সবাই আমার দিকে তাকিয়ে রয়েছে। দৃষ্টিবাণ আর বাক্যবাণের পরোয়া না করে চলতে লাগলাম মাথা উঁচু করে। যারা হাসছে, তারা হাসুক। এমন বেহুদা লোক শুধু এ দেশে কেন, সব দেশেই পাওয়া যায়।
আমি হাঁটছি, আর তাদের মন্তব্য আমার কানে ভেসে আসছে : ‘রাগ করে আর কী করবেন– হজম করে ফেলুন।’
‘নির্লজ্জ সাইকেল, চল্ তো বাড়ি, তারপর মজাটা টের পাওয়াব!’ একজন পিতা তাঁর পুত্রকে বললেন, ‘দেখেছিস, বাবা– এ হল সার্কাসের সাইকেল। দুই চাকাই আলাদা করা যায়।’
আমার চলতে থাকায় তবু বিরতি নেই। এইভাবে চলতে চলতে জনবসতি শেষ হয়ে পেছনে রয়ে গেল। নদীর উপরের পুলটায় পৌঁছে গেলাম। পরম নিশ্চিন্তে একটা একটা করে আমার সাইকেলের সব অংশ এমনভাবে নদীতে ফেলে দিলাম, যেমন করে কেউ চিঠি ফেলে লেটার-বক্সে।
অনুবাদ : নেয়ামাল বাসির
কপোতের প্রাণ – আলি আব্বাস হোসাইনি
স্বপ্নও কত বিচিত্র, অদ্ভুত ধরনেরই-না হয়ে থাকে। দেহ পড়ে থাকে বিছানায়, কিন্তু মন চলে যায় অন্য কোথাও। কত জায়গায়-না উড়ে বেড়ায় মন পাখির মতো ডানা মেলে দিয়ে। কত ভীষণদর্শী লোকের সঙ্গে সাক্ষাৎ ঘটে। কত পরী এসে শুনিয়ে যায় মনের কথা। কখনো প্রেম হয় স্বপ্নে। কখনো মনের মিল না হলে ঝগড়া বাধে। রাজনীতি, ধর্ম, দর্শন, সাহিত্য– কোনোকিছু বাদ যায় না।
আমিও একদিন এইভাবে মসজিদের মোল্লার সঙ্গে আলাপ করছিলাম। আমি নিজে সবসময় ধর্মকর্ম নিয়ে থাকি, কাজেই আমার স্বপ্নও সেইরকম। কোনো এক কবির কোনো এক কবিতার একটি চরণ আমার মনে পড়ে গেল। সেইটি আমি মোল্লাকে শোনালাম। চরণের মর্ম এইরকম : ‘প্রেমের তরেই সৃষ্টি মানুষের– সেই জিনিসেরই বড় অভাব; এবাদত সবাই করে, যে এবাদতে প্রেম নিরস্তিত্ব।’
মোল্লা তো শুনেই চটে-মটে আগুন। কয়েকবার ‘লা-হওল’ পড়ে যখন তিনি বুকে ফুঁক দিচ্ছিলেন, তখন আমার ঘুম ভেঙে গেল।
ঘুম ভাঙার পর টের পেলাম, মোরগে আজান দিচ্ছে বটে, কিন্তু তখনো ফজরের সময় হয়নি। তখনো কাক ডাকেনি। তখনো সুবহে সাদেকের আলো ছড়িয়ে পড়েনি আল্লার রাজত্বে।
কিছুক্ষণ বিছানায় পড়ে পড়ে এপাশ-ওপাশ করলাম। তখন না ঘুমোনো যায়, না জেগে থেকে কোনো ফায়দা। সিগারেট ধরিয়ে স্বপ্নের সেই কবিতার সঠিক মর্ম উদ্ধারের চেষ্টা করতে লাগলাম। এই চেষ্টার ফলে চোখ জুড়িয়ে আসতে চাইল। ভাবলাম, শয়তান আমার চোখে সুড়সুড়ি দিচ্ছে। এখন যদি ঘুমিয়ে পড়ি, তাহলে ফজরের নামাজ শিকেয় উঠবে, আর ফজরের নামাজ শিকেয় উঠলে শয়তানেরই লাভ।
সুতরাং, শয়তানকে নিরাশ করা উচিত বলে মনে হল। উঠলাম। উঠে, সময় না হওয়া সত্ত্বেও ওজু করে জায়নামাজে এসে বসলাম।
বসে বসে ‘নিদ্রা অপেক্ষা নামাজ শ্রেয়’ ধ্বনি শোনার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছি, এমন সময় বাইরের বারান্দার উপরের কার্নিশে ডানা-ঝাঁপটানোর শব্দ শুনলাম। অল্প পরেই একটা সাদা পায়রা বারান্দার খুঁটির সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে উড়তে উড়তে, পড়তে পড়তে আমার কোলে এসে নামল। পাখিটি আমার জামার ভেতরে সেঁধতে চাইল। কাপড়ে তার সারা দেহ ঢেকে গেল, কেবল বেরিয়ে থাকল মাথাটুকু। ছোট্ট, গোল গোল চোখ দুটো দিয়ে পিট্ পিট্ করে তাকাতে লাগল। জামার ভেতরেও আমি টের পেলাম, তার সারা শরীর কাঁপছে। ছোট্ট, লাল জিবটা থেকে-থেকে বেরিয়ে পড়ছে। আস্তে করে পায়রাটার পিঠে হাত রাখলাম। এতে সে আরও সঙ্কুচিত হল। আস্তে আস্তে পিঠে হাত বুলিয়ে আদর করতে লাগলাম। এতে ক্রমে ক্রমে সে শান্ত হল আর ভয়ের ভাব কেটে যেতে লাগল।
তারপর, আমি ভাবতে লাগলাম, এখন কী করি। পায়রাটা নিশ্চয় কোনো বিপদের মুখে পড়েছিল। সে আশ্রয়প্রার্থী। আশ্রয়প্রার্থীকে, বিপন্নকে আশ্রয় দেওয়া আমার ফরজ। কিন্তু আমার ঘরে পায়রা রাখার খুপরি নেই। কিংবা অন্য কোনো ব্যবস্থার কথাও আমার মনে পড়ল না। সুতরাং, আপাতত একটা ঝুড়ির মধ্যে রাখব সাব্যস্ত করলাম।
জায়নামাজ থেকে নিজেকেই উঠতে হল। পাশের ঘরে আমার দুই দুটো জোয়ান ছেলে ঘুমুচ্ছে। তাদের জাগাতে মন সরল না। আমার ধর্মীয় নীতি-জ্ঞান আমাকে এই শিক্ষাই দিয়েছে যে, ঘরের জোয়ান ছেলেকে ফজরের সময় জাগাতে হলে জোরে জোরে আজান দাও বা একামত হাঁকো; তাতে জাগে জাগুক, না জাগে নাই জাগুক। কিন্তু গায়ে হাত দিয়ে ঘুম ভাঙিও না; কেননা তখন সে এমন অবস্থাতে থাকতে পারে, যা দেখলে তাকে লজ্জা পেতে হতে পারে।
সুতরাং, বারান্দায় বেরুলাম ঝুড়ি খুঁজতে। কার্নিশ থেকে ধ্বনি উঠল, ‘ম্যাও ম্যাও।’ ভাবলাম, আলো জ্বেলে বিড়ালটা কোথায় রয়েছে, দেখি। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে মনে হল, বিড়ালের এই ডাকের মধ্যেও এক ধরনের কাকুতি রয়েছে, নালিশ রয়েছে। আমি তার শিকার ছিনিয়ে নিয়েছি মুখ থেকে। কারো মুখের আহার কেড়ে নেওয়ার কী অধিকার রয়েছে আমার! বিড়াল সেই নালিশই তো জানাচ্ছে আমার কাছে। দিন কয়েক আগে সে বাচ্চা দিয়েছে। বাচ্চাদের চোখ ফোঁটানোর জন্য সে রোজ কয়েকবার করে এক জায়গা থেকে আর এক জায়গা বয়ে নিয়ে বেড়ায়। নিজের এই ছোট সংসারের তত্ত্বাবধানে যথেষ্ট পরিশ্রম করতে হয় তাকে। তার ওপর, এতগুলো বাচ্চাকে নিজের শরীর থেকেই দুধ নিংড়ে বের করে দিতে হয়। সেই দুধ কোত্থেকে আসবে যদি সে দু-বেলা দু-মুঠো খেতে না পায়। আজকে ভারি চমৎকার একটা খাদ্য পেয়েছিল। পুরো একটা পায়রা সে পরম তৃপ্তিসহকারে পেট ভরে খেতে পারত।
