বললাম, ‘বেয়াদব কোথাকার! তুমি দু আনা পয়সা তাহলে মাংনাই নিলে!’
‘সাইকেলটাও আপনি মাংনায় পাননি কি? এ সাইকেল আমরা চিনি। আপনার বন্ধু মির্জা সাহেব আপনাকে দিয়েছেন। কালু, এদিকে আয়! দেখ্ তো এটা সেই সাইকেল না! সেই যে মির্জা সাহেব গতবছর আমাদের এখানে বেচতে এনেছিলেন। চিনেছিস? তা কম করে একশ বছর বয়েস হবে এ সাইকেলের– কী বলিস?’
এইসব টিটকারি শুনে রাগে সর্বশরীর আমার জ্বলে যাচ্ছিল, ‘মির্জা সাহেবের ছেলে এই সাইকেলে করে কলেজ যেত। তার কলেজ ছাড়ার তো এখন পর্যন্ত পুরো দু-বছরও হয়নি।’
লোকটা বলল, ‘তা ঠিক। কিন্তু তার আগে মির্জা সাহেবও এই সাইকেলে চেপে কলেজ করতেন। তা কত বছর আগের কথা হবে রে, কালু?’ উত্তরটাও সে নিজেই দিয়ে দিল, ‘চল্লিশ বছরের কম হবে না, কী বলিস? তোর তো ব্যাটা তখন জন্মই হয়নি, বলবি কেমন করে!’
চোখ-কান বুজে, সব টিটকারি হজম করে আবার রওয়ানা হলাম। মিস্ত্রি যেরকম ধারণা দিয়েছিল, তার চাইতে অনেক তাড়াতাড়ি হ্যান্ডেল আর আসনের দুর্যোগ আবার আরম্ভ হয়ে গেল। কিছুক্ষণ চলার পর নেমে পড়তে হল আমাকে। কিছুদূর পর্যন্ত ঠেলে ঠেলে নিয়ে গেলাম। কিন্তু তাতে শরীরের ওপর কষ্ট আরও বেড়ে গেল। তখন সাব্যস্ত করলাম, পানির দামে হলেও সাইকেলটাকে বেচে ফেলব। রাস্তায় আরও একটা দোকান পড়ল। সাইকেল নিয়ে উঠলাম সেখানে গিয়ে।
দোকানদার এগিয়ে এল আমার দিকে। কিন্তু আমার মুখে যেন তালা-চাবি লেগে গেছে। চিরকাল কিনতেই অভ্যস্ত, বেচার কৌশল তো কোনোদিন আয়ত্ত করা হয়নি। কাজেই কোন কথা দিয়ে শুরু করব, তা কিছুতেই ঠাওর করতে পারছিলাম না। অনেক ভাবনা-চিন্তার পর মুখ থেকে কেবল এইটুকু বেরুল, ‘সাইকেল।’ দোকানদার বলল, ‘তা তো দেখতেই পাচ্ছি।’
আমার আবার সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন, ‘নেবে?’
‘মানে?’
‘মানে বেচতে চাই।’
দোকানদার আমার দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকাল। ভাবলাম, আমাকে আবার চোর বলে সন্দেহ করছে না তো! সে সাইকেলটা একবার দেখল, তারপর আমাকে দেখল। আবার সে সাইকেলটাকে দেখল, দেখে আবার আমাকে দেখল। তার এই দর্শন দেখে মনে হল, কোনটা সাইকেল, আর কোনটা আমি, তা যেন সে ঠাওর করতে পারছে না। শেষে বলল, ‘ওটাকে বেচে কী করবেন?’
এরকম বিদ্ঘুঁটে প্রশ্নের সঠিক উত্তর কী হওয়া উচিত, তা আল্লাই ভালো জানেন। আমার তা জানা নেই বলে পাল্টা প্রশ্ন করলাম আমি, ‘তুমি কি জানতে চাচ্ছ, সাইকেলটা বিক্রি করে আমি যে টাকা পাব, তা কোথায় খরচ করব?’
‘খরচ আপনি যেখানে খুশি করুন। কিন্তু তার আগে, এ সাইকেল যে কিনবে, সে এটা নিয়ে কী করবে?’
‘কেন, সাইকেলটার উপর চাপবে।’
‘আচ্ছা, না হয় চাপল। তারপর?’
‘তারপর? কেন, তারপর চালাবে।’
‘চালাবে! বেশ। খোদা বখ্শ, এদিকে আয় তো! এই যে এই সাইকেলটা বিক্রি হবে, বুঝেছিস?’
যে ব্যক্তির নাম খোদা বখ্শ, সে একটা নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে সাইকেলটা দেখতে লাগল। যেন কাছে এলে আমার সাইকেলটা তাকে কামড়ে দেবে। তারপর, আর একটু এগিয়ে এসে নাসিকা-রন্ধ্রে ঘন ঘন বাতাস ঢুকিয়ে বের করে দিতে লাগল। যেন গন্ধ শুঁকে সে আমার সাইকেলের মর্যাদা আঁচ করতে চায়। তারপর, তারা দুজন নিজেদের মধ্যে ফিসফাস্ আলাপ করল। শেষে খোদা বখ্শ আমার কাছে এগিয়ে এসে বলল, ‘আপনি তাহলে সত্যি সত্যি বেচে ফেলবেন?
আমি ঝাঁঝালো সুরে বললাম, ‘তবে কী? তোমার ধারণা, আমি তোমার সঙ্গে খোশ-গল্প করার জন্যে এখানে এসেছি?’
‘তাহলে কত দিতে হবে, বলুন।’
‘তুমিই বল।’
‘সত্যি করে বলব?’
‘হ্যাঁ, সত্যি করেই বল।’
‘সত্যি করে বলব?’
‘বললাম তো, সত্যি করেই বল। খামোখা কথা বাড়াচ্ছ কেন?’
‘তিন টাকা দিতে পারি।’
আমার রক্ত গরম হয়ে একদম মাথায় চড়ে গেল। রাগে থরথর করে কাঁপতে লাগল আমার সারা শরীর। বললাম, ‘নীচ, ছোটলোক কথার তুবড়ি ফুটিয়ে তুই আজ আমার যে অপমান করলি, সেজন্যে আমার দুঃখ নেই। কিন্তু এই নিরীহ, অবোলা সাইকেলটার মনে তুই যে কষ্ট দিয়েছিস, সেজন্যে আমি তোকে রোজ-হাশরের দিন পর্যন্ত ক্ষমা করব না।’ এই বলে আমি তাড়াতাড়ি সাইকেলে চেপে, বেপরোয়াভাবে প্যাডেল চালিয়ে ছুটতে লাগলাম।
ততক্ষণে সাইকেল আমার কুড়ি-পঁচিশ পাক ঘুরেছে, কি ঘোরেনি– এমন সময় কেমন যেন একটা কাণ্ড হয়ে গেল। আমি মাটি থেকে পৃথক হয়ে শূন্যে উঠে গেলাম আর আকাশটা আমার দু-পায়ের ফাঁক দিয়ে নেমে গেল নিচে। আর দেখলাম, রাস্তার ধারের বাড়িগুলো পরস্পর জায়গা বলাবলি করছে। কিছুক্ষণ পর অনুভব করলাম, আমি মাটির উপরে বসে রয়েছি। আমার এই বসে থাকা এতই স্বাভাবিক আর নিশ্চিন্ততা-মিশ্রিত যে, এ যেন রাস্তা নয়, বরং আমি বসে রয়েছি আমার বৈঠকখানার বারান্দায়। এমন একটা স্বাভাবিক ব্যাপারের আমি কেন্দ্রবিন্দু, অথচ বৃত্তাকারে দাঁড়িয়ে রয়েছে যারা, তারা হাসছে। হাসির কারণ আবিষ্কার করতে গিয়ে দেখলাম, সাইকেলের সামনের চাকাটা গড়াতে গড়াতে গিয়ে পড়েছে রাস্তার ওই মাথায়, আর বাদ-বাকি আমার কাছেই স্তূপাকারে পড়ে রয়েছে।
আমি তাড়াতাড়ি মাটি থেকে উঠলাম। রাস্তার ওই মাথা থেকে চাকাটা নিয়ে এলাম। স্তূপের মধ্য থেকে বাদ-বাকি অংশ এ-হাতে, ও-হাতে, বগলের তলায়, গলায় ঝুলিয়ে হাঁটতে আরম্ভ করে দিলাম।
