কিন্তু বিড়ালটাকে তো চুপ করানো গেল না। ‘ম্যাও ম্যাও’ রবে তার বিক্ষোভ আর আর্তনাদ চলতেই থাকল। বিক্ষোভ মুখের আহার কেড়ে নেওয়ার বিরুদ্ধে, আর্তনাদ ক্ষুধার্ত থাকার যন্ত্রণায়।
সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামবার সময় মুখে ‘চু চু’ ধ্বনি করে আর ‘পুষি পুষি’ বলে ডেকে তাকে নিচে নামাবার চেষ্টা করলাম। আমার উদ্দেশ্য অসৎ ছিল না। কিন্তু বিড়াল আমাকে বিশ্বাস করতে পারল না। করবেই-বা কেন। একে তো সে আমার পোষা বিড়াল নয়, তার ওপর আমি তার মুখের আহার কেড়ে নিয়েছি। কাজেই আমার সঙ্গে সঙ্গে নিচে নামল না সে। না নেমে কার্নিশ থেকে নিচের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে বলতে লাগল, ‘ম্যাও ম্যাও।’ আমি এই বুলির পরিষ্কার অর্থ করলাম, আমি ক্ষুধার্ত, আমি খাদ্য চাই।
খুকুমণি আমার এই অর্থের যেন প্রতিধ্বনি করেই বলল, ‘আব্বু, ওল ক্ষিধে পেয়েছে। কালকেল দুধ আছে, ওতে থেতে দাও।’
খোকন এই প্রস্তাবের প্রতিবাদ করে উঠল। ‘বা বা, আর আমরা চা খাব কী দিয়ে?’
‘তেন, এথুনি দুধ আসবে না? সেই দুধ দিয়ে আমলা চা থাব।’
আমাদের হৈহুল্লা আর বিড়ালের চিৎকারে খোকা-খুকুর মায়ের বুঝি ঘুম ভেঙে গেল। তিনি বিছানায় শুয়ে শুয়েই হাঁক ছাড়লেন, ‘সাত-সকালে কিসের এত গোলমাল, শুনি?’
এ প্রশ্নের উত্তর দিল বিড়াল, ম্যাও ম্যাও।’
‘ও বুঝেছি, এই ভোরবেলায় আল্লা-রসুলের নাম না নিয়ে বাপ-বেটিতে বেড়ালকে নিয়ে মশকরা হচ্ছে বুঝি?’
বললাম, ‘না, মশকরা নয়, ও বেচারা খেতে পায়নি কিনা, তাই ‘
‘তা বাসি কিছু থাকলে খেতে দিলেই তো হয়। একগাদা বাচ্চা দিয়েছে, ক্ষিদে তো পাবেই।’ এই বলে মনে হল যেন, তিনি আবার পাশ ফিরে শুলেন।
খুকুমণির অনুরোধের সমর্থন পাওয়া গেল তার মায়ের কাছে। কাজে কাজেই একটা থালায় করে আধ পোয়াটেক দুধ আর তাতে পুরো একটা রুটি ছিঁড়ে ছিঁড়ে মেশালাম। মিশিয়ে বিড়ালকে দেখিয়ে দেখিয়ে সিঁড়ির কাছে রেখে এলাম। আর নিজে দাঁড়িয়ে থাকলাম বিড়ালের দৃষ্টির আড়ালে গিয়ে। বিড়াল দ্রুত পায়ে থালার কাছে গিয়ে কয়েক মুহূর্তে সাফ করে দিল থালাটা।
এই দৃশ্য খুকুমণি দেখল খুঁটির আড়াল থেকে।
কিন্তু খেয়ে-দেয়ে বিড়াল আবার শুরু করল, ‘মিয়াও মিয়াও।’
খুকুমণি বলল, ‘ভাগ, ভাগ, দূল হ।’
এমন সময় পেপারঅলা খবরের কাগজ দিয়ে গেল। খোকন দৌড়ে গিয়ে খবরের কাগজ এনে দিল আমার হাতে। প্রথম পৃষ্ঠায় ব্যানার হেডলাইন। তার মর্ম : ইস্রাইল আজরাইল। ইস্রাইলের আজরাইলরা পূর্ব-জর্ডান আর মিসরের ওপর আকস্মিক হামলা চালিয়েছে। হাওয়াই হামলায় শত শত মুসলমান নিহত, বহু গ্রাম ধ্বংসপ্রাপ্ত, হাজার হাজার পরিবার গৃহহারা।
বিড়াল বলল, ‘ম্যাও ম্যাও।’
আমি নিজেকে ডুবিয়ে ফেললাম চিন্তার মহাসমুদ্রে। এই কি সেই আরবজাতি, যাদের ডঙ্কাধ্বনি একদিন সারা দুনিয়ার বুক কাঁপিয়ে তুলেছিল। যারা কাইকাউস, কাইখর দেশ তুড়ি মেরে জিতে নিয়েছিল। যারা একদিন ত্রাসের কারণ ছিল গোটা ইউরোপের কাছে। যারা রোম সাম্রাজ্যের সমস্ত গর্ব ভূলুণ্ঠিত করে দিয়েছিল। যারা আলেকজান্ডারের দেশে পর্যন্ত গিয়ে রাজত্ব করেছিল। যাদের তারেক আর সালাহুদ্দিনের তরবারির কাছে তাবৎ ঈসাই আর ইহুদির মাথা নত হয়ে গিয়েছিল। সেই আরবজাতির বীরত্ব আজ কোথায় গেল?
বিড়াল বলল, ‘ম্যাও ম্যাও।’
মনে হল, দুনিয়াটাই পাল্টে যাচ্ছে। তলওয়ারের যুগ শেষ হয়েছে। এখন বোমার যুগ, রকেটের যুগ, ট্যাঙ্কের যুগ। ঢাল-তলোয়ার, তীর-ধনুক দিয়ে এখন আর যুদ্ধ করা যায় না। রেড-ইন্ডিয়ানরা পারেনি কেন রাইফেলের মুখে টিকে থাকতে। সাহসে কি তারা কম ছিল কোনো অংশে? দক্ষিণ আফ্রিকার জুলুরা বাঘের জাত। তাদের আজ কী অবস্থা? পেরেছে অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসীরা টিকে থাকতে? রোডেশিয়ার কৃষ্ণকায়দের আজ কী অবস্থা? মুষ্টিমেয় সাদা চামড়ার প্রভুদের তারা আজ পারছে না কেন উচ্ছেদ করতে? ভিয়েতনামের আজ কী দশা? সর্বত্র সবল দুর্বলকে চিবিয়ে খাচ্ছে।
বিড়াল বলল, ‘ম্যাও ম্যাও।’
আমার ভারি রাগ হল। কমবক্ত চায় কী? এই বাড়িতে যত খাদ্য রয়েছে, সবই খাইয়ে দিতে হবে নাকি তাকে। সাম্রাজ্যলোভী দেশের মতোই বিড়ালটাও লোভী। ওর পেট কোনোদিনও ভরবে না।
বিড়াল আবার বলল, ‘ম্যাও ম্যাও।’
আমি বললাম, ‘চুপ, আজরাইলের বাচ্চা!’ বলেই মনে মনে চমকে উঠলাম। ঠিক হল কি এই গাল দেওয়াটা? বারবার ‘লা-হওল’ পড়তে লাগলাম। পড়তে পড়তে যেতে লাগলাম জায়নামাজের দিকে।
কিন্তু ততক্ষণে সূর্য উঠে গেছে। ফজরের নামাজটা আমার কাজা হয়ে গেল। কাজা নামাজে দাঁড়ানোর পরও বারবার আমার মনোযোগ ছিঁড়েখুঁড়ে গেল এই ভাবনায় : একটা পায়রার প্রাণ রক্ষা করাটা কি আল্লার এবাদত নয়?
অনুবাদ : নেয়ামাল বাসির
মিস্ লোভিট – কৃষণ চন্দর
দিন পূর্ণ হল। যেমন জীবনের দিন পূর্ণ হয় অর্থাৎ, শেষ হয়। সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে, আকাশে ষষ্ঠীর চাঁদ ঝুলে রয়েছে নিঃশব্দে– একটা নিঃসঙ্গ শিশুর মতো, যে খোকার সঙ্গী নেই।
শহরের রাতের অনেক রং। কিন্তু পাহাড়ে রাতের মাত্র দুটো রং– জ্যোৎস্না আর অন্ধকার। গিরিকন্দর আঁধারে ছেয়ে থাকে আর পাহাড়ের চূড়ায় চাঁদের ঝলমলে আলো। বন যেন জ্যোৎস্নার চাদর গায়ে ঘুমিয়ে আছে, আঁধারে আর আকাশের প্রান্তদেশে চাঁদের আলো হাসছে। ষষ্ঠীর চাঁদের জ্যোৎস্না কম, অন্ধকার বেশি। আঁধারে বৃক্ষের শাখায় তোরণের মতো চাঁদের আলো এসে পড়ে কখনো কখনো। আর কোনো উঁচু পাথরের উপর বসে চাঁদের আলো কোনো দূরযাত্রী শ্রান্ত পথিকের মতো বসে থাকে। আবার কখনো অন্ধকারে লুকোনো মুখের ঠোঁটের ওপর চাঁদের আলো ছিটকে এসে পড়ে যেন নিয়তি অন্ধকার থেকে মানুষের প্রতি প্রসন্ন হয়ে উঠল।
