হঠাৎ বা’জি উঠে দাঁড়াল। তারপর চারিদিকে তাকাতে তাকাতে পেয়ে গেল সেই ট্রেটা, যেটাতে ফলের সালাদ রাখা হয়েছে খুব যত্ন করে। আপা কিছু করবার বা বলতে পারার আগেই ট্রের ঢাকনা খুলে বা’জি সেটা তুলে ধরল ভাইজানের সামনে। অতি বিনয়ের ভঙ্গি করে সে বলল, ‘এই যে স্যার নিন; সাজোঁ বা’জি খাবার তৈরিতেও যে ওস্তাদ, সেটাও আপনার জানা দরকার। নিন শুরু করুন।’
ভাইজান কয়েক চামচ তুলে নিলেন। বললেন, ‘চমৎকার! খোদার কসম, এমন চমৎকার সালাদ আমি আর খাইনি। কে করল?’
বা’জি অপাঙ্গে একবার আপার দিকে তাকাল, তারপর বলে ফেলল, ‘গরিব সাজোঁ বা’জি ছাড়া কে আবার?’ বদু হঠাৎ যেন তাজ্জব হয়ে তাকিয়েছিল আপার লাল হয়ে ওঠা মুখখানার দিকে। হঠাৎ সে লাফিয়ে উঠল, ‘আমি বলব ভাইজান, কে করেছে?’
সঙ্গে সঙ্গে আপা পেছন থেকে বদুর মুখে হাতচাপা দিল, তারপর তার একটা হাত ধরে টেনে নিয়ে ঘরের বাইরে চলে গেল। বা’জি এদিকে হাসিতে ফেটে পড়ল। হঠাৎ ভাইজানের একটা আশ্চর্য নতুন দৃষ্টি এসে পড়ল বা’জির মুখের ওপর। কেমন একটা ঝোঁকের মাথায় আমিও বেরিয়ে এলাম বাইরে। বাইরে পর্দার পাশে দেখলাম আপা চুপ করে দাঁড়িয়ে। ভেতর থেকে বা’জির গলা শোনা গেল, ‘আহ্ ছাড়ুন, যেতে দিন আমাকে, আহ্!’ তারপর আর কোনো শব্দ নেই।
পরের দিন আমরা সব লনে বসে আছি। ভাইজান তাঁর ঘরে বসে পড়েছিলেন হয়তো। হঠাৎ বা’জির গলা শুনলাম। ভাইজানের ঘরে ঢুকতে ঢুকতে সে বলছে, ‘আসুন স্যার, একটা চাঁটি মারি আপনাকে; কী বলেন? ‘
সঙ্গে সঙ্গে ভাইজান বললেন, ‘সাবধান বাছাধন, একটা কিক্ মাত্র দরকার, এক কিকেই উড়ে যাবে শূন্যপথে!
বোধহয় ভাইজান তার নমুনাটাও দেখাতে শুরু করেছিলেন, বা’জির অস্ফুট আর্তকণ্ঠ ভেসে এল, ‘উহ্, কী অসভ্য! সবসময় ওই গোদা পা দুটো কেন ইউজ করেন, বলুন তো?’
ভাইজানও ছাড়বার পাত্র নন। তিনি বললেন, ‘তাহলে হাতই ইউজ্ করি এবার ‘ বা’জির গলা আবার গুমরে উঠল, ‘হেই, উহ্হ্, না, না, না– মাফ করুন এবারটি।’ সঙ্গে সঙ্গে শোনা গেল দুটো পা আছড়ানোর আওয়াজ। কয়েক সেকেন্ড পরেই আর কোনো শব্দ নেই।
একদিন বদু হঠাৎ ছুটতে ছুটতে এল আপার কাছে। হাঁপাতে হাঁপাতে বদু বলছিল, ‘আপা, আপা, দেখ এসে, বা’জি আর ভাইজান কুস্তি লড়ছে। এস না, আহ্ এস শিগগির।
ফ্যাকাশে মুখে আপা একটা নিশ্চল মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে আছে দেখে বদু বলল, ‘আম্মা কোথায়, আম্মাকে দেখাব!’ বলেই সে আবার ছুটে যাচ্ছিল। এবার আপা হঠাৎ খপ্ করে তার একটা হাত ধরে ফেলল। বলল, ‘বদু এস, দেখ এসে, কতগুলো টফি রেখেছি তোমার জন্যে। এস নেবে।’ বদু কিছু বুঝতে পারছিল না। সে-ও আপার সঙ্গে সঙ্গে গিয়ে রান্নাঘরে ঢুকল।
আমার বইয়ের আলমারিতে একদিন দেখা গেল ‘হার্টব্রেক হাউস’ অযত্নে পড়ে আছে। ফলের সালাদের ট্রেটাও দেখা গেল রান্নাঘরের এক কোণে পড়ে, সেটাও খালি। আপা আগের মতোই রান্নাঘরে কাজ করছে, কেবল তার ঠোঁট দুটো দেখলাম জড়ানো, কোনো স্পন্দন নেই সেখানে।
.
সাজোঁ বা’জি আর তাসাদ্দক ভাইয়ের বিয়ের দুবছর পর আর একবার তাঁরা আমাদের বাড়িতে বেড়াতে এলেন। বা’জি আর সেই আগের বা’জি ছিল না; হাসিতে তার প্রাণ ছিল না; চেহারায় সেই জ্যোতি ছিল না আর তার সেই উজ্জ্বল চকচকে কপালের উপর কালো কালো রেখা জেগেছে। ভাইজানও যেন দমে গেছেন অনেকখানি।
রাত্রের বেলা আম্মা ছাড়া আর সবাই আমরা রান্নাঘরে বসে গল্প করছিলাম। হঠাৎ ভাইজান বদুকে প্রশ্ন করলেন, ‘বদু, সাজোঁ বা’জিকে বিয়ে করবে?’
‘নাহ্।’ বদু সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিল, ‘আমি ঠিক করেছি, বিয়েই করব না।’
সেই অনেকদিন আগেকার একটি সন্ধ্যা আমার মনে পড়ে গেল। ‘জানেন ভাইজান –আমি হঠাৎ বলতে লাগলাম, ‘অনেকদিন আগের কথা; বদু সেদিন প্রথম বলেছিল, আমি সাজোঁ বা’জিকে বিয়ে করব। আম্মা ওকে বলেছিলেন, আপাকে বিয়ে করতে। উত্তরে বদু বলেছিল, না আপা ভালো নয়। সে হচ্ছে এই পোড়া কাঠটার মতো। আর সাজোঁ বা’জি?… হঠাৎ জ্বলন্ত বাল্বটার দিকে দেখিয়ে বলেছিল, ঠিক ওটার মতো।’
আমি সব কথা শেষ করতে পারিনি, হঠাৎ মাথার উপরকার জ্বলন্ত বাল্বটা নিভে গেল, সমস্ত ঘরটা গেল অন্ধকারে তলিয়ে। ম্লান কণ্ঠে ভাইজান বলে উঠলেন, ‘হুঁ’, মনে আছে আমারো সেকথা।’ তারপর হঠাৎ তিনি বিরক্তির সুরে বললেন, ‘আর ছাই ইলেকট্রিক্ বালবেরও যে কী হয়েছে আজকাল, যখন-তখন ফস্ করে নিভে যায়।
আপা নীরবে একটা পোড়া কাঠ ছাইয়ের গাদায় ঠেলে দিচ্ছিলেন, যাতে ছাই ঢাকা আগুনের ফুলকিগুলো ভালো করে নিভে যায়।
ভাইজান বললেন, ‘উহ্ যা ঠাণ্ডা পড়েছে আজকাল।’ তার স্বরটাও যেন বরফের স্তূপে ঢাকা। ভাইজান হঠাৎ উঠে পড়লেন, তারপর আস্তে আস্তে এগিয়ে বসলেন চুলোর পাশে গিয়ে, যেখানে আপা বসেছিল। ভাইজান তাঁর দুটো হাত মেলে ধরলেন চুলোর উপর, তখনো একটু একটু তাপ আছে চুলোতে। আপা এইমাত্র নেড়েচেড়ে তুলেছে চুলোর ছাইগুলো।
অর্থোস্ফুট অচেনা একরকম স্বরে ভাইজান আবার কথা বললেন, ‘সেদিন খালাম্মাই ঠিক বলেছিলেন, পোড়া কাঠের ভেতরেও অনেক সময় আগুন লুকিয়ে থাকে; যদিও ওপর থেকে দেখা যায় না। তুমি কী বল সিদা?’
আপা নড়েচড়ে উঠল, সে বোধহয় পালাতে চায়। হঠাৎ হিস্ করে একটা আওয়াজ হল, কোথাও জ্বলন্ত অঙ্গারের উপর এক ফোঁটা পানি পড়ল। আপার চোখের পানি, তা বোঝা গেল। ভাইজান কথা বলবার জন্যে চেষ্টা করছিলেন। অনেক চেষ্টার পরেই বোধহয় একটা আর্ত সুর তাঁর গলা থেকে ভেঙে ভেঙে বেরিয়ে এল, ‘এখনো অনেকগুলো ফুলকি আছে ছাইয়ের ভেতর। মিনতি করছি সিজদে, একেবারে নিবিয়ে দিও না, দিও না। দেখ কী অসহ্য ঠাণ্ডা!’
