.
ক্লাবের আধো-ঢাকা আধো-খোলা লাউঞ্জে বসে সকলেই আলো-আঁধারিতে ডুবে আছে। নীরব। কারণ পাহাড়ের চরিত্রই নীরবতাপূর্ণ। ডিনারের আগ পর্যন্ত লাউঞ্জের আলো নিভিয়ে রাখা হয়েছে। যাতে সবাই অন্ধকারে হারিয়ে যাওয়ার অনুভূতি লাভ করে। আর আলো- আঁধারির দাবার ছকে সবাই যাতে স্বপ্নের ঘর সাজাতে পারে। আলো নিভতেই আলাপচারীও কমে গেল। অন্ধকার ছড়িয়ে পড়ল আর সেই আঁধারে চাঁদের আলো সসংকোচে আঙুল দিয়ে মানুষ ও বস্তুকে স্পর্শ করতে এল। কারো চোখে পড়তেই সে চোখ কোমল নয়ন হল, কারো চুলে গিয়ে আলো ঝলমল আঁচলে রূপান্তরিত হল। মদের পেয়ালায় গিয়ে স্বপ্নের ঢেউ খেলতে লাগল– রঙিন ঠোঁটে লেগে রক্তিম রুবির রূপ নিল– আংটির পাথরে লেগে হীরের মতো চক্চক্ করতে লাগল– কানের ঝুমকোয় লেগে আলোর ফানুস বানিয়ে দিল।– চাঁদনি যেন বলছে– আমি থাকতে আঁধারের সংকোচ কিসের?
.
আজ চাঁদের আলো মিস্ লোভিটের হৃদয়কেও স্পর্শ করেছে। আর সবার থেকে দূরে একটা সোফার উপর খুবই সংকুচিত হয়ে সে বসে আছে। তার সমস্ত দেহ অন্ধকারে ঢাকা আর হাতের কব্জিটা শুধু টেবিলে রাখা ব্রান্ডির গ্লাস পর্যন্ত প্রসারিত। তার সেই প্রসারিত কব্জিতে পাতলা একটা সোনার কাঁকন– যা তার কুঁচকানো চামড়াকে ছুঁয়ে থরথর করে কাঁপছে। আজ বৃদ্ধা মিস লোভিটের পঁচাত্তর বর্ষপূর্তি। তাই আমার আমন্ত্রণকারী বন্ধু মিস্ লোভিটকে (তার পুরনো গভর্নেস ছিল)– আজ নিমন্ত্রণ করে ক্লাবে নিয়ে এসেছে। মিস্ লোভিটের পোশাক সাদামাটা। তার কাছে যে ধরনের পোশাক আছে– এটা সেগুলোর চেয়ে উত্তম। অনেকদিন পর সে আজ হয়তো ঠোঁটে রং মেখেছে। চুল বাঁধা টানটান করে। যদিও ধনীদের মনে যতগুলো খেয়াল আছে– তার চুলের সংখ্যা তার চেয়ে বেশি নয়। তবু সে তার এই সামান্যতম চুলের পুঁজিকেই সযত্নে ধুয়ে আঁচড়ে নিয়েছে। গায়ে সুগন্ধিও মেখেছে। তেমনি পরিচ্ছন্ন পোশাক পরে হাতের কব্জিতে তার একমাত্র অলংকার কাঁকন পরেছে আজ। সে আমার বন্ধুর সঙ্গে ক্লাবে এসেছে। ঘাঁটি থেকে নেমে আমি আবার নতুন করে মিস্ লোভিটকে দেখলাম। তারপর সতর্কতার সঙ্গে আমার স্ত্রীর সঙ্গে যখন চোখাচোখি হল, তখন আমাদের উভয়ের চোখেই এক প্রশ্ন ছিল। বুড়ি ঘুড়ির রঙিন সাজ! আমরা দেড় সপ্তাহ যাবৎ আমাদের বন্ধুর বিরাট বাংলোয় অবস্থান করছি। কালই দিল্লি যাবার কথা। তাই আজ আমাদের সম্মানে আমার বন্ধু এই ডিনার দিচ্ছেন। দৈবাৎ এই ডিনারের সঙ্গে মিস্ লোভিটের পঁচাত্তর বর্ষপূর্তি অনুষ্ঠানও সংযোজিত হয়ে গেছে। এক ঢিলে দু-পাখি মারা সম্ভবত একেই বলে।
এই দু-সপ্তাহে আমি মিস্ লোভিটকে ‘হ্যালো’ ছাড়া আর কোনো কথা বলার সুযোগ পাইনি। মিস্ লোভিট খাঁটি ইংরেজ মহিলা। তাকে স্বর্গীয় মহারাজা– আমার বন্ধুর পিতা– তার স্ত্রী ও সন্তানকে সুশিক্ষা দানের জন্যে গভর্নেস রেখেছিলেন। তখন ইংরেজদের আমল ছিল। তালুকদারদের শানশওকতের যুগ– জীবনের কত সুন্দর অভিজ্ঞতা কত আনন্দঘন মুহূর্ত মিস্ লোভিট উপভোগ করেছেন তা সত্যি অনুমেয়। যারা সেদিনের একটু চমক দেখেছে তারা কিছুটা আঁচ করতে পারে। কিংবা তার অবশেষ আমার ভঙ্গুর প্রাসাদোপম বাংলো দেখেও আঁচ করা যায়। এই বুড়ো বয়সেও মিস্ লোভিটের দিকে তাকালে বোঝা যায়, যৌবনে তিনি কী বিপজ্জনক সুন্দরী ছিলেন। এবং সেকালের ধনী তরুণরা তাঁর জন্যে কত না কী করতে সংকল্প করত। মিস্ লোভিটকে দেখলেই এ কথা মনে হয়। কিন্তু পতনোন্মুখ পুরাকীর্তি দূর থেকে দেখাই উচিত। কারণ একবার দেখলে আর দেখবার আগ্রহ থাকে না। সাহসও হয় না। তাই এতদিন এক বাড়িতে বাস করেও ‘হ্যালো’র বেশি কথা বলতে পারিনি। আমাদের হৈ-হল্লা, কলকাকলিতে আমরা মেতে থাকি, তবু দূর থেকে মিস্ লোভিটের অনুভূতি যেন আমাদের ওপর প্রভাব ফেলে। আর সেই পাণ্ডুরবর্ণ ইংরেজ মহিলার অবস্থিতি আর নিষ্প্রাণ চেহারা যেন কোনো পোকায় কাটা পুরনো বই-এর মতো বাতাসে নড়তে থাকে। মিস্ লোভিট তার কুকুরের পশম আঁচড়ে দিচ্ছে। মিস্ লোভিট একা বসে খেলছে। নিঃসঙ্গ একাকী বিপদক্লিষ্ট, মিইয়ে যাওয়ার মতো মিস্ লোভিটের ছায়া থেমে থেমে কাঁপে, আবার কাঁপতে কাঁপতে থামে। শুধু এদিন আমি এই ছায়ার পাশে সারাক্ষণ বসে থেকে ভীতকণ্ঠে আমার বন্ধুকে জিগ্যেস করেছিলাম। জিগ্যেস করার সময় আমার কণ্ঠে তিক্ততা ছিল বেশ।
.
ইংরেজ যখন চলে গেল, তখন এই মহিলার এখানে পড়ে থাকার আর সার্থকতা কী ছিল? এমন তো নয় যে এখানকার আবহাওয়া তার জন্যে স্বাস্থ্যকর ছিল– কিংবা আমার দেশের মানুষ, ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি তার আগ্রহ আছে। তার পোশাক-পরিচ্ছদ আলাদা। ইংরেজি কুকুরও পোষে। ইংলিশ ডিশ খায়। থাকেও আলাদা। তার কী দরকার ছিল হিন্দুস্তানে থাকার
আমার বন্ধু বলল, ‘গত ত্রিশ বছর ধরে ইনি আমাদের এখানে আছেন। শৈশবে আমি এঁর কাছেই লেখাপড়া শিখতে শুরু করি। কেননা আমার বিয়ে হয়েছিল বাল্যবয়সে। আমি তখন নিজে কাপড় পরতেও জানতাম না। ইনি আমাকে লেখাপড়া, আদব-কায়দা শিখিয়ে বড় করে তোলেন। ত্রিশ বছর একসঙ্গে থাকতে থাকতে এটা অভ্যাসে দাঁড়িয়ে গেছে যে আমিও তাঁকে ছাড়তে চাইনে, তিনিও আমাকে ছাড়তে চান না। যদিও এখন আর আমার গভর্নেস-এর প্রয়োজন নেই। আর যে দ্রুত অবস্থার পরিবর্তন হচ্ছে…’ হঠাৎ সে থামল। তারপর হেসে বলল, ‘হয়তো একদিন আমিই কারো গভর্নেস হয়ে যাব। তবু তাঁকে নিয়েই দিন কাটিয়ে যাচ্ছি।’
