‘হ্যাঁ, এটাই আমার শেষ কথা।’ হঠাৎ আমার মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল। একথা আমি রাগের বশেই বলেছিলাম। পরক্ষণেই মনে হল, সে যদি আমার জিবটা সাঁড়াশি দিয়ে তুলে নিত, বা আমাকে দু-হাতে তুলে অথই সাগরে ফেলে দিত তো ভালো হত।
কিন্তু কিছুই হল না। সে বসে বসে ছটফট করল– সময় অতীত হল। তারপর মুখ ফিরিয়ে নৌকা চালাতে লাগল দ্বীপের বিপরীত দিকে, যেখানে থেকে গাড়ি পাওয়া যায় নেসের।
তীরে পৌঁছে মার্কো বলল, ‘আমি তোমাকে এখান থেকে নেস্ আর নে থেকে প্যারিসের টিকেট করে দিচ্ছি। আর টাকাও দিচ্ছি যাতে তুমি প্যারিস থেকে লন্ডন যেতে পার।’
‘আমি লন্ডনে যাব না।’
‘তবে কোথায় যাবে?’ মার্কো আমার দিকে তাকিয়ে বলল।
‘বোম্বে যাব।’
‘বোম্বে?’ মার্কো বিস্ময়ে আমার দিকে তাকিয়ে জিগ্যেস করল, ‘সেখানে তোমার কে আছে যে সেখানে যাবে?’
‘কেউ নেই। তাই সেখানেই যাব।’
.
‘বোম্বে আসার পর আমি আমার পুরনো ঠিকানায় মার্কোর চিঠি পেলাম। তাতে সে অনুশোচনা প্রকাশ করেছে এবং বলেছে তার সবচেয়ে ছোট বোন যার বয়স এখন দশ বছর– ক্যাথলিক প্রথায় ওদের বিয়ে হয়ে গেলেই সে চিরদিনের জন্যে নিজ বাসভূমি ত্যাগ করবে। আমি তার চিঠির কোনো জওয়াব দিইনি। কিন্তু সে তো একবার নিশ্চয়ই বোম্বে আসবে এবং গুলমোহর গাছের নিচে দাঁড়িয়ে তার প্রেমিকাকে নিশ্চয়ই ডাকবে।
আমি আর কোনো চিঠিরই জওয়াব দিইনি। তবে প্রতিবছরই বড়দিনে তাকে কার্ড পাঠাতাম– যাতে কিছুই লেখা থাকত না। শুধু আমার স্বাক্ষর থাকত তাতে। প্রত্যুত্তরে আমিও একটা কার্ড পেতাম। তাতেও লেখা থাকত তোমার একান্ত– মার্কো। বোম্বে এসে আমি আবার চাকরি নিলাম। এবং সেই পরিত্যক্ত বাড়ির জানালায় বসে মার্কোর প্রতীক্ষা করতাম। প্রথম বছর মনে করলাম যে তার দ্বিতীয় বোনটার বিয়ে হল, দ্বিতীয় বছরে তৃতীয়টির, তৃতীয় বছরে চতুর্থটির– এভাবে আগামী পাঁচ বছরে আমি তার ছ-টি বোনেরই বিয়ে দিয়ে দিলাম। তারপর সাত নম্বরটির বিয়ের জন্যে তিন-চার বছর অপেক্ষা করতে হল। কারণ তার বয়স ছিল কম। এ সময়ে মহামারী রূপে প্লেগ দেখা দেয়। মনে করলাম মার্কোর সাত বোনই বোধহয় প্লেগে মারা গেছে। তারপর ইউরোপব্যাপী ইনফ্লুয়েঞ্জা শুরু হল। তখন মনে করলাম, মার্কোর বোনেরা এবার আর বাঁচবে না। কিন্তু মার্কোর চিঠি আসতে থাকল এবং বারো বছরে বারোটি চিঠি এল। বারোটি আশাবরী সংগীত। তারপর চিঠি আসা বন্ধ হল। কিন্তু প্রতি বছর আমি চিঠি লিখতাম। মার্কোর জন্যে বিশ বছর আমি বোম্বেতে অবস্থান করি। তারপর লখনৌ চলে আসি। তোমার বন্ধুর পিতা মৃত মহারাজা আমাকে তোমার বন্ধুর জন্যে গভর্নেস রাখেন। মহারাজাও মারা যান। তোমাদের দেশ স্বাধীন হল। এক যুগের অবসান হল। যুগের পরিবর্তন হল। কিন্তু মার্কো এল না।’
‘আর আপনি বিয়েও করলেন না?’
‘না।’
‘হয়তো মার্কো মারাও যেতে পারে।’
মিস্ লোভিট সাপের মতো ফুঁসে উঠে বললেন, ‘না, তা হতে পারে না। আমার মার্কো এখনো অবিবাহিত আছে।’
‘হয়তো সে মনে করেছে, অনেক দেরি হয়ে গেছে।’
‘ভালোবাসায় কখনো দেরি হয় না!’
‘হয়তো মার্কো বুড়ো হয়ে গেছে। তার পুত্র-কন্যা আছে, নাতি-নাতনিও হয়েছে– এমনও তো হতে পারে।’
‘মার্কো কোনোদিন বুড়ো হবে না।’ মার্থা লোভিট তিক্তকণ্ঠে বলল, ‘এখনো সে তেমনি যুবক আছে– আমি প্রথমদিন তাকে যেমন দেখেছিলাম ঠিক তেমনি।’ সে জোরে আমার হাত চেপে ধরে বলল। পরক্ষণেই তার কণ্ঠ ধরে এল। আমার হাত ছেড়ে দিল ধীরে ধীরে। তারপর ধরা গলায় বলল, ‘যখন তুমি আমার কাছে এলে তখন আমার সেকথাই মনে হল। আর সামনের এই ঝিলটা যেন সেই সমুদ্র– একটা পালতোলা নৌকা যেন তাতে দুলছে। ওটা যেন মার্কোর নৌকা– মার্কো ‘গান গেয়ে তরি বেয়ে’ এখানে আসবে। নৌকাটা কাঠের গুঁড়িতে বেঁধে আমার কাছে এই ক্লাবে এসে সবার সম্মুখ থেকে আমাকে তুলে নিয়ে যাবে। যেখানে আমার ঘর, ঠিক সেখানে।
হঠাৎ মার্থার কণ্ঠস্বর নিস্তেজ হয়ে গেল আর আমার চোখ ফেটে পানি বের হল। আমি তার কাঁকন-পরা কম্পিত হাতে চুমু খেয়ে বললাম, ‘মিস্ লোভিট, সীতা-সাবিত্রী শুধু আমার দেশেই নয়– সকল দেশেই তারা আছে।’
.
হঠাৎ ক্লাবে আলো জ্বলে উঠল। ডিনারের সময় হয়ে গেছে। আমি উঠে দাঁড়ালাম এবং আদরের সঙ্গে মিস্ লোভিটকে সালাম করলাম। তাঁর হাত ধরে ডিনার হলের দিকে চললাম– যেন আমার সঙ্গে পঁচাত্তর বছরের বৃদ্ধা নয়– এক স্বপ্নলোকের রাজকুমারী হেঁটে চলেছেন।
অনুবাদ : কাজী মাসুম
আপা – মমতাজ মুফতি
মাঝে মাঝে আপার কথা মনে হয়। ভাবতে চাইনে তার কথা; তবু মনে পড়ে। মনে পড়ে, আর চকচক করে ওঠে দুটি চোখের পাতা।
পষ্ট মনে পড়ে একটি সন্ধ্যার কথা। রসুইঘরে আমরা তিনজন বসেছিলাম– আমি, আম্মা আর আপা। হঠাৎ বদু সেখানে এসে হাজির ছুটতে ছুটতে। বদুর বয়স ছিল ছয়, কি বড় জোর সাত। বদু এসে আম্মার কোলে ঝাঁপিয়ে পড়ে বলল, ‘আম্মি, আমাকে একটা বউ দিতে হবে, আমি বিয়ে করব।’
আম্মা হেসে ফেললেন, তারপর সেই হাসিমুখেই বদুকে প্রশ্ন করলেন, ‘এক্ষুনি চাই? বেশ, বদু, তোমাকে তোমার আপার সঙ্গেই বিয়ে দিয়ে দি, কি বল!’
‘ধ্যেৎ!’ বদু মুখ ঝাঁকালো। বলল, ‘না, না, আপা নয়।’
আম্মা তাজ্জব হওয়ার ভান করে বললেন, ‘অ্যা, কেন বদু, আপা নয় কেন? তার দোষ কী?’
