বদুর সমস্ত মুখ হঠাৎ উজ্জ্বল হয়ে উঠল, বলল, ‘আমি সাজোঁ বা’জিকে বিয়ে করব।’
আম্মার বোধ করি খুব মজা লাগছিল। আপার দিকে তিনি তাকালেন একটু মৃদু হেসে, তারপর বদুকে লক্ষ করে বললেন, ‘কিন্তু তোমার আপা ভারী ভালো মেয়ে তাই নয় বদু?’
বদু সেকথা কানেই তুলল না। বরং সে বলল, ‘শুনবে আম্মা, আপা কেমন মেয়ে?’ বলেই সে চারদিকে চোখ ফেরাতে লাগল, তারপর হঠাৎ চোখ পড়ল চুলোর পাশে ফেলে-রাখা একটা পোড়া কাঠের দিকে। বদু হঠাৎ একটা আঙুল তুলে সেটা দেখিয়ে বলে ফেলল, ‘এই যে, ঠিক ওটার মতো।’ তার পরেই সে তাকাল উপরের দিকে; মাথার উপর জ্বলছিল বিজলিবাতি। এবার জ্বলন্ত বাল্বটা দেখিয়ে সে বলতে লাগল, ‘সাজো বা’জি হচ্ছে ঠিক ওইরকম, ওই যে।’
সবাই আমরা হো হো করে হাসছি, ঠিক এই মুহূর্তে ঘরে ঢোকেন তাসাদ্দক ভাই। আম্মার ইচ্ছে হল তাসাদ্দক ভাইকেও আমাদের আনন্দের শরিক করে তুলতে; তাই তিনি হাসিমুখে তাঁকে বললেন, ‘তাসাদ্দক, বদুকে জিগ্যেস কর তো, ওর আপা কেমন?’
এদিকে তাসাদ্দক ভাই ঘরে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গেই আপার মুখ ঘুরে গেছে উল্টো দিকে, চুলোর দিকে মুখ ফিরিয়ে হঠাৎ আপা রান্না নিয়ে ভারি ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন।
তাসাদ্দক ভাই বদুকে ডেকে জিগ্যেস করলেন, ‘হ্যাঁ, বল তো, আপার কথা কী বলছিলে?’ বদু তৈরিই ছিল। প্রশ্নের সঙ্গে সঙ্গেই সে সেই পোড়া কাঠটার দিকে এগিয়ে যেতে যেতে বলল, ‘দেখাচ্ছি।’ কিন্তু সেটা হাতে পাওয়ার সুযোগ ঘটল না তার। আপা খপ্ করে তার হাতটা ধরে ফেলে মুখে তার হাতচাপা দিয়ে ফিস্ ফিস্ করে বলল, ‘ছিঃ বদু, এসব কী?’
অসহায় বদু তখন ছটফট করতে লাগল। আম্মা তখন বলে উঠলেন, ‘কী বোকা ছেলে! সত্যি বদু, ওটাতে হাত দেওয়া ঠিক নয়, বুঝলে? কে জানে, ওর ভেতরে হয়তো আগুন আছে।’
‘হুঁ, সব তো পুড়ে গেছে।’ বদু কান্নার সুরে প্রতিবাদ করল আম্মার কথার। আম্মা নরম সুরে আবার বললেন, ‘না বদু, সবসময় বোঝা যায় না। ওপর থেকে দেখে মনে হচ্ছে বটে পুড়ে গেছে; কিন্তু ভেতরে অনেক ফুলকি থাকতে পারে।’
আম্মার কথায় বদুর চোখ দুটো একটু বড় হয়ে উঠল বটে, কিন্তু মন তার সায় দিচ্ছিল না তাঁর কথায়। তাই সে আপাকেই এবার জিগ্যেস করল, ‘হ্যাঁ আপা, সত্যি ওর মধ্যে আগুন আছে? বল না!’
আপার ঠোঁট দুটো একটু যেন কেঁপে উঠল। তারপর আস্তে, খুব আস্তে কেবল এইটুকুই বলল, ‘কী করে জানব, বল।’ এইটুকু বলতেই আপা যেন ঘেমে উঠল, গলা তার বুজে এল। হঠাৎ রাশি রাশি কাঠ গুঁজে দিতে লাগল চুলোর ভেতর, যদিও তার দরকার ছিল না কিছু।
.
আজ বুঝতে পারি। বুঝতে পারি আপাকে, তখন বুঝিনি। মাঝে মাঝে বলতাম, ‘আপা, সবসময় তুমি চুলোর পাশে। কেন বসে থাক?’
আপা একটু কেবল হাসত, তারপর এমন করে আমার দিকে তাকাত একবার, যেন বলতে চায়, ‘তুই একটা বোকা।’ পরমুহূর্তে আবার সে রান্নার কাজে মন দিত। সবসময় তাকে মনে হত ভারি ব্যস্ত। ব্যস্ত থাকত ঘর-গেরস্থালীর কাজ নিয়ে। সবাই তাকে কিছু না কিছু করতে দিত। এক-এক করে মেশিনের মতো তাকে সেসব কাজ করে যেতে হত। এদিকে বদু চেঁচাচ্ছে, ‘আপা, আপা, আমার নাশতা-পিরিচটা নিয়ে এসে শিগগির।’ ওদিকে আব্বা বলছেন, ‘মা সাজেদা, চা-টা কি হল না এখনো?’ আবার আম্মা এসে বলছেন, ‘সাজেদা, ধোপাটা অনেকক্ষণ ধরে অপেক্ষা করছে, কাপড়গুলো দিয়ে দাও তো!’
আপার কিন্তু বিরক্তি নেই। সবকিছুই সে এক-এক করে করে যাচ্ছে। একটা কথা নেই মুখে। আমি ভালো করেই জানতাম, আপার সে ক্ষমতা আছে, সবকিছু সে এমনি গুছিয়ে করে যেতে পারে; করেও। কিন্তু তবু আশ্চর্য, তার দিকে তাকিয়ে কেউই বুঝতে পারত না, সে আদৌ কোনো কাজ করছে। এক-এক সময় আমারই মনে হত, সে বুঝি হাত-পা গুটিয়ে বসে আছে, অথচ আসলে তা নয়। একদিক থেকে আর-একদিকে চোখ ফেরাতেই তার যেন এক শতাব্দী লেগে যাবে, এমনি মনে হত তার দিকে তাকিয়ে। আপা যখন হাঁটত, মনেই হত না, সে হাঁটছে।
এছাড়া আপাকে কখনো সশব্দে হাসতে দেখিনি। মাঝে মাঝে নীরবে সে হাসত, দুটো ঠোঁটের প্রান্ত একটুখানি খুলে যেত, মৃদু হাসির ঝিলিক লাগত চোখে-মুখে, এদিকে চোখের পাতা আসত বুজে। আশ্চর্য সুন্দর সে হাসি– ছোট্ট নদীর পাড় ছেয়ে লুটিয়ে পড়েছে মৃদু জ্যোৎস্না, আর সেখানে যেন গভীর সুরে বেজে চলেছে সিন্ধি ভৈরোঁ। কিন্তু আমি তখন কিই-বা বুঝতাম জ্যোৎস্নার, সিন্ধি ভৈরোরই-বা কী অর্থ ছিল আমার সে জীবনে। আমার কেবল মনে হত, বোবার মতো বসে থাকা ছাড়া আপা আর কিছুই করতে পারে না; আপা জানে না, কেমন করে হাসতে হয়। মনে হত, কেউ যেন তাকে ধাক্কা মেরে দুনিয়ার বাইরে ফেলে রেখেছে।
আর ওদিকে পাশের বাড়ির সাহেরা! কী চমৎকার নেতিয়ে নেতিয়ে চলে সে। যেন ‘দাদ্রা’ তালে নেচে বেড়াচ্ছে মেয়েটা। তাছাড়া আমার চাচাতো বোন সাজোঁ বাজি! আমারও ইচ্ছে করত, সবসময়ই আমি তার পাশে পাশে থাকি। আহা, সে যখন সুন্দর করে ঘাড় বেঁকিয়ে কাউকে বলে, ‘ইয়েস্ প্লিজ্’ বা কাউকে যখন গানের সুরে সে প্রশ্ন করে, ‘ইজ্ন্ট ইট্ ডার্লিং?’– তখনো শ্রদ্ধা আর ভালোবাসায় তার পায়ে লুটিয়ে পড়তে মন চায়।
সাহেরা আর সুরাইয়া দুই বোন। হাসিতে-হুঁল্লোড়ে ওদের বাড়িটা যেন সবসময় কী মধুর বাজনা বাজিয়ে চলে। এক-এক সময় মনটা একেবারে অস্থির হয়ে উঠত, ভাবতাম, ওহ্ যদি আমাদের বাড়িটাও সবসময় অমনি হাসি-হুঁল্লোড়ে ভরে থাকত! কিন্তু আমাদের বাড়িতে… উহ্, বুড়ির মতো ঘাড় গুঁজে থাকা বোবা মেয়ে আপা, আম্মার অনবরত ফরমায়েশের ঝুক্কি আর আব্বার মুখে হুঁকোর নলে সারাদিন ধরে গড়গড় আওয়াজ, এই ছিল আমাদের আনন্দের উপকরণ। রাগে আমার গা জ্বলছিল, যেদিন আব্বা আম্মাকে বলছিলেন, ‘দেখ সাজেদার মা, আমার মনে হয়, সাহেরাদের বাড়িটা পেয়ালাবাটিতে ভর্তি, সারাদিনই তো ঝন্ঝন্ খখন্ আওয়াজ! আর নয় তো কেবল হাসি আর হাসি! আচ্ছা, বাড়িটাকে কি ওরা একটা মেলা মনে করে?’
