বইটা আপা সবসময় বাক্সে লুকিয়ে রাখত। রাত্রে শুয়ে শুয়ে লক্ষ করত, আমি কখন ঘুমিয়ে পড়ি। আমি ঘুমুলে বোধহয় পড়তে শুরু করত। ব্যাপারটা বুঝতে পেরে একদিন এক মজা করলাম আমি। শুয়ে পড়লাম ঠিক সময়ে কম্বল জড়িয়ে, কিন্তু ঘুমোলাম না। তবে ঘুমের ভান করলাম পুরোপুরি। আপা যখন নিশ্চিন্ত মনে বইটা খুলে পড়তে শুরু করেছে, হঠাৎ আমি মাথা তুলে প্রশ্ন করে ফেললাম, ‘বলি আপা, এসব ‘হার্টব্রেক হাউস্’-ফাউস্ কী ব্যাপার! নিশ্চয়ই আমাদের হাউস?’
আপা চমকে উঠে জবাব দিল, ‘জানিনে।’ তারপর বইটা ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে শুয়ে পড়ল। একদিন সন্ধ্যায় হঠাৎ ভাইজান আমাকে জিগ্যেস করলেন, ‘জাহিনা, তোমার আপা ফলের সালাদ বানাতে পারে?’ আজও রেগে আমি জবাব দিলাম, ‘আপাকে গিয়ে কেন জিগ্যেস করেন না?’
‘বাপরে!’ ভাইজান চোখ বড় বড় করে বললেন, ‘মনে হচ্ছে তুমি কারো সঙ্গে যুদ্ধে নেমেছ।’
‘কী?’ আমি আরো বেশি রেগে গেলাম, ‘আমি কি ষাঁড় নাকি যে যুদ্ধ করব?’
ভাইজান হাসতে হাসতেই বললেন, ‘না, না, ষাঁড় নও নিশ্চয়ই, তবে দেখতে তুমি অ-নে-ক-টা…’
হঠাৎ কেন যেন আমার রাগ পড়ে গেল। ভাইজান বলছেন, ‘দেখ জাহিনা, আমি আবার যুদ্ধটুদ্ধ একটু বেশি পছন্দ করি। আর বিয়েও করব এমন মেয়ে, যে আমার সঙ্গে সারাদিন যুদ্ধ করে কাটাতে পারবে, কখনো ক্লান্ত হবে না।’
ভারি খুশি খুশি লাগছিল আমার। হঠাৎ প্রশ্ন করলাম, ‘আচ্ছা ভাইজান, ফলের সালাদ কী জিনিস?’
জবাবে তিনি বললেন, ‘এই সাদা, লাল, নীল, কালো সব মিলিয়ে যেটা হয় আর কী। আমার খুব পছন্দ ওটা। কিন্তু তোমাদের এখানে তো দেখছি, জীবনভোর পুডিংই খেতে হবে। খালি পুডিং আর পুডিং।’
পরে বুঝতে পেরেছিলাম, আপা আমাদের সমস্ত কথাবার্তাই কোথাও লুকিয়ে থেকে শুনেছিল। কারণ সেদিন রাত্রে দেখলাম আপার হাতে একটা নতুন বই– বইটা ‘পাকপ্রণালি’। এরপর থেকে রান্নাঘরে প্রায়ই দেখতাম আপার হাতের নাগালে আলাদা করে ঢাকা একটা ট্রে। ট্রেটাতে কী থাকে আন্দাজ করেছিলাম। আপা এখন রোজ ফলের সালাদ বানাবার মহড়া দিচ্ছে। কিন্তু আপাকে ক্ষেপাবার জন্যে একদিন বদুকে লেলিয়ে দিলাম ট্রেটার পেছনে। বদু ট্রেটা লুফে নিয়ে এলে তাকে বললাম ভাইজানের কাছে নিয়ে ওটার নাম জিগ্যেস করতে; সঙ্গে সঙ্গে আপার যে কঠোর দৃষ্টি আমার মুখের ওপর এসে পড়েছিল, এর আগে আর কোনোদিন তার সেরকম দৃষ্টি আমার চোখে পড়েনি। সারাদিন আপা অতিরিক্ত গম্ভীর হয়ে ছিল– রাত্রে শুয়ে শুয়ে মুখ লুকিয়ে কাঁদছিল। আমার ভারী দুঃখ হচ্ছিল, লজ্জাও হচ্ছিল। কিন্তু আপার কাছে গিয়ে মাফ চাওয়ার সাহস হল না।
কয়েকদিন কেটে গেল। একদিন আমাদের জ্ঞাতি সম্পর্কের চাচাতো বোন সাজিদা, যাকে আমরা সাজোঁ বা’জি বলতাম, সে এল আমাদের বাড়ি বেড়াতে। জানাল, কয়েকদিন এখানে থেকে যাবে সে। আমরা ভারী খুশি হলাম।
সাজোঁ বা’জি দুনিয়ার সমস্ত স্ফূর্তি যেন সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিল; পাশের বাড়ির সাহেরা আর সুরাইয়া এসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে তার সঙ্গে গল্প করে যেত। আমাদের নিষ্প্রাণ বাড়িটাও হাসি-হুঁল্লোড়ে মেতে উঠল। বদুর মুখে সবসময় লেগে আছে– ‘সাজোঁ বা’জি– সাজোঁ বা’জি! আমরা সাজোঁ বা’জিকে বিয়ে করব।’ বা’জিও বদুকে পেয়ে বসল, ‘এই বদু, একবার আয়নার সামনে মুখখানা দেখ তো! শিগগির ভালো করে মুখ-হাত ধুয়ে এস; তারপর আমার সঙ্গে কথা বলবে, যাও।’
বড় মিষ্টি করে বকতে জানত সাজোঁ বা’জি। সাজোঁ বা’জি যখন তখন ভাইজানের দিকেও গলা বাড়াতে লাগল। ‘তাই নয় ভাইজা– আ– ন?’ অথবা– ‘ঠিক বলিনি ভাইজা– আ– ন?’
তাসাদ্দক ভাইকে আপা বলত ভাই সাহেব। বা’জি বলে ভাইজান; আর ‘জানে’র উচ্চারণটা এমন কেঁপেকেঁপে লতিয়ে লতিয়ে একটা ঝঙ্কার তুলে শেষ হত যে, ‘ভাই’টা ইতোমধ্যে তলিয়ে যেত অতলে।
বা’জি আসার পর থেকেই আপা যেন আরো বেশি গম্ভীর হয়ে গেল। বদু ভাইজানকে ছেড়ে দিয়ে বা’জিকে নিয়ে মেতে উঠল; এদিকে বা’জি সবসময় ভাইজানের সঙ্গে ক্যারম্ বা দাবা নিয়ে মত্ত। বা’জি সোজাসুজি বলে ফেলত, ‘আসুন ভাইজা-আ-ন, এক বোর্ড খেলা যাক।’ কিন্তু ভাইজানের স্বভাবই ছিল আলাদা। যখন টের পেতেন, আশেপাশে কাছাকাছি কোথাও রয়েছে বা’জি, তখনই বদুকে বলতেন, ‘এস তো ইয়ং-ম্যান, দাবার আসরে হেরে গিয়ে মুখ ফোলাবার ইচ্ছে যার আছে, এস বসা যাক।’ বা’জি কিন্তু ভাইজানের ইঙ্গিতে সাড়া দিতে ভুলত না! বলত, ‘কাল কে হেরেছিল স্যার, মনে নেই। তাছাড়া মাঝে মাঝে যে হারি, সে তো ইচ্ছে করে আপনার মান বাঁচাই। একটা মেয়ের কাছে হেরে গেলে লজ্জা করবে না? তাই দয়া করে– ‘ বা’জিকে কথায় হারানো অসম্ভব ছিল।
একদিন ভাইজান এক নতুন কাণ্ড করলেন। খাবারঘরে না গিয়ে তিনি এসে খেতে বসলেন রান্নাঘরে। আপা চুলোর পাশেই বসে। সাজোঁ বা’জির দোপাট্টার আঁচল ধরে বদু ঘুরে বেড়াচ্ছে চারপাশে। বা’জি কথা বলতে শুরু করল, ‘পেয়ারি আপা, ভাইজানকে অতগুলো রুটিই খেতে হবে নাকি? তার ওপর আবার পুডিং আছে। আর হ্যাঁ, না খেয়ে উপায়ই-বা কী? ফেলে রাখলে আবার চাচি-আম্মার বকুনি। ভাইজানকে স্বাস্থ্যবান, ধনী আর বিদ্বান করে তোলা তো চাচি-আম্মার জন্যে ফরজ্ হয়ে গেছে, তাই নয় ভাইজা-আ-ন?’ সবাই হো হো করে হেসে উঠল তার কথায়।
