এর এক বছর পরেই মার্থার বাপ রিটায়ার্ড হলেন, পেনশন নিয়ে ইংল্যান্ড যাওয়ার প্রস্তুতি নিলেন। কিন্তু মার্থা কোনোমতেই তাদের সঙ্গে ইংল্যান্ড যেতে রাজি হল না। তার মা-বাপ, ভাই-বোন অনেক সাধ্যসাধনা করল, কিন্তু মার্থা জিদ ছাড়ল না। অবশেষে বিদায়ের ক্ষণ এল। ইংল্যান্ড যাওয়ার জাহাজ নোঙর তুলে চলল। মার্থা অশ্রুসিক্ত নয়নে তীরে দাঁড়িয়ে রুমাল নাড়িয়ে মা-বাপকে বিদায় জানাল। জাহাজ বন্দর ছেড়ে গেল, আর মার্থা একাকিনী পড়ে রইল হিন্দুস্তানে। কারণ সে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ ছিল– কারো জন্যে প্রতীক্ষা করছিল সে। এ সময়ে বহু ইংরেজ সম্ভ্রান্ত উচ্চপদস্থ লোক তার পাণিপ্রার্থী হয়। কিন্তু মার্থা তাদের সকলের প্রস্তাবই প্রত্যাখ্যান করে– সেই ইতালীয় নাবিকের জন্যে। তাই সে আর্কিওলজিক্যাল ডিপার্টমেন্টেই একটা চাকরি নিল। আর সেই পরিত্যক্ত বাড়ির খোলা জানালায় বসে সমুদ্রের দিকে নির্নিমেষ নয়নে তাকিয়ে অপেক্ষা করত, যে জাহাজ পৃথিবী প্রদক্ষিণ শেষে বোম্বাই বন্দরে আসবে। অবশেষে সে বহু প্রতীক্ষিত জাহাজ ফিরে এল বন্দরে। মার্থা সেদিন বাড়ির সমস্ত জানালা হাট করে খুলে সমুদ্রের দিকে মাথা নুইয়ে দেখল, একজন ইতালীয় নাবিক সেই গুলমোহর গাছের নিচে তার জন্যে অপেক্ষা করছে। আর সুগন্ধভরা কামরা থেকে ‘মার্কো মার্কো’ বলে চেঁচাতে চেঁচাতে সিঁড়ি ভেঙে নিচে দৌড়ে একেবারে সমুদ্রের বালুর উপর এসে দাঁড়াল। তারপর সেই গুলমোহর গাছের নিচে গিয়ে মার্কোর বক্ষলগ্না হল।
মার্কো বলল– আমি তোমাকে কার্নিউ দ্বীপে নিয়ে যাব। সেখানেই আমার বাড়ি। আমরা সমুদ্রে মাছ ধরি। সেখানে আমার মা-বাপ আর সাতটি বোন আছে। দ্বীপটি ক্যাপ্রির চেয়েও সুন্দর। সেখানকার মদ সারা দুনিয়ায় প্রসিদ্ধ। সেখানকার মতো এত সুস্বাদু মাছও নেই কোথাও। ইতালির সব সৎ জেলে সেই দ্বীপে বাস করে। সেই দ্বীপের পাহাড়ে সেন্ট অগাস্টাসের গির্জা। সেই গির্জায় হবে তোমার-আমার বিয়ে।
.
আমি মার্কোর সঙ্গে তার দেশের বাড়ি গেলাম। সত্যি সুন্দর দ্বীপ সেটা। তার নীল সমুদ্রে সাদা পাল তোলা জাহাজ চলে। নাবিকদের বাড়িঘর সাদা রঙের। উপত্যকায় আঙুর, কমলা, জলপাই আর পেয়ারার বাগান। তার পাশাপাশি কত সুন্দর ফুল শোভা পাচ্ছে। সেখানকার লাল রঙের মদের স্বাদ প্রেমের মতোই মধুর। সেখানকার জেলেরা পাহাড় কেটে হাজারটা সিঁড়ি তৈরি করেছে। উপর থেকে তাকালে মনে হয়, গির্জার ক্রশটা যেন আকাশ ও পৃথিবীর সংযোগ সাধন করেছে। এই গির্জার গর্বও করে তারা। হাজার সিঁড়ি ভেঙে আমরা হাত ধরাধরি করে গির্জায় মেরি মাতার মূর্তির সামনে দাঁড়িয়ে দুজনে কসম খেলাম। বিয়ের আগ পর্যন্ত আমরা আমাদের দেহকে অপবিত্র করব না। কারণ কার্নিউ-এর মাটি হিন্দুস্তানের চেয়েও উত্তপ্ত। সেখানে ভালোবাসার মতো ফুল ফোটে। মদের স্বাদ যত মধুর– তত তিক্ত। তাই আমরা এই শপথ নিলাম। আমি মার্কোর ঘরে রইলাম। তার মা-বাপও আমাকে খুব পছন্দ করল। মার্কোর সাতটি বোনই খুব সুন্দরী এবং কুমারী। মার্কোর বাপ আমাকে তার নৌকোয় চড়িয়ে মাছ ধরার কৌশল শেখাতে নিয়ে গেল। রাতে মার্কোর মায়ের সঙ্গে শুয়ে থাকতাম– সে আমাকে মায়ের মতো স্নেহ করত।
কিন্তু বিয়ের কথা পাকাপাকি হচ্ছে না। ওরা নিজেরা কী যেন বলাবলি করে– আমাকে কিছু বলে না। একদিন মার্কো আমাকে তার সাদা পালের নৌকোয় তুলে দূর সমুদ্রে নিয়ে গেল। আশেপাশে আর কোনো পালের নৌকা ছিল না। চারদিকে শুধু পানি আর পানি– আর দ্বীপটি যেন সেই পানির মাঝে পাহাড়ের মতো মাথা উঁচিয়ে আছে। জেলেদের বস্তি নজরে পড়ে না। শুধু উঁচুতে সেই সেন্ট অগাস্টাসের গির্জা দেখা যাচ্ছে। মার্কো নৌকা চালানো বন্ধ করে আমার দিকে চেয়ে রইল। আমি তার এই অদ্ভুত কাণ্ড দেখে জিগ্যেস করলাম, ‘কী ব্যাপার? অমন করে তাকিয়ে আছ কেন? আর আমাকে এত দূরেই-বা আনলে কেন?
মার্কো বেশ কিছুক্ষণ চিন্তিত থেকে বলল, ‘আমার মা-বাপ পাদরিকে জিগ্যেস করেছে আমাদের বিয়ের ব্যাপারে।’
‘তারপর।’
‘তিনি অসম্মতি জানিয়েছেন।’
‘কেন?’
‘তোমরা তো ক্যাথলিক নও।’
‘তারপর?’ আমি রাগের সঙ্গে বললাম।
‘তারপর আর কি! মা-বাবা বললেন যে, তুমি ক্যাথলিক হও, তাহলে বিয়ে হবে।’
‘আমি তা হব কেন? বরং তুমিই প্রোটেস্টান্ট হয়ে যাও।’ আমি অকস্মাৎ রেগে উঠলাম আমার কণ্ঠে বিরক্তি দেখে মার্কো বুকে ক্রুশচিহ্ন এঁকে বলল, ‘আমি আমার পৈতৃক ধর্ম কী করে ছাড়ব?’
‘তাহলে আমিই-বা ছাড়ব কেন?’
‘তোমাকে ছাড়তে হবে।’ অন্তত আমার জন্যে।’ মার্কো ক্রোধের সঙ্গে বলল। তার কণ্ঠে নির্দেশের সুর। হঠাৎ সে রেগে গেছে। তার মুখ লাল হয়ে উঠেছে। চোখের মণি
তারার মতো নাচছে।
‘কোনোমতেই তা হতে পারে না।’ আমি হাত মুঠো করে বললাম।
‘বাজে বকো না!’
‘তুমিও বাজে বকো না!’ আমিও মুখোমুখি জওয়াব দিলাম। রাগে আমার গা কাঁপছিল। আমি প্রায় কেঁদে ফেলেছিলাম। মার্কো যদি আমাকে বুকে তুলে নিত, তখন আমি নিশ্চয়ই তাকে জড়িয়ে ধরতাম। তখন রোমান ক্যাথলিক কেন, ইহুদি বা মুসলমান হতেও আমার বাধা ছিল না। কিন্তু রাগে সে দু-হাত বুকে চেপে আমাকে বলল, ‘এই তোমার শেষ সিদ্ধান্ত?’
