আমাদের পূর্বনারীদেরও পূর্বনারীরা ন্যাংটো থাকতো, গাছের ছাল পরতো, জন্তুর চামড়া পরতো, তারপর শুরু করল কাপড় পরা। আমরা এ যুগের নারীরা ব্লাউজের ওপর আঁচল ব্যবহার করছি। আজকের স্টাইল যে বাকি জীবনের জন্য স্থির হয়ে গিয়েছে, তা নয়। এই স্টাইলটাও একসময় বিদেয় হবে, নতুন কোনও স্টাইল আসবে। মানুষ চিরকালই নানান ক্ষেত্রে নতুন আইডিয়া নিয়ে আসে। শাড়ির ওপর ব্লাউজ পরেছে মেয়ে, পরুক। তোমার পছন্দ না হলে পরো না। যেমন আমি পরবো না। খুব স্লিম হলে হয়তো পরতাম। আমি কখনও চলতি কোনও ফ্যাশন মেনে চলি না। আমার ফ্যাশনের নাম, ‘যখন যা খুশি’। ক্যাজুয়ালের চূড়ান্ত। কাপড় চোপড় আমি ইস্ত্রি করি না বললেই চলে। হাতের কাছে যা পাই তাই পরি। শার্ট প্যান্ট, শর্টস টিশার্ট, অথবা শাড়ি। মূলত সুতি শাড়ি। আজকাল আর সালোয়ার কামিজ, স্কার্ট ফার্ট পরি না। মেয়েলি জিনিস পরতে ভালো লাগে না। শাড়িকে আমার একেবারই মেয়েলি বলে মনে হয়না। তারচেয়ে বেশি মেয়েলি লাগে সালোয়ার কামিজ আর স্কার্ট ফার্টগুলোকে। শাড়ি কিন্তু আমার হাঁটা চলাকে ধীর করে না, শার্ট প্যান্টজুতো পরে যেভাবে দ্রুত হাঁটি, শাড়ি পরেও। শাড়ি মেয়েলি? ধুতি পরা পুরুষগুলোকে কি মেয়েলি দেখতে লাগে? পুরুষালি, মেয়েলি-এই ধারণাগুলো বদলোকের বানানো। শাড়ির মতো পোশাক পরা প্রাচীন গ্রীসের ওই ব্যক্তিত্বশালী রাজাদের কি আদৌ মেয়েলি বলে মনে হয়? আজ থেকে পুরুষরা যদি শাড়ি পরা শুরু করে, আর মেয়েরা শার্টপ্যান্ট, তাহলে খুব বেশি দিন পার হবে না, যখন মানুষ বলতে শুরু করবে শাড়ি খুব পুরুষালি পোশাক, আর শার্টপ্যান্ট মেয়েলি। পুরুষালি আর মেয়েলিতে কিন্তু অসুবিধে নেই। অসুবিধে তখনই, যখন পুরুষালি কিছুকে মেয়েলি কিছুর চেয়ে সুপিরিওর বলে মনে করা হয়।
কাপড় পরা মানুষদের মধ্যে একজন যদি কাপড় খুলে দাঁড়ায় তাকে খুব অশ্লীল দেখাবে, এ কথা সবাই জানে। আবার কাপড়ও কিন্তু কখনও কখনও বড় অশ্লীলতার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
কোনও পোশাকই অশ্লীল নয়। আবার পোশাকহীনতাও অশ্লীল নয়। আমাজনের জঙ্গলে বা আন্দামান দ্বীপে আদিবাসীরা যখন উলঙ্গ ঘোরাফেরা করে, ওদের কি অশ্লীল দেখায়? অশ্লীলতার সংজ্ঞা আমরা তৈরি করেছি। সংজ্ঞাটা অশ্লীল। মানুষের কুৎসিত মনটা অশ্লীল। যে মনটা ভাবে, যে মেয়েরা পুরুষের পছন্দমতো পোশাক পরেনা, সেই মেয়েরা চরিত্রহীনা, সেই মনটা অশ্লীল। যে মনটা ভাবে স্বল্প কোনও পোশাক পরা মানে ধর্ষিতা হওয়ার জন্য মেয়েদের সম্মতি দেওয়া, সেই মনটা অশ্লীল। যে মনটা ভাবে পুরুষ যা খুশি পরুক, মেয়েরা যেন যা খুশি না পরে, সেই মনটা অশ্লীল। যে মনটা ভাবে মেয়েরা যৌন বস্তু, কিন্তু পুরুষ যৌন বস্তু নয়, সুতরাং মেয়েরা কী পরবে না পরবে সেই সিদ্ধান্ত পুরুষ নেবে, সেই মনটা অশ্লীল।
কাপড় পরা মানুষদের মধ্যে একজন যদি কাপড় খুলে দাঁড়ায় তাকে খুব অশ্লীল দেখাবে, এ কথা সবাই জানে। আবার কাপড়ও কিন্তু কখনও কখনও বড় অশ্লীলতার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। কয়েক বছর আগের এক গ্রীষ্মকাল আমি বার্লিনে কাটিয়েছি। কোনও এক বিকেলে বাড়ির খুব দূরে নয় এমন এক ঝিলে সাঁতার কাটার উদ্দেশে হাঁটতে হাঁটতে ঝিলের পাড় ঘেঁষা মাঠে গিয়ে চমকে উঠেছিলাম, রাস্তার কিনারেই সেই খোলা মাঠ, আর মাঠ জুড়ে শত শত উলঙ্গ, সম্পূর্ণ উলঙ্গ, নারী পুরুষ-কিশোরী কিশোরী আর শিশু শুয়ে আছে, বসে আছে। সবাই রোদ তাপাচ্ছে, আর ক্ষণে ক্ষণে উঠে ঝিলের জলে সাঁতার কেটে আসছে। সারাদিনের খাবার আর জলটল সঙ্গে এনেছে। ওখানেই সপরিবার খাচ্ছে। আমি সবার মাঝখানে, গায়ে প্রচুর কাপড় আমার। আমার দিকে সবাই বিস্মিত চোখে তাকাচ্ছে। অনেকটা কৌতুকের চোখেও। কিছু চোখে প্রচ্ছন্ন বিরক্তি। আমাকে, সত্যি বলতে কী, আমি নিজেও বুঝতে পারছিলাম, অশ্লীল দেখাচ্ছে। শরীরে কাপড় থাকার লজ্জায় আমি মাথা নিচু করে রইলাম। উলঙ্গ মেয়েরা যেমন লজ্জায় দু’হাতে বুক আড়াল করে, সেরকম আমিও কাপড়ের লজ্জায় দু’হাতে কাপড় আড়াল করতে চাইছিলাম।
সভ্য মানুষেরা জানে কী করে নিয়ন্ত্রণ করতে হয় কামনা। অসভ্যরা যারা জানে না, তাদের সভ্য করার ব্যবস্থা হোক।
অগত্যা এক এক করে কাপড় খুলে ফেললাম, কিন্তু জনসমক্ষে আন্ডারওয়ারগুলো অনেকবার খুলতে চেষ্টা করেও খুলতে পারিনি। কোথাকার এক আড়ষ্টতা আমাকে শামুক বানিয়ে রেখেছিল। এরকম নয় যে ওই মাঠে আমার চেনা কেউ ছিল। এক মাঠ অচেনা উলঙ্গ মানুষের সামনেও আমি উলঙ্গ হতে পারিনি। ভেবেছিলাম আমিও রোদ তাপাবো, সাঁতার কাটবো। কিন্তু সম্পূর্ণ উলঙ্গ হতে না পারার লজ্জায় শেষ পর্যন্ত ওই মাঠ থেকে সরে যেতে আমি বাধ্য হয়েছিলাম। শত শত উলঙ্গ নারী পুরুষকে সেদিন একফোঁটা অশ্লীল লাগেনি, আমাকে বরং অশ্লীল লেগেছিল। অশ্লীলতাবোধটা মানসিক। এর সঙ্গে পোশাকের কোনও সম্পর্ক নেই। গায়ে পোশাক থাকলেও অশ্লীল লাগতে পারে, না থাকলেও অশ্লীল লাগতে পারে।
ব্যক্তিগতভাবে কোনও পোশাককে আমি অশ্লীল বলে মনে করি না। তবে অশ্লীলতা দূর করতে যে পোশাকগুলো বানানো হয়েছে, এবং মেয়েদের গায়ে চাপানো হয়েছে, মেয়েদের স্বাধীনতা আর স্বতঃস্ফূর্ততাকে কবর দিয়ে দেওয়া হয়েছে, সেই পোশাকগুলোকে বরং আমার ভীষণ অশ্লীল বলে মনে হয়। যেমন হিজাব, যেমন বোরখা।
