অনুবাদ : আহ্সান হাবীব
শেকড় – ইস্মত চুগ্তাই
প্রত্যেকটি মানুষের মুখ শুকিয়ে গেছে। বাড়িতে রান্না পর্যন্ত হয়নি। আজ ষষ্ঠ দিন। ছেলেপুলে ইস্কুল ছেড়ে বাড়িতে বসে বসে নিজেদের এবং বাড়ির লোকজনের প্রাণ অতিষ্ঠ করে তুলছে। সেই মারামারি-ধস্তাধস্তি, সেই হুটোপুটি-লাফালাফি। যেন পনেরোই আগস্ট আসেইনি। হতভাগাগুলোর এ খেয়াল পর্যন্ত নেই যে, ইংরেজ চলে গেছে এবং যাওয়ার বেলায় এমন গভীর আঘাত দিয়ে গেছে, যা শুকোতে বহুদিন লেগে যাবে। ভারতবর্ষকে এমন পঙ্গু হাতে আর ভোঁতা অস্ত্র দিয়ে কাটা হয়েছে যে, হাজার হাজার শিরা ছিঁড়ে গেছে, রক্তের স্রোত রয়ে যাচ্ছে। সেলাই করে দেওয়ার ক্ষমতাটুকুও কারো নেই।
অন্য কোনো সাধারণ দিন হলে হতভাগাগুলোকে বলা যেত, বাইরে গিয়ে হৈ-হল্লা কর। কিন্তু কয়েকদিন যাবৎ শহরের অবস্থা এমন বিশ্রী হয়ে রয়েছে যে, সমস্ত মুসলমান একরকম নজরবন্দিই হয়ে আছে। দরজায় তালা পড়েছে। বাইরে পুলিশের পাহারা। ছেলেপুলেকে তাই বুকের ওপরই দুরমুশ পিটতে দেওয়া হচ্ছে। এমনিতে সিভিল-লাইন্স্ শান্ত– এসব পাড়া সাধারণত যেরকম থাকে। যেখানে পাঁক-কাদা, নোংরামি সেইখানেই বেশি। যেখানে দারিদ্র্য, সেইখানেই অশিক্ষার আঁস্তাকুড়ে ধর্মের নামে জঞ্জাল জমে ভুড়ভুড়ি ওঠে। সেই জঞ্জালই ঘাঁটাঘাঁটি করা হয়েছে। তার ওপর পাঞ্জাব থেকে আগত শরণার্থীর সংখ্যা দিন-কে-দিন বেড়ে উঠে সংখ্যালঘুদের মনে ত্রাসের সৃষ্টি করছে। জঞ্জালের স্তূপেও আরো ক্ষিপ্র হাত পড়ছে। তারপর দুর্গন্ধ ক্রমশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন এলাকায় পর্যন্ত গিয়ে পৌঁছচ্ছে। দুই-এক জায়গায় খোলাখুলিভাবেই হাঙ্গামা হয়ে গেছে। কিন্তু মারোয়াড়ের হিন্দু-মুসলমানের সংস্কৃতি এমনি মিশ্রিত যে, নাম, চেহারা, কি, কাপড়-চোপড় দেখে তাদের আলাদা করে চেনা বাইরের লোকের পক্ষে মুশকিলের ব্যাপার। বাইরের সংস্কৃতির লোক– যাদের সহজেই চেনা যেত– পনেরোই আগস্টের গন্ধ পেয়েই পাকিস্তানে গিয়ে পাড়ি জমিয়েছে। রয়ে গেছে শুধু এ রাজ্যের পুরনো বাসিন্দারা। তাদের না আছে তেমন বুদ্ধি, না আছে তেমন ক্ষমতা যে, হিন্দুস্তান আর পাকিস্তানের জটপাকানো সমস্যাটি কেউ তাদের বুঝিয়ে দেবে। যাদের বুঝবার কথা, তারা বুঝে নিয়েছে। এবং তারা নিরাপদও হয়ে গেছে। বাকি যারা শুনে গিয়েছিল, চার সের গম আর চার আনায় এক হাত লম্বা পাউরুটি পাওয়া যাবে সেখানে, তারা ফিরে আসছে। কারণ, সেখানে গিয়ে তারা এ-কথাও জেনেছে, চার সের গমের জন্যে একটা টাকারও দরকার হয় এবং এক হাত লম্বা পাউরুটির জন্যে গোটা একটা সিকিও দিতে হয়। আর, সে টাকা-সিকি না পাওয়া যায় কোনো দোকানে, না জন্মে কোনো ক্ষেতে। জান বাঁচাতে হলে যেমন কঠিন সংগ্রাম করতে হয়, টাকা-সিকি পেতে হলেও তাই।
সুতরাং বিভিন্ন মহল্লা থেকে যখন খোলাখুলিভাবে সংখ্যালঘুদের বার করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হল, ভারি মুশকিল বাধল তখন। কর্তাব্যক্তিরা পরিষ্কার বলে দিলেন, মশাই, লোকে এমন খিচুরি পাকিয়ে রয়েছে যে, মুসলমান বেছে বার করতে হলে রীতিমতো কর্মচারী লাগাতে হবে। সে একটা অকারণ বাজে খরচ। এমনিতে আপনারা যদি শরণার্থীদের পুনর্বাসনের জন্যে জমি কিনতে চান, তাহলে খালি করে দেওয়া যাবে জমি। জানোয়াররা তো রয়েছেই। যখনই বলেন, জঙ্গল খালি করে দেওয়া যাবে।
এবার বাকি রইল শুধু কয়েকটি গোনা-গাঁথা, বাছা-বাছা পরিবার– তারা মহারাজার চেলা-চামুণ্ডা। তাদের যাওয়ার কোনো প্রশ্নই ওঠে না। যারা যাওয়ার জন্যে অস্থির হয়ে পড়েছে, তারা বিছানাপত্র বাঁধছে। আমাদের বাড়িও এই দলে। যদ্দিন আজমির থেকে বড় ভাই আসেননি, ততদিন তেমন তাড়াহুড়ো ছিল না; কিন্তু তিনি এসে আমাদের ভড়কে দিয়ে তবে ছাড়লেন। তবু সেকথার কেউ বিশেষ গুরুত্ব দিল না। এমনিতে হয়তো কেউ কানেও তুলত না কথাটা এবং বিছানাপত্রও বাঁধা হত না কোনো কালে। সুতরাং খোদার মর্জি ছাব্বা মিয়ার পাঁয়তারাও চলত না। বড় ভাই তো যাওয়ার জন্য তৈরিই ছিলেন। তিনি বলে বলে হয়রান হয়ে গেছেন। এবার ছাব্বা মিয়া হঠাৎ এক কাণ্ড করে বসলেন– তিনি ইস্কুলের দেয়ালে ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ’ লিখে রেখে এলেন। রূপচাঁদজির ছেলেরা এর প্রতিবাদে কথাটি মুছে ফেলে চট করে ‘অখণ্ড হিন্দুস্তান’ লিখে দিল। অমনি শুরু হয়ে গেল জুতো পেটাপিটি এবং পরস্পর পরস্পরের প্রাণ নেয়ার চেষ্টা। হাঙ্গামা ক্রমশ বেড়ে উঠল। শেষকালে পুলিশ ডাকা হল। যে-কটি মুসলমান বেঁচে ছিল, লরিতে করে বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া হল তাদের।
যে মায়েরা গালাগালি দেওয়ার সময় ছেলেমেয়েদের কলেরা-প্লেগের মুখে তুলে দেয়, ছেলেরা বাড়ি আসতেই তারা মমতায় অস্থির হয়ে ছুটে এসে তাদের বুকে চেপে ধরল। অন্য কোনো দিন হলে এবং রূপচাঁদজির ছেলেপুলের সঙ্গে ছাব্বা মারামারি করে এলে নতুন ভাবী তাকে এমনভাবে জুতোপেটা করতেন যে, সে জন্মে ভুলত না। তারপর তাকে উঠিয়ে রূপচাঁদজির বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া হত– খাওয়ান ওকে ক্যাস্টর অয়েল আর কুইনাইন। রূপচাঁদজি শুধু আমাদের বাড়ির বাঁধা ডাক্তারই নন, বাবার পুরনো বন্ধুও। বাবার সঙ্গে ডাক্তারবাবুর, আমার ভাইদের সঙ্গে তাঁর ছেলেদের, আমার ভাবীদের সঙ্গে তাঁর বউদের এবং আমাদের বাড়ির ছেলেমেয়ের সঙ্গে তাঁর নাতি-নাতনির বন্ধুত্ব একেবারে অচ্ছেদ্য। দুই বাড়িরই বর্তমান তিন পুরুষ পরস্পরের সঙ্গে এমনি ঘনিষ্ঠ সম্পর্কে আবদ্ধ যে, সন্দেহমাত্র হত না, ভারত-বিভাগের পর এই ভালোবাসায় ফাটল ধরবে। সে যাই হোক, দুই বাড়িতেই লীগপন্থি, কংগ্রেসি এবং মহাসভাপন্থী লোক ছিল। ধর্ম এবং রাজনীতির তর্কও জোরসে চলত। কিন্তু সে যেন ফুটবল কিংব ক্রিকেট ম্যাচের মতো। এদিকে বাবা যদি কংগ্রেসি হলেন তো ওদিকে ডাক্তারবাবু আর বড় ভাই হলেন লীগপন্থি, আর, জ্ঞানচাঁদজি মহাসভাপন্থী। মেজো ভাই কমিউনিষ্ট, গুলাবচাঁদ সোস্যালিস্ট। এইভাবে বেটাছেলের বউ-ছেলেমেয়েও তাদের পার্টির। সাধারণভাবে হিসাব করলে কংগ্রেসের দল ভারি হয়ে যায়। কমিউনিস্ট, সোস্যালিস্টরাও গালাগালি খায়। কিন্তু তারা কংগ্রেসের দলেই ভিড়ে যায়। বাকি থাকে মহাসভা আর লীগের দল। এই দুটি দল সবসময় একজোট থাকে। ওরা তো পরস্পরের শত্রুই। তবু, দুটিতে মিলে কংগ্রেসের ওপর আক্রমণ চালায়।
