বদু বোধহয় নিজের বউয়ের কথাই ভাবছিল, সে বলল, ‘আমি সাজোঁ বা’জিকে বিয়ে করব।’
‘ধ্যেৎ!’ ভাইজান তার প্রস্তাবটা তেমন পছন্দ করলেন না বলে মনে হল। এদিকে আম্মা ওদের কথার ফাঁকে আপার মুখের দিকে এক মুহূর্ত চোখ বুলিয়ে নিলেন। আপা কিন্তু দেখেও সেটা না দেখার ভান করল। সে তখন পায়ের আঙুলের নখ খুঁটছে নুয়ে নুয়ে।
ওদিকে বদু ভাইজানকে বলছে, ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, জানি আমি। আপনি তো আপাকে বিয়ে করবেন, না ভাইজান?’
ভাইজান বললেন, ‘কিন্তু তোমার আপা তো এ-ও জানে না, পুডিংয়ে কতটুকু চিনি লাগে। পুডিংয়ে সবসময় চিনি কম আদৌ ভালো লাগে না।’
‘কিন্তু আব্বা যে চিনি কম চান, তাই তো আপা–।’ বদু ওকালতি করছে আপার হয়ে। ভাইজান বললেন, ‘ও, তাহলে তোমার আপা কেবল আব্বার জন্যেই করেন ওসব, আমাদের জন্যে নয়?’
বদু এবার বিরক্ত হল, ‘আচ্ছা দাঁড়ান, আপাকে আমি সব কথা বলে দেব।’
‘আরে না, না।’ ভাইজান আবার ঘাবড়ে গেলেন, ‘ধ্যেৎ! তুমি দেখছি একটা লাউডস্পিকার। আচ্ছা এস, ঢাক বাজাই– এই যে ব্যঙ্গ ব্যস্– ডগ্ ব্যস্– উহ্ বদু, তোমার বন্ধু হয়ে দেখছি জানের শেষ!’
আপা তার আনন্দের উচ্ছ্বাস আর বোধহয় নিজের মধ্যে লুকিয়ে রাখতে পারছিল না। হঠাৎ সে উঠে চলে গেল রান্নাঘরের দিকে। আমি ভীষণ হাসছিলাম আর আম্মাও তাঁর সশব্দ হাসি লুকোবার জন্যেই বোধহয় মুখের উপর দোপাট্টার একটা ধার চাপা দিলেন। আমার শোবার ঘরে আমি আর আপা বসে ছিলাম, আমার হাতে একটা বই। হঠাৎ ভাইজান এসে হাজির। জিগ্যেস করলেন, ‘কী পড়ছ জাহিনা?’
সত্যি কথা বলতে কি, জাহিনা নামটা শুনলেই খুশিতে আমার নাচতে ইচ্ছে করত। নূরজাহান নামটা আজকাল তো তৃতীয় শ্রেণির বলেই মনে হবে। তাছাড়া ও-নামটা শুনলেই কোনো বুড়ি দাদি বিবির চেহারাই ভেসে ওঠে চোখের ওপর– ইতিহাসের পুরনো পাতায় ভূতের মতো যে লুকিয়ে আছে। কিন্তু ভাইজান সেই শুকনো বাসি রুটিকে একেবারে তাজা করে তুলেছেন। আমি যে নূরজাহান থেকে জাহিনা হয়েছি, এটা তাঁরই কীর্তি। যখনই ও-নাম তাঁর মুখে শুনতে পাই, নিজেকে মনে হয় ইরানের শাজাদি বলে। ভাইজান আপাকে বলতেন সিজদা, অবশ্যি আপা যখন ছিল এই এতটুকুন। এখন তো ভাইজান আপার আসল নাম অর্থাৎ সাজেদা শব্দটাও উচ্চারণ করতে সাহস পান না। ভাইজানের প্রশ্নের জবাব দিলাম, ‘এই– ঠিক পড়া নয়, পড়বার চেষ্টা করছি।’
ভাইজান আবার প্রশ্ন করলেন, ‘বার্নার্ড শ’ পড়েছ?’
বললাম, ‘না।’
ভাইজান এবার অপাঙ্গে আপার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘তা তোমার আপা ‘হার্টব্রেক হাউস’ বইটা পড়েছেন নিশ্চয়ই?’
আপা যেদিকটায় বসেছিল, সেদিক থেকে ছোট্ট অর্ধোস্ফুট একটা ‘না’ ভেসে এল। আপার চোখের পাতা অবশ্যি মেঝের দিকেই নামানো ছিল।
প্রায় উত্তেজিত স্বরে ভাইজান বললেন, ‘ওহ্ জাহিনা, কী বলব তোমাকে, ওটা তো বই নয়, একেবারে পুরোপুরি শরাব। তোমার ওটা নিশ্চয়ই পড়া উচিত। হ্যাঁ, পরীক্ষাটা শেষ করেই পড়বে অবশ্যি, চাও তো আমিই দেবখন– খুশি হয়েই দেব।’
আমি যখন ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানালাম তাঁর প্রস্তাবে, তখন ভাইজান আবার আর-এক প্রশ্ন করে বসলেন, ‘আচ্ছা জাহিনা, তোমার আপা ম্যাটরিকের পর আর পড়লেন না কেন?’ এই ধরনের প্রশ্ন আমার কখনো ভালো লাগত না। এবার আমি রেগে গিয়েই বললাম, ‘তার আমি কী জানি, আপাকেই কেন জিগ্যেস করছেন না?’
অবশ্যি আমি জানতাম, আপা কেন কলেজে গেল না– তার মতে কলেজের মেয়েরা পড়াশোনার চাইতে ফ্যাশান-প্রতিযোগিতায়ই মত্ত থাকে বেশি। সেখানে তারা লেখাপড়ার নাম করে আসলে ফ্যাশানের মেলা বসায়। আপার এই সংকীর্ণ মনোভাব আমায় ভীষণ ক্ষেপিয়ে তোলে। আসলে ও আলসে, রান্নাঘরে বসে বসে পাঁচশোরকম রান্না করাতেই ওর আনন্দ বেশি– ফু! ভাইজানকে নিয়ে এই এক জ্বালাতন! সবসময় আমাকে আপার হয়ে কথা বলতে হবে– কেন, আমি কি দোভাষী! ওদিকে শাজাদি তো ভিজে বেড়ালটির মতো চুপ করে বসে থাকবে ঠায় 1
ওইদিন সন্ধ্যায় নাশতা খেতে বসে আব্বা হঠাৎ গর্জন করে উঠলেন। ‘উহ্, একী পুডিং হয়েছে! চিনির জন্যে মুখে দেওয়া যায় না! বলি সাজেদা, চিনি কি খুব সস্তা হয়েছে না-কি?’
অন্য সময় হলে ভয়ে আপার মুখ শুকিয়ে যেত। কিন্তু আশ্চর্য, আজ তার মুখেচোখে ভয়ের কোনো চিহ্ন দেখা গেল না। বরং চোখের মণিতে তার কৌতুকের আভাস। প্রশ্নের জবাবে সে শুধু বলল, ‘তাই বোধহয়।’ বলেই আবার রান্নাঘরের দিকে পা বাড়াল।
আব্বা আরো রেগে গজরাতে শুরু করলেন। হঠাৎ আম্মা সেখানে হাজির। বললেন, ‘দেখ, তুমি না হয় চিনি খেতে চাও না, কিন্তু তাই বলে সবাই কেন তোমার জন্যে ভুগবে? আল্লা মেহেরবান, তাই ফেরেশতার মতো একটা সুন্দর জোয়ান ছেলে আমাদের ঘরে বাস করছে, ওর দিকে একটু দেখতে হবে না কি?’
আব্বা হঠাৎ ঢোক গিললেন, ‘তা– তা আমাকে বলতে হবে তো, নইলে– যত সব –হুঁ!’
আব্বা শান্ত হয়ে গেলেন। আম্মা তাঁর পাশের চেয়ারে বসে পড়লেন– তারপর ফিস্ ফিস্ করে আলাপ শুরু হল।
পাশের বাড়ির সাহেরা প্রায়ই দেয়ালের উপর মাথা উঁচিয়ে, আপার সঙ্গে গল্প করত। আপা দু-এক কথায় জবাব দিয়ে তাড়াতাড়ি রান্নাঘরে ঢুকে পড়ত। বলত, ‘উহ্, কত কাজ পড়ে রয়েছে।’
সেই আপাকে যখন হঠাৎ দেখলাম সাহেরাদের বাড়ি থেকে ফিরে আসতে, আমি তাজ্জব হয়ে গেলাম। তাই তো, কী ব্যাপার! তক্ষুনি ছুটে গেলাম সাহেরার কাছে। জানতে চাইলাম, আপা কেন গিয়েছিল তাদের বাড়ি। সাহেরা নখে পালিশ লাগাতে লাগাতে বলল, ‘এসেছিল একটা বই নিতে– ইয়ে, এই ‘হার্টব্রেক হাউস্’ বইটা নিয়ে গেল।’ আমি তখন অন্য আলাপ জুড়ে দিলাম।
