ভারতবর্ষে যে সুফি ইসলামের প্রচার হয়েছিল, সেটির চরিত্র ছিল উদার। বুলেহ শাহ নামের এক সুফি কবি বলতেন, ‘মসজিদ মন্দির ভেঙে ফেলো, হৃদয় ভেঙো না, হৃদয়ই সবচেয়ে বড় পবিত্র স্থান, কাবার চেয়েও পবিত্র’। সুফি ইসলামকে সরিয়ে মৌলবাদী ইসলাম গেড়ে বসলো ভারতবর্ষে, সম্ভবত তিরিশ চল্লিশের দশকেই, গোটা পৃথিবীকেই দখল করার জিহাদি স্বপ্ন নিয়ে তখন মাওলানা মওদুদি বানিয়ে ফেললেন তার জামাতে ইসলামি দল। ভারত ভাগের পর ভৌগোলিক সুবিধের কারণে অত দ্রুত মৌলবাদী ইসলাম এসে নষ্ট করতে পারেনি হিন্দু বৌদ্ধ বেষ্টিত পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালি মুসলমানদের। পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকের দুঃশাসন থেকেও পূর্ব পাকিস্তান ব্যস্ত ছিল নিজেদের বাঁচাতে। সুফি ইসলামের তখনও রেশ ছিল বলে মুসলমানিত্বের চেয়ে বাঙালিত্ব বড় ছিল বাঙালি মুসলমানদের কাছে। একাত্তরের পর যখন সেনাবাহিনীর লোকেরা শাসন করতে শুরু করলো দেশ, মৌলবাদী ইসলামকে তারা বেশ সোহাগ করে বড় আসন পেতে দিল বসতে, ননীটা ছানাটা খাইয়ে নাদুস নুদুস করলো, আর সত্যিকার নষ্ট হতে থাকলো তখন দেশ। মৌলবাদী ইসলামে দেশ ছেয়ে গেলে বাঙালি পরিচয়ের চেয়ে অনেক বড় হয়ে ওঠে মুসলমান পরিচয়, বাংলা ভাষার চেয়ে মূল্যবান হয়ে ওঠে আরবী ভাষা। আমি মনে করি না ভালোবেসে কেউ তখন আরবীয় সংস্কৃতিকে নিজের সংস্কৃতি বলে গ্রহণ করে। ভয়ে গ্রহণ করে, দোযখের ভয়ে। ইসলামের জন্মভূমির সব কিছুকে অনুকরণ করে দোযখের আগুন থেকে যদি বাঁচা যায়, চেষ্টা করে। মানুষ তখন বিভ্রান্ত। দোকানপাটে তো ঝুলবেই শত শত রেডিমেড বোরখা। কালো কাপড়ে ঢেকে দেওয়া হবে মেয়েদের নাম পরিচয়, মেয়েদের অস্তিত্ব। মেয়েরা তখন শুধু ওয়াকিং ডেড, ফেসলেস। শুধুই ‘নো-বডি’, কেউ নয়। দুঃখ এই, এইটুকু বোঝার ক্ষমতাও মেয়েরা হারিয়ে ফেলছে যে বোরখা তাদের ‘কেউ’ থেকে ‘কেউ নয়’ বানিয়ে ফেলে।
যে পুরুষগুলো বলে বোরখা খুব ভালো পোশাক, সুন্দর পোশাক, চমৎকার পোশাক, ওই পুরুষগুলো কেন বোরখা পরছে না কেউ জিজ্ঞেস করেছে? কেউ কেন ওদের জিজ্ঞেস করছে না, ‘বোরখা যদি অত ভালো পোশাক, তাহলে তোরা বোরখা পরছিস না কেন? দু’দিন ভালো পোশাকটা পরে দেখ না কেমন ভালো লাগে!’?
চৌদ্দশ বছর আগে যে কারণেই মুসলমানদের মধ্যে বোরখার চল শুরু হোক না কেন, এখন এই একবিংশ শতাব্দীতে মেয়েদের বোরখা পরার পেছনে কোনও যুক্তি নেই। সত্যি বলতে কী, বোরখা মেয়েদের কাজে লাগে না, লাগে পুরুষের কাজে। বোরখা আসলে পুরুষের পোশাক, চোর ডাকাত খুনি পুরুষের পোশাক। পুরুষেরা যখন চুরি ডাকাতি করে, খুন করে, বোরখা পরে নেয়। এতে ওদের সুবিধে হয় বেশ, কেউ চিনতে পারে না। চোর ডাকাতের পোশাককে ধর্মের নামে মেয়েদের গায়ে চাপানোর কোনও মানে হয়?
সূত্র: দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিন, ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৪
বামপন্থীদের ভুল
বামপন্থাকে সেই ছোটবেলা থেকেই ভালবাসতাম। সবার জন্য অন্ন বস্ত্র বাসস্থানের দাবি করেছি, দুর্ভিক্ষ পীড়িত মানুষকে ত্রাণ দিয়েছি। দরিদ্রকে সাহায্য করেছি। আমার বড় মামা কমিউনিস্ট ছিলেন, পণ্ডিত ছিলেন, নাস্তিক ছিলেন। বড় সমীহ করতাম তাঁকে। আমার পক্ষে মিছিল মিটিং সম্ভব ছিল না, বই পড়ার নেশা ছিল, এক সময় সমতা আর সমানাধিকারের জন্য আমার লেখালেখি শুরু হলো। লেখা শুরু করেছি চার যুগ আগে।
বামপন্থায় বিশ্বাসী আমি। কিন্তু আমার লেখালেখির শুরু থেকেই বামপন্থীরাই আমাকে অস্বীকার করেছে। নারীর সমানাধিকারের পক্ষে যখন লিখছিলাম, তখন তারা আমাকে বাধা দিয়েছে, বলেছে ‘তুমি শ্রেণীশত্রুকে চিহ্নিত করো, তাহলেই হবে। সমাজতন্ত্র এলেই নারীর সমানাধিকার আসবে। আলাদা করে নারীর সমানাধিকারের জন্য সংগ্রাম করার প্রয়োজন নেই।’ সমাজতন্ত্র এলে নারীর সমানাধিকার পাওয়ার কথা, কিন্তু যেসব দেশে সমাজতন্ত্র এসেছিল, সেসব দেশে কিন্তু নারীর সমানাধিকার জোটেনি। পলিটব্যুরোর কজন সদস্য নারী ছিলেন, শুনি?
এরপর বামপন্থীরা আমাকে এক অদ্ভুত কারণে দোষ দিতে শুরু করলো। বাংলাদেশে হিন্দুদের ওপর যে অত্যাচার হয়, তার প্রতিবাদ করে আমি লজ্জা নামের একটি তথ্যভিত্তিক উপন্যাস লিখেছিলাম। যখন ভারতবর্ষে ভারতীয় জনতা পার্টি আমার বিনা অনুমতিতে লজ্জার জাল বই ছাপিয়ে ট্রেনে বাসে ফুটপাতে মুড়ি মুড়কির মতো বিক্রি করতে শুরু করেছিল, বামপন্থীরা দোষ দিয়েছিল আমাকে। ভারতের ডানপন্থীরা আমাকে সমর্থন করছে, এই দোষ আমার। আজও বামপন্থীরা লজ্জা লেখার দোষ আমাকে দেয়। লজ্জা বইটি লিখে নাকি আমি খুব খারাপ করেছি। আমি নাকি ভারতের হিন্দু মৌলবাদীদের হাতে অস্ত্র তুলে দিয়েছি। ভারতের বামপন্থীরা ভারতের সংখ্যালঘু মুসলমানের ওপর কোনও আক্রমণ হলে তাদের পাশে দাঁড়ায়, আর আমি বাংলাদেশের সংখ্যালঘু হিন্দুর ওপর অত্যাচার হলে যদি তাদের পাশে দাঁড়াই, তাহলে আমার দোষ। আমার দোষ কারণ বাংলাদেশে হিন্দুর ওপর অন্যায় করছে মুসলিম মৌলবাদীরা। ওদিকে বামপন্থীরা আবার মুসলিম মৌলবাদীদের দোসর। তাদের দোসরদের বিরুদ্ধে কোনও কথা শুনতে তারা নারাজ। আমি ভারতবর্ষে বসে লজ্জা লিখিনি, লিখেছি বাংলাদেশে বসে। আমি অত্যাচারিত সংখ্যালঘুর পক্ষে কথা বলেছি, ঠিক বামপন্থীরা যা করে অন্যান্য দেশে, এই সত্য অনুধাবন করতে বামপন্থীরা পারে না।
