কথা বলতে বলতে ক্লাবে এসে গেলাম। ভেতরে গিয়ে বসলাম আমরা।
.
মিস্ লোভিট কম্পিত হস্তে গ্লাস তুলে নিলেন। এবং এক চুমুকেই পুরোটা শেষ করে ফেললেন। তখন হঠাৎ আমার কী যেন মনে হল। আমি বেয়ারার কাছ থেকে এক পাত্র ব্রান্ডি নিয়ে সুদেহী পুরুষ ও সুবেশিনী নারীর দঙ্গল ছেড়ে গ্লাস নিয়ে সেই নিঃসঙ্গ একাকিনী বসা মিস্ লোভিটের কাছে গেলাম। গ্লাসটা তাঁর টেবিলে রেখে সোফায় তাঁর পাশে বসলাম এবং বলতে লাগলাম, ‘আমি আপনার স্বাস্থ্য পান করতে এসেছি।’
‘ওহ্! থ্যাংক ইউ! থ্যাংক ইউ…’
মিস্ লোভিটের কম্পিত কণ্ঠস্বর শুনে মনে হল, এ যেন কান্নার সুর। আমি নীরব হয়ে গেলাম। কিছু বুঝতে পারলাম না। কী বলব, আর কী বলব না। অনেকক্ষণ নীরবেই কাটালাম। আমার মনে হল, যেন আমি কোনো একটা পরিত্যক্ত কামরায় প্রবেশ করেছি এবং একটা পুরনো জানালা খুলে বর্ষণসিক্ত দিনের ইংলিশ মোরল্যান্ডের রঙচটা অনুভূতিহীন দৃশ্য অবলোকন করছি। যদিও বৃষ্টি ছিল না– বৃদ্ধা মুখচ্ছবির ওপর নিঃশব্দে অশ্রু ঝরছিল– এ এমন অশ্রু যার কোনো সাড়াশব্দ ছিল না। যা অদৃশ্যভাবে নির্গত হয় এবং কোনো অতলে গিয়ে প্রবেশ করে।
অবশেষে আমিই বললাম, ‘আপনি কাঁদছেন মিস্ লোভিট?’
তিনি কিছু বললেন না। সমস্ত লাউঞ্জ নীরব। যেন আমরা ক্লাবের বদলে কোনো বনভূমিতে বসে আছি। চারদিকই নিস্তব্ধ। প্রত্যেকেই আত্মচিন্তায় বিভোর। শুধু মাঝে মাঝে গভীর জঙ্গলের মাঝে ঝরনাধারার কলকল ধ্বনির মতো মেয়েদের কণ্ঠস্বর শোনা যাচ্ছিল। এই প্রেক্ষাপটে হঠাৎ মিস্ লোভিট বলে উঠলেন, ‘আমার মার্কোর কথা মনে পড়ছে।
‘মার্কো কে?’ আমি জিগ্যেস করলাম।
‘আমার ভাবী বর ছিল।’
‘সে কি ফরাসি?’
‘না, আধা-ফরাসি আর আধা-ইতালীয়। তার সুগঠিত দেহে দুটো জাতিরই পৌরুষ মিশ্রিত ছিল। তার গায়ের রং ছিল ইতালীয়দের মতো জলপাই রঙের। নাক আর ঠোঁট ছিল ফরাসিদের মতো। কপালটা ইতালীয় আর হাসিটি ছিল ফরাসিদের মতো। আর তেমনি ছিল তার স্পষ্ট ভাষণ। ক্ষণিকেই রেগে আগুন হত– সেই রাগ ইতালীয়দের স্বভাবজাত রাগ। মার্কোর মতো পুরুষ আমি আজ পর্যন্ত দেখিনি। বুকটা ছিল খুব চওড়া– যেন জাহাজের পাল। দেহটা ঠিক মাস্তুলের মতো দীর্ঘ। চোখ দুটোয় দুনিয়ার চাঞ্চল্য আর কৌতূহল ভরা– যেন একটি শিশুর চোখ।’
বলতে বলতে মিস্ লোভিটের কণ্ঠস্বর পাল্টে গেল আর মুখমণ্ডল যেন সৌন্দর্যের প্রত্যাশায় উদ্ভাসিত হয়ে উঠল। মনে হল, বৃষ্টি থেমে রোদ এসেছে। আর এই নীরব কক্ষ খোশমেজাজি নারী-পুরুষের আলাপের গুঞ্জনে ভরে গেল।
.
সেটা ছিল বোম্বাইয়ের সমুদ্রতটে উঁচু টিলার উপরকার একটা কক্ষ। সেই দোতলা বাড়ির উপরতলার সমুদ্রের দিকের খোলা জানালা। সেই বাড়িতে মার্থা লোভিট তার বাপ-মা-ভাই-বোনদের সঙ্গে থাকত। মেজর লোভিট আর্কিওলজিক্যাল ডিপার্টমেন্টের একজন কর্মকর্তা ছিলেন এবং বান্দ্রার উপকূলে বারো কামরার এই বিরাট বাড়িতে সপরিবারে থাকতেন। সেই বাড়িতেই একদিন মার্থা লোভিট মার্কোকে নিয়ে এসেছিল। তার কয়েকদিন আগেই মার্থার সঙ্গে মার্কোর দেখা হয় আর্মি ক্লাবে। ১৯১০ সালের কথা। একটা ইতালীয় জাহাজ ইউরোপীয় পর্যটকদের নিয়ে ভূ-প্রদক্ষিণে বেরিয়েছিল। ঘুরতে ঘুরতে তারা বোম্বে আসে। আর্মি ক্লাবের ব্যবস্থাপকরা সেই জাহাজের সমস্ত ইউরোপীয়কে নিমন্ত্রণ জানায়। সেই জাহাজের একজন নাবিক ছিল মার্কো। সেখানেই মার্থার সঙ্গে তার সাক্ষাৎ। আর দেখা মাত্রই হৃদয় অর্পণ করে বসে মার্থা। মার্থা ছিল খুবই সুন্দরী আর এই গরম দেশে থেকে মেজাজটা বেশ গরম হয়ে উঠছিল। তাই ইংরেজ সিপাই বা ভদ্রলোকদের শীতল ভদ্রতায় সে বিরক্ত হয়ে উঠেছিল। তাদের প্রেম করার ভঙ্গি দেখে মনে হয়, এটা প্রেম না– ঠাণ্ডা পানিতে গোসল করা। তাই মার্থা কোনো ইংরেজ যুবকের কাছে ধরা দেয়নি। কিন্তু মার্কো ছিল তার কাছে ব্যতিক্রম।
.
মার্কোর প্রেমে মার্থা অভিভূত হল। মনে হল, কেউ যেন তাকে দুবাহু ধরে উপরে তুলে ফুলভরা ডালের উপর বসিয়ে ছুঁড়ে ফেলল। সমুদ্রের পানিতে মাছের মতো সে সাঁতার কাটতে লাগল। কে যেন তার হৃদয়ের তন্ত্রীতে সুড়সুড়ি দিয়েছে যার ফলে তার সারা দেহ হাসতে শুরু করল। তারপর হঠাৎ প্রচণ্ড গর্জনে সে ভীত হয়ে চোখ বুজল এবং প্রেমিকের বাহুতে গিয়ে শরণ নিল। জাহাজটা চারদিন ছিল বোম্বে বন্দরে। এই চারদিনে মার্থার আকাশ ও পৃথিবী সম্বন্ধে কোনো খেয়াল ছিল না। সে তার বাড়ি, বা-বাবা, ভাই-বোন- সব ভুলে গেল। ভুলে গেল তার জাতীয়তা, প্রকৃতি, আভিজাত্য, তার রাজকীয় গাম্ভীর্য। সে এখন একটা পুরুষের সঙ্গ চায়। চতুর্থ দিনে মার্থা মার্কোকে নিজের বাড়িতে নিমন্ত্রণ করে আনল। সকলের সঙ্গে পরিচয় করার। মার্কো খুব খুশি হল তাদের সঙ্গে মিলে। কিন্তু তারা মার্কোকে দেখে মোটেও খুশি হল না। মার্কো অতিশয় বাক্-পটু চটপটে আর খোশমেজাজি ছেলে– আর এসবই ইংরেজরা পছন্দ করে না। তাই সাক্ষাৎ ও নিমন্ত্রণ ইংলিশ ডিশের মতোই পানসে আর বিস্বাদ হয়ে রইল। মার্থা বলল– নিমন্ত্রণের পর আমি মার্কোকে সমুদ্রের তীরে নিয়ে গেলাম। বান্দ্রার উপকূলকে পুরোপুরি ভারতীয় উপকূল বলা যায় না, অনেকটা ওয়েল্সের উপকূল বলে মনে হয়। সেই উপকূলে উঁচু টিলার মাঝে একটা গুলমোহর গাছ আছে। এমনি চাঁদনি ছিল সেদিন, ঠিক এমনি নীরব রহস্যময়, সুগন্ধিত রাত। সেই চাঁদনি রাতে গুলমোহর গাছের নিচে মার্কো আমার হাতে চুম্বন দিয়ে বলেছিল– আমার জন্যে অপেক্ষা কর। কেউ যেন তোমাকে স্পর্শ করতে না পারে। আমি তোমাকে বিয়ে করতে চাই।
