আশির দশকের শেষ দিকে শাড়ির ওপর একটা বাড়তি ওড়নার মতো কাপড় পরা শুরু হয়েছিল। নব্বই দশকের শুরুতেও তাই ছিল। একটা বদ হাওয়া টের পাচ্ছিলাম, প্রাণপণে রুখতে চাইছিলাম সেই বদ হাওয়া। সমাজের ইসলামীকরণ এবং নারীবিরোধী আইনের প্রতিবাদ করেছিলাম। এই কারণগুলোও ছিল আমাকে দেশ থেকে তাড়ানোর পেছনে। চুরানব্বই থেকে আমি দেশের বাইরে। নির্বাসন জীবনে দেশে কী হচ্ছে না হচ্ছে সব খবর রাখার সুযোগ হতো না। হঠাৎ সেদিন, এই বছর দুয়েক আগে, চমকে উঠেছি কিছু ছবি দেখে। আমাদের ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজে ঘটে যাওয়া রজত জয়ন্তী উৎসবের ছবি, যে উৎসবে আমার প্রচুর সহপাঠী গিয়েছিল, সবাই এখন দেশ-বিদেশের বিশেষজ্ঞ ডাক্তার। ছবিগুলোর সামনে আমি হতভম্ব, হতাশ বসে থেকেছি সারাদিন। প্রায় সব সহপাঠী মেয়ের মাথায় হিজাব, কালো কাপড়ে কপাল অবধি ঢাকা, অত সুন্দর চুলগুলো সব লুকিয়ে ফেলেছে! আর প্রায় সব সহপাঠী ছেলের মুখে দাড়ি নয়তো মাথায় টুপি, কপালে নামাজ পড়ার কালো দাগ।
এই ছেলেমেয়েগুলো আশির দশকের শুরু থেকে আমার সঙ্গে ডাক্তারি পড়েছে, কোনওদিন কাউকে এক রাকাত নামাজ পড়তে দেখিনি, কোনওদিন কাউকে আল্লাহর নাম মুখে নিতে শুনিনি। এমন আধুনিক সব চিকিৎসাবিজ্ঞানী কি না হয়ে উঠেছে পাঁড় ধর্মান্ধ? কে এই বিজ্ঞানীদেরও মাথার খুলিতে এগুলো ভরে দিয়েছে! তবে কি সেই বদ হাওয়া, যেটিকে রুখতে চেয়েছিলাম, কিন্তু রুখতে দেওয়া হয়নি, সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিল বিষাক্ত ভাইরাস, যুক্তি বুদ্ধি চিন্তাশক্তি লোপ পাইয়ে দেওয়ার ভাইরাস? যদি ডাক্তারদেরই এই হাল, অনুমান করতে পারি আর সব সাধারণ মানুষ এখন ধর্মান্ধতার কোন স্তরে পৌঁছেছে। পৌঁছেছে না বলে সম্ভবত তাদের কোন স্তরে পৌঁছোনো হয়েছে বলা ভালো।
শুনলাম বাংলাদেশে চলতে ফিরতে রাস্তাঘাটে বাজারে অফিসে যেখানেই যত মেয়েদের চোখে পড়ে, প্রায় সবারই পরনে নাকি থাকে কালো বোরখা, শুধু চোখদুটো খোলা, যেন হোঁচট না খায়! প্রায় সবাই তবে চলমান কয়েদি! সবারই গায়ে মস্ত কালো সতীত্ব বন্ধনী! বোরখা আরবদেশের পোশাক। কিন্তু গত দু’দশক ধরে বাঙালি মুসলমান মেয়েরা বোরখাকে নিজের পরিচয়ের অংশ বলে মনে করছে, অথবা মনে করতে বাধ্য হচ্ছে। ‘আমরা বৌদ্ধ, আমরা হিন্দু, আমরা খ্রিস্টান, আমরা মুসলমান, আমরা সবাই বাঙালি’ সত্তর দশকে বাঙালিরা এই গানটা খুব গাইতো। এই গান কেউ আর এখন গায় বলে মনে হয় না। এখন বাঙালি পরিচয়ের চেয়ে বড় পরিচয় মুসলমান পরিচয়। এই পরিচয়টি যখন বড় হয়ে দাঁড়ায়, তখন বোরখার চল বাড়ে। দাড়ি টুপির প্রকোপ বাড়ে। মসজিদ মাদ্রাসায় দেশ ছেয়ে যাচ্ছে, ইসলামি আইন আছে দেশে, সংবিধানে আছে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম, ইসলামি মৌলবাদীদের সঙ্গে অাঁতাত করছে রাজনীতিকরা, তাদেরকে সংসদে বসতে দিচ্ছে, অবাধে নারীবিরোধী ওয়াজ মাহফিল আর ইসলামি জলসা করতে দিচ্ছে, চোখের সামনে ইসলামিকরণ হচ্ছে দেশটার, আন্তর্জাতিক মৌলবাদী-সন্ত্রাসী চক্র কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা পাঠাচ্ছে দেশের যুব সমাজকে নষ্ট করার জন্য, যুব সমাজ নষ্ট হতে থাকবে আর আমরা সাহিত্য সংস্কৃতির ছোট একটা শহুরে গোষ্ঠীর মধ্যে ঘোরাঘুরি করে রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইতে গাইতে স্বপ্ন দেখবো বাঙালির বাঙালি পরিচয়টা বড় মুসলমান পরিচয়ের চেয়ে, তা কী হয়! এ তো রীতিমত জেগে ঘুমোনোর মতো!
মেয়েদের বোরখা পরার অর্থ হলো, মেয়েরা লোভের জিনিস, ভোগের বস্তু, মেয়েদের শরীরের কোনও অংশ পুরুষের চোখে পড়লে পুরুষের যৌন কামনা আগুনের মতো দাউ দাউ করে জ্বলে, লোভ লালসার বন্যা নামে, ধর্ষণ না করে ঠিক শান্তি হয় না। পুরুষদের এই যৌনসমস্যার কারণে মেয়েদের আপাদমস্তক ঢেকে রাখতে হবে। এই হলো সপ্তম শতাব্দীতে জন্ম হওয়া ইসলামের বিধান। এই বিধান বলছে, পুরুষেরা সব অসভ্য, সব বদ, সব যৌন কাতর, ধর্ষক, তারা নিজেদের যৌন ইচ্ছেকে দমন করতে জানে না, জানে না বলেই শরীরের আপাদমস্তক ঢেকে রাখার দায়িত্ব মেয়েদের নিতে হয়। সত্যি কথা বলতে কী, বোরখা মেয়েদের যত অপমান করে, তার চেয়ে বেশি করে পুরুষদের। বোরখার প্রতিবাদ পুরুষদেরই করা উচিত। অবাক হই, পুরুষেরা কী করে তাদের নিজেদের ধর্ষক পরিচয়টিকে টিকিয়ে রাখতে চায় মেয়েদের বোরখা পরার বিধানটি জারি রেখে! নিজেদের আত্মসম্মানবোধ বলে কিছুই কি নেই পুরুষের? তারা কেন এখনও বলছে না, ‘আমরা মেয়ে দেখলেই ঝাঁপিয়ে পড়বো না, আমরা আমাদের যৌনইচ্ছেকে সংযত করতে জানি, আমরা বর্বর নই, আমরা অসভ্য অসংযত ধর্ষক নই। আমরা শিক্ষিত, সভ্য। মেয়েরাও আমাদের মতো মানুষ। মেয়েদেরও তো যৌনইচ্ছে আছে, সে কারণে আমাদের তো বোরখা পরতে হয় না। যদি মেয়েরা তাদের যৌনইচ্ছেকে সংযত করতে জানে, আমরা জানবো না কেন? আমরা জানি মেয়েদের সম্মান করতে। আমাদের দোহাই দিয়ে মেয়েদের বোরখার কারাগারে ঢুকিয়ে অত্যাচার করা আর চলবে না।’
আরব সংস্কৃতি কেন বাংলায় এসেছে, এ প্রশ্ন অবান্তর। আরব, পারস্য, তুরস্ক, সমরখন্দ- এসব দেশ থেকে মুসলমানরা ভারতবর্ষে এসেছে, সঙ্গে ইসলাম এসেছে, দশম-একাদশ শতাব্দীতে মুসলমান সুফিরা বেশ জনপ্রিয় হতে শুরু করেছিল। আমাদের হিন্দু পূর্বপুরুষ ধর্মান্তরিত হয়েছেন নানা কারণে, সুফিদের অমায়িক ব্যবহারে অথবা ব্রাহ্মণদের জাতপাতের অত্যাচারে। কোনও ভাষা বা কোনও সংস্কৃতি মন্দ নয়, অসুন্দর নয়। আমাদের নিজেদের ভাষা আর সংস্কৃতিও পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষা আর সংস্কৃতির সঙ্গে মিলেছে, মিশেছে। ভাষা আর সংস্কৃতির বিবর্তন সবসময় ঘটছে, বাংলার মেয়েরা সবসময় এভাবে শাড়ি পরতো না, যেভাবে এখন পরে। বাঙালিরা সবসময় ঠিক এই ভাষায় কথা বলতো না, যে ভাষায় আমরা এখন কথা বলছি বা লিখছি। আমাদের ভাষার মধ্যে অন্য অনেক ভিনদেশি শব্দ ঢুকেছে। দরজা খোলা রাখাই ভালো, অন্য শব্দ, অন্য সুর, অন্য গল্প ঢুকতে চাইলে ঢুকুক। নিজের ভাষা আর সংস্কৃতি এতে মরে যায় না, বরং সমৃদ্ধ হয়। কিন্তু ক্ষতি হয় যখন কোনও ধর্ম তার মৌলবাদী চরিত্র নিয়ে ঢোকে। কারণ মৌলবাদী ধর্ম মানবতার আর মানবাধিকারের ঘোর বিরোধী।
