নতুন ভাবনার জট পাকিয়ে গেল মনের মধ্যে। আমার ধর্মীয় বিবেক কোনো সমাধান করতে পারল না এ সমস্যার। আল্লাহ্তালা এক জীবকে অন্য জীবের খাদ্য করে সৃষ্টি করেছেন। গরু, মোষ, ছাগল– এরা ঘাস, শাক-সবজি, গাছের নরম নরম, কচি কচি পাতা খেতে খুবই ভালোবাসে। এইসব খেয়ে তারা যে বিষ্ঠা ত্যাগ করে, খাদ্য হিসেবে তা পোকামাকড়ের প্রিয়। পাখিতে আবার পোকামাকড় খেয়ে তৃপ্তি পায়। এইসব চতুষ্পদ জন্তু আর পাখি চলে যায় মানুষের পেটে। যে-সব চতুষ্পদ মানুষে খায় না, তাদেরকে ভক্ষণ করার জন্য অন্য জীবের অভাব নেই। কাউকে খায় বাঘে, না হয় ভল্লুকে, কাউকে খায় চিলে, না হয় শকুনে। বনে-জঙ্গলে কোনো জন্তু মাংসাশী, আবার কেউ-বা নির্ভেজাল নিরামিষাশী। পুরুষ-নারী-নির্বিশেষে এই প্রক্রিয়া অনন্তকাল ধরে চলে আসছে।
আমি এইসব কথা চিন্তা করছি, এদিকে বালবের আলো খুকুমণির ঘুমের ব্যাঘাত সৃষ্টি করতে লাগল, ওদিকে বিড়াল আমার হাতে পায়রা দেখতে পেয়ে আরও জোরে নালিশ জানাতে লাগল। ‘মিয়াও মিয়াও।’ খুকুমণির ঘুম গেল ভেঙে। খুকুমণি উঠল। উঠে বসল। বসে, আমার হাতে পায়রা দেখে দু-হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল, ‘আব্বু, আমাতে দাও!’ খুকুমণি এখনো ক বলতে পারে না, বলে ত। তেমনি র-কে বলে ল।
আমি ওকে প্রবোধ দেওয়ার ভঙ্গিতে বললাম, ‘না, মা-মণি, একটা অন্য লোকের পায়রা– আমি তোমাকে কেমন করে দিই!’
‘তুমি যে বলেছ– এটা আমাল।’
এখন কেমন করে ওকে বোঝাই, ধরলেই কিছু একজনের পায়রা অন্যের হয়ে যায় না। আমার সব সন্তানকেই আমি বরাবর এই শিক্ষা দিয়ে আসছি যে, রাস্তায় কোনো জিনিস কুড়িয়ে পেলেও সেটা তার হয়ে যায় না। তাছাড়া, পায়রাটাকে আমি কুড়িয়ে পাইনি। ধরিওনি। সে তো প্রাণরক্ষার জন্য নিজে থেকে আমার কোলে এসে পড়েছে। ধর্মে বলে, আশ্রয়প্রার্থীকে আশ্রয় দাও। নিজের প্রাণ বিপন্ন করে হলেও বিপন্নকে রক্ষা কর।
এইসব কথা ভাবছি, এমন সময় খুকুমণির বড়টা অর্থাৎ খোকন জেগে উঠল। ঘুমের যখন পরিশিষ্ট দশা, তখন বোধহয় আমাদের কথা সে শুনেছিল। সুতরাং, বিনা ভূমিকায় সে রায় জারি করে দিল, ‘খুকুমণিকে এই পায়রা দিও না, আব্বু। ওর হাত থেকে পালিয়ে যাবে, ধরে রাখতে পারবে না।’
খুকুমণি ঘাড় বাঁকিয়ে সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ করে উঠল, ‘তেন, পালিয়ে যাবে তেন? আমি যে খুব শক্ত কলে ধলে থাতব।’ এই বলে সে শক্ত করে ধরে থাকার ভঙ্গিটাও দু-হাত জোড়া লাগিয়ে দেখিয়ে দিল।
এ কথায় ফারসি কবিতা আমার মনে পড়ে গেল। আহা কী কবিতা!
‘দিলম্ মানন্দ্ কুঞ্জশ্কে
ব দস্ৎ-এ তিফ্ল্-এ নাদানে
কে আজ্ জাঁ দোসৎ-তর্ দারদ্
ওয়ালেকিন মি-কশদ্ জানে।’
(আমি যেন মূর্খ শিশুর হাতে চড়ুইপাখির মতো। প্রাণের চাইতে প্রিয় ভাবছে বটে, কিন্তু আমার প্রাণটা বেরিয়ে যাচ্ছে।)
খোকন বলল, ‘আব্বু, পায়রাটা আমাকে দাও– আমি মোল্লাজিকে দিয়ে আসব। তিনি পায়রা পোষেন। কতজনের পায়রা যে ধরে ধরে পুষেছেন তিনি।’
‘বলছ কী! আর, যার পায়রা, সে চাইতে আসে না?’
‘হুঁহ্, চাইতে আসবে? কার এত সাহস যে, মোল্লাজির সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলে! যদি কেউ চাইতে আসেও, মোল্লাজি এমন ধমকটাই দেবেন যে, পালাতে পথ পাবে না।’
আমি জানি, খোকন বানিয়ে বানিয়ে কথা বলতে খুব ওস্তাদ। ওকে তাই সে সুযোগ দেওয়ার জন্য প্রশ্ন করলাম, ‘তখন কী বলেন মোল্লাজি, একটু শোনাও দেখি!’
‘বলেন, আমি এই পায়রা তোমার ঘর থেকে ধরে আনিনি। এ তোমার ঘরে থাকতে চায় না। তোমার কোনো পায়রার সঙ্গেই এর সম্পর্ক ভালো নয়। সেইজন্য এ আমার ঘরে নিজে থেকেই চলে এসেছে। আমার পায়রাদের সঙ্গে গটরগুঁ-গটরগুঁ করে সুখে-শান্তিতে আছে। এ পায়রা আমার দানা খেয়েছে, আমার পানি খেয়েছে। আমি কেমন করে একে আবার একটা জালেমের হাতে ছেড়ে দিতে পারি। ব্যস্, আপনি এখন আল্লার শুকর আদায় করতে করতে ঘরে ফিরে যান।’
এই কৃত্রিম বক্তৃতা শুনে আমার খুব হাসি পেল। আমি খোকনের কাছে খোকনের বিছানায় গিয়ে বসলাম। এই সুযোগে খুকুমণি চট্ করে পায়রার মাথায় হাত বুলোতে শুরু করে দিল। পায়রা বোধহয় এতে আরাম পেল, তাই সে চোখ বুজল পরম তৃপ্তিতে।
জীব-জন্তু, পশু-পক্ষীর বিষয় নিয়ে গল্প বলে আমি আমার ছেলেমেয়েকে জীবনের এই জটিল পরিস্থিতি সম্বন্ধে কিছু উপদেশ দেব, ভাবছিলাম, এমন সময় বেড়ালটা উপরের কার্নিশ থেকে নেমে নিচের বারান্দায় একেবারে দরজার সামনে এসে দাঁড়াল। তারপর, পায়রার দিকে ক্রুদ্ধ দৃষ্টি মেলে বলল, ‘ম্যাও ম্যাও।’
খোকন বেটা-ছেলে বলেই বোধহয় নিষ্ঠুর। তাই সে পরামর্শ দিল, ‘আব্বু, পায়রাটাকে বারান্দায় ছেড়ে দাও। আমরা দেখব, বেড়ালটা ওকে ধরতে পারছে, না পায়রাটা উড়ে পালিয়ে যাচ্ছে।’
কিন্তু খুকুমণি বলল, ‘না, আব্বু, বেলাল তাহলে ওতে খেয়েই ফেলবে।’
শিশুদের নিষ্ঠুরতা আর কারুণ্যের মনস্তত্ত্ব নিয়ে মনের মধ্যে আলোড়ন চলছিল, এমন সময় পাশের বাড়িতে একসঙ্গে অনেক পায়রার ডাক শোনা গেল। আমার প্রতিবেশী একসঙ্গে সব পায়রা ছেড়ে দিয়েছেন। তাদের আকাশে ওড়া আর ছাদে নামা টের পেলাম। তাড়াতাড়ি সিঁড়ি বেয়ে ছাদে উঠলাম। বিড়ালটাও অনুসরণ করল আমাকে। বিড়ালটা সত্যি ক্ষুধার্ত। একবার মনে হল, সে বুঝি আমার হাত থেকে পায়রাটাকে ছিনিয়ে নেবে। আমি একটা ঢিল মেরে বিড়ালটাকে তাড়িয়ে দিলাম। তারপর, প্রতিবেশীর পায়রাগুলো যেই আর এক দফা আকাশে উড়ল, অমনি হাতের পায়রাটাকে জোরে ছুঁড়ে দিলাম বাতাসে। প্রতিবেশীর পায়রাদের সঙ্গে সে অনায়াসে মিশে গেল। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আমি তাই দেখলাম, আর ভাবতে লাগলাম, না জানি কার পায়রা কার কাছে চলে গেল। তবু সান্ত্বনা, বিড়ালের হাত থেকে সে রক্ষা পেয়েছে।
