কিন্তু এদিকে কয়েক বছর যাবৎ লীগের ক্ষমতা বেড়ে চলছিল, ওদিকে মহাসভারও। কংগ্রেসের তো পতনের যুগ চলছে। দুই-একটি ছাড়া বাড়ির সমস্ত ছেলেপুলে বড় ভাইয়ের নেতৃত্বে নিরপেক্ষ গোছের কংগ্রেসিদের ছেড়ে ন্যাশনাল গার্ডের মতো দল করে ফেলল; ওদিকে জ্ঞানচাঁদের নেতৃত্বে সেবক সংঘের একটা ছোটখাটো দল গড়ে উঠল। কিন্তু ভালোবাসায় তবু ফাটল ধরল না।
মহাসভাপন্থী জ্ঞানচাঁদ মুন্নির লীগপন্থি বাপকে বলে, আমার খোকার বিয়ে তো মুন্নির সাথেই দেব। সোনার পাঁয়জোর দেব আমি
: গিল্টি সোনার মাল যেন চালিয়ে দিও না হে।– অর্থাৎ বড় ভাই জ্ঞানচাঁদের মহাজনির ওপর কটাক্ষ করেন।
এদিকে, ন্যাশনাল গার্ড দেয়ালে দেয়ালে ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ’ লিখে রাখে, সেবক সংঘ সেটা মুছে দিয়ে ‘অখণ্ড হিন্দুস্তান’ লিখে দেয়। এ হল সেই সময়ের কাহিনী, যখন পাকিস্তানের কথা ছিল হাসি-ঠাট্টার বিষয়।
বাবা আর রূপচাঁদজি এইসব শোনেন, আর, মিটমিট করে হাসেন; তারপর সারা এশিয়াকে এক করবার প্ল্যান করেন।
মা আর কাকিমা রাজনীতির আওতার বাইরে ধনে, হলুদ আর মেয়েদের যৌতুকের আলোচনা করেন। বউয়েরা পরস্পরের ফ্যাশন চুরির তাকে থাকে। নুন-লঙ্কার সঙ্গে সঙ্গে এ বাড়িতে ডাক্তার বাবুর ওষুধও কেনা হয়। প্রত্যেকদিন কারো না কারো হাঁচি পড়লেই অমনি ছুটে যাও ডাক্তারবাবুর কাছে। কিংবা যখন কারো অসুখ হল, আর, মা ডাল-ভরা রুটি বা দই-বড়া বানাতে শুরু করলেন, অমনি ডাক্তারবাবুকে বলে পাঠালেন, খেতে হয় তো আসুন।– ডাক্তারবাবু তখন নাতি-নাতনির হাত ধরে পৌঁছে যান।
বেরোবার সময় স্ত্রী বলেন, খেয়ো না যেন, শুনলে?
: হুঁ। তাহলে ফি আদায় করব কেমন করে? দেখ, বাপু, খোকা আর চুনিকেও পাঠিয়ে দিও।
কাকিমা গজর গজর করে বলেন, হায় রাম! লজ্জাও করে না তোমার!
মজা বাধে তখন, যখন মা’র শরীর খারাপ হয়। মা কেঁপে ওঠেন
: না, বাপু, আমি ওই হাতুড়ে ডাক্তার দিয়ে চিকিৎসা করাব না।
কিন্তু বাড়ির ডাক্তার ছেড়ে শহরের ডাক্তার আনতে যাবে কে?– সুতরাং ডাক্তারবাবু খবর শুনেই দৌড়ে আসেন। মাকে তাতিয়ে বলেন, একা একা পোলাও-জর্দা ওড়ালে তো অসুখে পড়বেই!
: তুমি যেমন পেটুক, অন্য লোককেও সেইরকম ঠাওরাও।– মা পর্দার আড়াল থেকে ঝনঝনিয়ে ওঠেন।
ডাক্তারবাবু দুষ্টুমি-ভরা চোখে মিটমিটিয়ে হাসতে হাসতে বলেন, আরে, এ তো হল অসুখের বাহানা। ভাবী, তুমি এমনিই ডেকে পাঠিও, আমি চলে আসব। এসব ঢঙ কর কেন?
মা জ্বলে উঠে হাতখানা টান মেরে সরিয়ে নিয়ে গালাগালি দিতে থাকেন। বাবা মিটমিট করে হাসেন।
এক রোগীকে দেখতে এলে বাড়ির সমস্ত রোগ মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে– কেউ পেট নিয়ে এগিয়ে আসে, কারো গায়ে ফুসকুড়ি বেরিয়েছে, কারো কান পেকেছে, কারো-বা নাক ফুলেছে।
: কী বিপদ, ডিপ্টি সাহেব! দুই-একটাকে বিষ দিয়ে দিই। আমায় পশু-ডাক্তার ঠাওরেছে নাকি যে, দুনিয়ার যত জানোয়ার ভেঙে পড়ল।– ডাক্তারবাবু রোগী দেখেন আর গজর গজর করতে থাকেন।
ছেলেপুলে হওয়ার আভাস পেলে ডাক্তারবাবু সারা সৃষ্টিকে গালাগালি দিতে শুরু করেন।
: হুঁহ্! মুফতের ডাক্তার! পয়দা করে যাও, হতভাগার বুকের উপর দুরমুশ পিটে বেড়াক।
কিন্তু ব্যথা উঠলেই তিনি নিজের বারান্দা থেকে আমাদের বারান্দা পর্যন্ত টহল দিতে থাকেন, আর চিৎকার করে করে সকলকে অতিষ্ঠ করে তোলেন। পাড়া-পড়শি মেয়েদের আসা মুশকিল হয়ে ওঠে। আসতে-যেতে হবু বাপকে পটাপট চাঁটি বসান, আর, সে নির্বোধের মতো সাহস দেখিয়েছে বলে শাপ-শাপান্ত করেন।
অথচ শিশুর প্রথম আওয়াজ কানে যাওয়া মাত্র তিনি বারান্দা থেকে দরজার সামনে এবং দরজা থেকে ঘরের ভেতরে চলে আসেন। পাগলের মতো হয়ে বাবাও চলে আসেন তাঁর সাথে সাথে। মেয়েরা গালাগালি দিতে দিতে পর্দা করে। তিনি প্রসূতির নাড়ি দেখে নিয়ে তার পিঠ চাপড়ে বলেন, বারে আমার বাঘিনী!– তারপর শিশুর নাড়ি কেটে তাকে গোসল করাতে শুরু করেন। বাবা অপ্রতিভ হয়ে অনভিজ্ঞ নার্সের মতো ব্যবস্থাদি করে দেন।
তারপর মা চেঁচাতে শুরু করেন, নাও, গজব খোদার! কপাল-পোড়া আঁতুড়ঘরে ঢুকে পড়ল!
বেগতিক বুঝে দুজনেই গাল-খাওয়া ছেলেপুলের মতো বাইরে ছুটে পালান।
এরপর, বাবার যখন পক্ষাঘাত হয়, তখন রূপচাঁদজি হাসপাতাল থেকে অবসর গ্রহণ করেছেন এবং তাঁর সমস্ত প্র্যাকটিস নিজের আর আমাদের বাড়িতে সীমাবদ্ধ হয়েছে। চিকিৎসা তো আরো কয়েকজন ডাক্তার করছিলেন। কিন্তু নার্স এবং মা-র সাথে সাথে রাত জাগতেন ডাক্তারবাবুই। তারপর, বাবাকে দাফন করে আসার পর থেকে পারিবারিক প্রীতি ছাড়াও দায়িত্ববোধ দেখা গেল তাঁর। ছেলেমেয়েদের ফি মাফ করাতে ইস্কুলে দৌড়ে যান, মেয়েদের যৌতুকের কান-বালির জন্যে জ্ঞানচাঁদের প্রাণ অতিষ্ঠ করে রাখেন। বাড়ির কোনো বিশেষ কাজ ডাক্তারবাবুর মত ছাড়া হয় না। পশ্চিমের উইংটা ভেঙে দুটো কামরা বাড়াবার কথা উঠলে ডাক্তারবাবুর মত অনুসারে সেটা চাপা দিয়ে দেওয়া হল। তিনি রায় দিলেন, এর চাইতে উপরে দুটো কামরা বাড়িয়ে নাও।– তাই করা হল। মজ্জন এফ.এ.-তে সায়েন্স নিতে চাইছিল না। ডাক্তারবাবু জুতো নিয়ে তেড়ে গেলেন, হাঙ্গামার নিষ্পত্তি হয়ে গেল। ফরিদা স্বামীর সঙ্গে ঝগড়া করে বাড়ি এসে উঠল। স্বামী ডাক্তারবাবুর কাছে গিয়ে হাজির হল। পরদিনই তার বউ বাড়ি পৌঁছে গেল।
