেকেই শেখে অনেক কিছু।
