মাঝে মাঝে, আমি বুঝি না, মেয়েদের বুক কেন ঢেকে রাখতে হবে নানারকম কাপড় দিয়ে। ব্রা পরো, তার ওপর ব্লাউজ পরো, তার ওপর শাড়ি পরো, অথবা জামা পরো, তার ওপর ওড়না পরো বা তার ওপর চাদর পরো, তার ওপর বোরখা পরো। লোকেরা যেন না জানে স্তন বলে শরীরে কিছু আছে মেয়েদের। যদি বাইরে থেকে বোঝা যায় স্তন বলে কিছু আছে, তবে সর্বনাশটা কেন হবে। অসমকামী পুরুষের যৌন কামনা জাগবে। তা জাগুক। জাগাটাই তো স্বাভাবিক। ঠিক যেমন স্বাভাবিক, পুরুষদের দেখে নারীর যৌনকামনা জাগা!
বাংলাদেশের সমাজ এখনও অন্ধকারে। বড় বড় অট্টালিকা, দামি দামি গাড়ি, উঁচু উঁচু শপিং সেন্টার –কিছুরই অভাব নেই, সুস্থ মানসিকতারই শুধু অভাব। তাই কোনও মেয়ে শাড়ির ওপর ব্লাউজ পরলে বিরাট বিতর্ক শুরু হয়। অনেক স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় আছে দেশে, কিন্তু খুব কম মানুষই ও দেশে ‘শিক্ষিত’।
কিন্তু এ কথা ভুললে চলবে না যে সভ্য হওয়ার জন্য আমরা কিছু নিয়ম তৈরি করেছি, যেমন: তোমার যৌনকামনা জাগলেই তুমি কারও ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে পারো না, যৌনকর্ম করার জন্য তোমাকে তার সম্মতি পেতে হবে আগে। এই নিয়মটি পালন না করে মেয়েদের কিনা বোরখা পরানো হচ্ছে। তাদেরকে সমাজ থেকে ব্ল্যাকআউট করা হচ্ছে। জলজ্যান্ত মানুষগুলোকে এক একটা আস্ত কারাগার বানিয়ে দেওয়া হচ্ছে। যে পুরুষের যৌন কামনা জাগে, বোরখা পরা মেয়ে দেখলেও তার যৌন কামনা জাগে। আর যার জাগে না, তার উলঙ্গ মেয়ে দেখলেও জাগে না।
সভ্য মানুষেরা জানে কী করে নিয়ন্ত্রণ করতে হয় কামনা। অসভ্যরা যারা জানে না, তাদের সভ্য করার ব্যবস্থা হোক। মেয়েদের গায়ে বোরখা চাপালে, অসভ্যকে সভ্য করার প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করা হয়।
বাংলাদেশের সমাজ এখনও অন্ধকারে। বড় বড় অট্টালিকা, দামি দামি গাড়ি, উঁচু উঁচু শপিং সেন্টার –কিছুরই অভাব নেই, সুস্থ মানসিকতারই শুধু অভাব। তাই কোনও মেয়ে শাড়ির ওপর ব্লাউজ পরলে বিরাট বিতর্ক শুরু হয়। অনেক স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় আছে দেশে, কিন্তু খুব কম মানুষই এ দেশে ‘শিক্ষিত’। কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পরে আজকাল মানুষ ডিগ্রিধারী অশিক্ষিত বনে, নয়তো মৌলবাদী আর সন্ত্রাসী বনে। কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় কাউকে সত্যিকার শিক্ষিত করে না। ‘শিক্ষিত’ হতে হয় নিজের চেষ্টায়, নিজের বুদ্ধিতে।
আমরা এই মহাশূন্যে ভাসতে থাকা কোটি কোটি গ্রহের মধ্যে একটি অতি ক্ষুদ্র গ্রহে জন্ম নিয়েছি। কোটি কোটি বছর ধরে এককোষী প্রাণীর বিবর্তন ঘটতে ঘটতে মানুষ নামক প্রাণীর ঘটনা ঘটেছে। কোনও একদিন আমরাও কোটি কোটি প্রাণীর মতোই বিলুপ্ত হয়ে যাবো। আমাদের এবং আমাদের পোশাক নিয়ে বিশ্ব ব্রম্মাণ্ডের কোনও মাথা ব্যথা নেই। মাথা ব্যথা শুধু নারী-বিদ্বেষী কিছু নিকৃষ্ট মানুষের। মেয়েদের শরীরে অশ্লীল লোকেরা কেবল অশ্লীলতা আবিষ্কার করে। মেয়েদের হাসিতে, মেয়েদের কথা বলায়, মেয়েদের হাঁটাচলায়, মেয়েদের ব্যবহারে অশ্লীলতা আবিষ্কার করার লোক কিলবিল করছে সমাজে। এই লোকগুলো নিঃসন্দেহে অশ্লীল। অশ্লীলতা নিষিদ্ধ হোক আমি চাই। অশ্লীল লোকগুলোর অশ্লীল মন মানসিকতা নিষিদ্ধ হোক চাই। নোংরামো দূর হোক চাই। মেয়েদের স্বাধীনতা আর অধিকারের বিরুদ্ধে কুৎসিত ষড়যন্ত্র চিরকালের জন্য দূর হোক চাই।
বাঙালির বোরখা
ষাটের দশকের শেষ দিকে আমি বিদ্যাময়ী ইস্কুলে পড়ি। ময়মনসিংহ শহরের সবচেয়ে নামকরা মেয়েদের ইস্কুল। হাজারো ছাত্রী, কিন্তু কেউই কখনও বোরখা পরতো না। কোনো ছাত্রী তো নয়ই, কোনও শিক্ষিকাও নয়। বোরখার কোনও চলই ছিল না। খুব পর্দানশীন মৌলবী পরিবারের বয়স্ক মহিলারা বাইরে বেরোলে রিকশায় শাড়ি পেঁচিয়ে নিত। ওদেরও পরার বোরখা ছিল না। সত্তরের দশকে আমি ওই শহরেই রেসিডেন্সিয়াল মডেল ইস্কুলে পড়ি। সারা ইস্কুলে একটি মেয়েই বোরখা পরতো। তখন বোরখা কিনতে পাওয়া যেত না। পরতে চাইলে কাপড় কিনে বানিয়ে নিতে হত। মেয়েটির বোরখাও কাপড় কিনে বানিয়ে নেওয়া। তার মৌলবী-বাবা জোর করে তাকে বোরখা পরাতো। মেয়েটি আমাদের ক্লাসেই পরতো। নাম ছিল হ্যাপি। লম্বা টিংটিঙে মেয়ে। হ্যাপি তার বোরখাটা ইস্কুলের গেটের কাছে এসেই খুলে ফেলতো, বোরখাটাকে বইখাতার ব্যাগে ঢুকিয়ে তবেই ইস্কুলে ঢুকতো। সে যে বোরখা পরে ইস্কুলে আসে তা কাউকে জানতে দিতে চাইতো না। কিন্তু খবরটা একদিন ঠিকই জানাজানি হয়ে যায়। জানাজানি হওয়ার পর ইস্কুলের মেয়েরা সবাই হ্যাপিকে নিয়ে হাসাহাসি করতো। হ্যাপি ক্লাসের পেছনের বেঞ্চে বসতো বোরখা পরার লজ্জায়। সঙ্গে আবার পড়াশোনা ভালো না করার লজ্জাও ছিল। আমি ভালো ছাত্রী হলেও সবার সঙ্গেই মিশতাম। হ্যাপির সঙ্গেও। হ্যাপি খুব অসভ্য অসভ্য গালি জানতো। ক্লাসের অন্য মেয়েরা হ্যাপির মতো অত গালি জানতো না। আমি তো আগে কোনওদিন শুনিনি ওসব গালি। হ্যাপি যখন ক্লাস নাইনে বা টেন-এ, তখন তার বাবা জোর করে তার বিয়ে দিতে চাইছিল। হ্যাপি তার হবু-স্বামীর কথা বলতো আর তার বাপ মা তুলে গালিগালাজ করতো। আমি অবাক হয়ে ওসব শুনতাম। ক্লাসের সবচেয়ে ডাকাবুকো মুখ-খারাপ মেয়ে কিনা বোরখা পরে। আর আমরা যারা কোনও গালি জানি না, আমরা যারা সরল সোজা ভালোমানুষ, তারা কোনওদিন বোরখার কথা কল্পনাও করিনি। বোরখা একটা হাস্যকর পোশাক ছিল ষাট আর সত্তর দশক জুড়ে। দু-একজন শহুরে তরুণী যারা পরতে বাধ্য হতো, লজ্জায় তারা রাস্তাঘাটে মাটির সঙ্গে মিশে থাকতো।
