‘কী জানি, ওসব অপরের ব্যাপারে আমাদের মাথা গলাবার দরকারটা কী শুনি?’ আম্মা বিরক্ত হয়েছেন তা বোঝা গেল। কিন্তু আব্বা তবু বললেন, ‘না, না, সেকথা আমি বলিনি। আমি বলছিলাম কী, ওরকম বয়সে মেয়েদের একটু শান্ত থাকা দরকার। সারাদিন অত হৈ হৈ করলে বাইরের লোক জানতে পারে, অমুক বাড়িতে যুবতী মেয়ে আছে; আর সেটা কী– বুঝতেই তো পার। তবে হ্যাঁ, আমাদের সাজেদা কিন্তু তেমন মেয়ে নয়, কী বল?’ বলতে বলতে দেখা গেল আব্বার চোখেমুখে গর্বিত পিতার আনন্দোচ্ছ্বাস।
কথাগুলো শুনে অবধি আমার কিন্তু রাগে মাথা খুঁড়তে ইচ্ছে হচ্ছিল : ‘হুঁ, তা তো বটেই, একেবারে হেশতের হুর। তাঁরা তো ভাববেনই ওকথা। নিজের মেয়েকে কে আর খারাপ বলে ভাবতে পারে! কিন্তু আমিও তো তাঁদের মেয়ে!’
আমার ইচ্ছে হল এক্ষুনি রান্নাঘরে ছুটে যাই আর সেই হাবা হুরপরীটার সঙ্গে বেশ খানিকটা ঝগড়া করে গায়ের ঝাল মেটাই। সারাদিন কিছু খেলাম না আমি। কারো সামনে যেতেও ইচ্ছে হচ্ছিল না। সেদিন যেন ভালো করেই বুঝতে পেরেছিলাম : আব্বা কিছুই জানেটানে না, জানে কেবল হুঁকো টানতে, নয় তো বই খুলে বসে থাকতে- যে-সব বইয়ের ছাই এক অক্ষরও বোঝা যায় না।
ভালো লাগত এক তাসাদ্দক ভাইকে। আমাদের বাড়িতে ওই একটা মানুষই থাকতেন, যাঁর কথা শুনতে শুনতে নাওয়া-খাওয়া ভুলে যেতাম; সত্যি, কী সুন্দর করে তাসাদ্দক ভাই কথা বলতেন। আব্বা বাড়ি না থাকলে মাঝে মঝে তিনি গানও গাইতেন। গানের কথাগুলো অবিশ্যি ভালো করে মনে পড়ে না আর। গানটা যেন কোনো একটা মেয়েকে নিয়ে লেখা, যে-মেয়েটি কথা বলত না, মজা লাগত যার ভাবভঙ্গি দেখে– কিন্তু যার চোখ দুটি ছিল ভারী কোমল, যেন আধঘুমে জড়ানো ছিল সে চোখের পাতা, আর সেই পাতায় পাতায় জড়িয়ে ছিল যেন কোনো কাহিনী– হয়তো এমনিই ছিল সে গানের কথাগুলো।
কিন্তু তাসাদ্দক ভাই যখনই গান গাইতেন, আপা তখন মৃদু মৃদু হাসত, যেমন হাসা তার স্বভাব ছিল। যে-হাসি তার মিলিয়ে যেত না সহজে, হাসবার কিছু না পেলে সে তখন বদুকে ধরে গালের উপর দু-একটা টোকা মেরে বলত, ‘হ্যাঁরে বদু, তুই আর চেঁচাচ্ছিস না কেন, আয়, চেঁচাবি?’ বলেই সে আবার হাসতে শুরু করত, সেই অনুচ্চারিত হাসি, তার নিজের জন্যে যে-হাসি।
তাসাদ্দক ভাই ছিলেন আমাদের খালাতো ভাই। হোস্টেলে থেকে তিনি পড়াশুনা করতেন। কিন্তু আম্মা যেদিন খালা-আম্মার কাছে জানতে পেলেন, তাঁর বোনপো হোস্টেলে অখ্যাদ্য খেয়ে খেয়ে শরীর নষ্ট করেছে, সেইদিনই তাসাদ্দক ভাইকে বাক্স-বিছানা গুটিয়ে চলে আসতে হল আমার বাড়িতে। আমরা তাঁকে ডাকতাম ভাইজান বলে।
আমাদের আর বদুকে নিয়ে ভাইজানের কৌতুকের সীমা ছিল না। আমরাও তাঁকে ছাড়া থাকতে পারতাম না আর তিনিও বদুর হাজার জ্বালাতনেও ক্লান্ত হতেন না। কিন্তু মজা হচ্ছে, আপার সামনে পড়লেই ভাইজান কেমন গম্ভীর হয়ে যেতেন। একটা কথাও তিনি যেন বলতে পারতেন না। এদিকে ভাইজানকে দেখলেই আপার দোপাট্টাও নেমে আসত তার মাথা-মুখ ঢেকে একেবারে বুকের উপর। ভাইজান তাতে আরও বেশি ঘাবড়ে যেতেন যেন। নিজের অজ্ঞাতেই যেন আপার হাত দুটো ঘোরাফেরা করছে একাজে ওকাজে, চোখ তার নিজের পায়ের দিকে নামানো। একটা মেশিনের সঙ্গে কথা বলা কারো পক্ষে সম্ভব নয়।
ভাইজান যখন বদুকে পেতেন একা, তখনই আপার কথা জিগ্যেস করতেন, ‘হ্যাঁ বদু, তোমার আপা এখন কী করছে, বল তো?’ বদু লাফিয়ে উঠত, ‘কী ছাই করবে, হয়তো চুপ করে বসে আছে। আমি ডেকে আনছি।’ বলেই বদু হয়তো ছুটতে চাইত।
ভাইজান ঘাবড়ে যেতেন ভীষণ, ‘না, না, না, বদু, সে কী, তার কিছু দরকার নেই; এমনিই আমি জিগ্যেস করছিলাম।’ বলেই তিনি দু-হাতের মধ্যে বদুকে আটকে ফেলতেন। তার পরেই ছোট্ট ছেলের মতো আবদেরে সুরে বলতেন, ‘যাও বদু, তুমি মানুষটা ভালো নও। যা কিছু বলব, তাই নিয়েই ঢাক পেটাতে হবে?’
.
বদুকে ঠাণ্ডা করা এত সহজ ছিল না। সে বলত, ‘কী, তুমি আমাকে ঢাক বললে ভাইজান?’ ভাইজান বলতেন, ‘আরে না, না, তা কখন বললাম? এই দেখ, ঢাক তো এমনি করে বাজে।’ বলেই তিনি টেবিলের উপর দুহাতে আওয়াজ করতেন– ব্যঙ্গ — ব্যস্,– ডস্– ডস্– ‘এই যে এমনি করে তো ঢাক বাজে। তুমি কেন ঢাক হতে যাবে?’ যা-তা আওয়াজ আর কথাবার্তার তোড়ে বদুর প্রতিবাদের ভাষা ভেসে যেত, ডুবে যেত।
এদিকে ভাইজান যখনই বদুকে নিয়ে এইসব কাণ্ড করতেন, আপা তখন পাশের ঘরের দরজায় এসে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকত, ওদের সব কথাবার্তা সে শুনত। তারপর চলে আসত রান্নাঘরে। সেখানে চুলোর পাশে বসে বসে সে হাসত, সেই চাপা মৃদু হাসি। তন্ময়তার ফাঁকে তার দোপাট্টা খসে পড়ত মাথার উপর থেকে ঘাড়ের নিচে, গালের পাশ ঘেঁষে নেমে গেছে একগোছা কালো কোঁকড়া চুল; আর তার চোখের তারা যেন নাচছে চুলোর আগুনের জ্বলন্ত শিখার তালে তালে। ঠোঁট দুটো তার বারবার কেঁপে উঠছে, যেন গানের কলি আস্তে আস্তে নেচে বেড়াচ্ছে সেখানে; কিন্তু একটি শব্দও উচ্চারিত হত না। হঠাৎ আম্মা কিংবা আব্বা এসে পড়লেই তাড়াতাড়ি আপা দোপাট্টা তুলে মাথায় দিয়ে চুলোর কাছে চলে যেত।
একদিন সন্ধ্যায় আমরা লনে বসেছিলাম চুপ করে আমি, আপা আর আম্মা। একটু দূরে ভাইজান আর বদু এসে বসল। তারা টের পায়নি আমরা এদিকে বসে আছি। ভাইজান গল্প শুরু করলেন, ‘জানো বদু, আমি এমন একটি মেয়ে বিয়ে করব, যে নাকি ইংরেজিতে কথা বলতে পারবে, সব বই যে পড়তে পারবে আর যে আমার সঙ্গে দাবা খেলবে, ক্যারম খেলবে আর ব্যাডমিন্টনও খেলবে। তুমি জানো বদু, শাটেল্কক্ কাকে বলে? জানো না? শাটেল্কক্ হচ্ছে পাখির পালকের তৈরি একরকম ছোট্ট বল। র্যাকেটের এক ঘায়ে সেটা উড়তে থাকে আর আওয়াজ হয়—ভর্র্র্– ডিজ্জ্জ্– টিন্ন্ন্–বুঝলে? আর হ্যাঁ, আমি যাকে বিয়ে করব, তার সবচেয়ে বড় গুণ হবে, সে চমৎকার সব রান্না জানবে।’
