এইসব চিত্র-বিচিত্র ধ্বনি শুনে পথচারীর মনের চিত্র-বিচিত্র প্রতিক্রিয়াও লক্ষণীয়। বিশেষত আমার সাইকেল যখন ঢালু রাস্তা দিয়ে নামছে, তখন যে-সব পার্ট এতক্ষণ নীরব ছিল, তারা আড়িমুড়ি দিয়ে ঘুম ভেঙে জেগে একসঙ্গে সবাই সরব হয়ে উঠছে। পথচারীদের কেউ চমকে ফিরে তাকাচ্ছে আর কেউ থমকে দাঁড়িয়ে পড়ছে। মায়ের কোলের শিশু ভয় পেয়ে বুকের মধ্যে সেঁধিয়ে যাচ্ছে।
এতক্ষণ আমার সাইকেল অস্বাভাবিক গতিসম্পন্ন ছিল বলে তার দুর্বল স্বাস্থ্যের ওপর অচিরে একটা বিরূপ প্রতিক্রিয়া লক্ষ করা গেল। আর, এই বিরূপ প্রতিক্রিয়ার জন্য একসঙ্গে দু-দুটো পরিবর্তন সাধিত হল। প্রথমত, সামনের চাকাসহ হ্যান্ডেলটা বেঁকে গেল। ফলে, যখন আমি সোজা যেতে চাইছি, সাইকেল তখন আমাকে বাঁ দিক দিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য দৃঢ়প্রতিজ্ঞা ঘোষণা করছে। দ্বিতীয়ত, সাইকেলের আসন আনুমানিক ছয় ইঞ্চি পরিমাণ নিচে নেমে গেল। ফলে, যখন আমি প্যাডেল ঘোরাচ্ছি, তখন ওঠানামা করার সময় আমার দুই পায়ের হাঁটু একবার করে চিবুক স্পর্শ করে যাচ্ছে। অনুষঙ্গ স্বরূপ, মাজায় আর মাথায় অস্বস্তিকর অনুভূতি পীড়া দিতে লাগল।
আসনের নিচু হয়ে যাওয়াটা সর্বতোভাবেই পীড়াদায়ক হয়ে উঠল। সুতরাং, ওটাকে ঠিক করে নেওয়াই ভালো মনে করলাম। সাইকেল থামিয়ে নিচে নামলাম। সাইকেল থামানোর সঙ্গে সঙ্গে মনে হল, গোটা দুনিয়া জুড়ে এতক্ষণ যে প্রলয়-কাণ্ড হচ্ছিল, তা এক নিমেষে থেমে গেছে। থলে থেকে যন্ত্রপাতি বের করে আসনটাকে উপরে তুললাম এবং হ্যান্ডেলটাকে অনেকখানি সোজা করে রওয়ানা হয়ে পড়লাম আবার।
সাইকেলের চাকা দশ পাক ঘুরতে-না-ঘুরতেই হ্যান্ডেল নিচে নেমে গেল, ফলে আসনটা রয়ে গেল ইঞ্চি দুয়েক উপরে। এবারে আমার সমস্ত শরীর সামনের দিকে ঝুঁকে থাকল। দেহের সমস্ত ভার হাতের উপর পড়েছে, আর হাতের ভার হ্যাঁন্ডেলের উপরে। আমার অবস্থাটা একবার কল্পনা করুন। পেছনের চাকার সেই ব্যান্ডেজের অন্য আমার শরীরের পেছন দিকটা একবার উঠছে, আর একবার নামছে। আমার এই অবস্থা দূর থেকে দেখলে মনে হবে, কোনো স্ত্রীলোক আটা ছানছে। সত্যি সত্যি লোকে তা ভাবছে কিনা, অনুমান করার জন্য আড়চোখে তাকিয়ে নিলাম ডাইনে-বাঁয়ে। আর, সেই ভাবনা আমার চেহারাখানাকে করে তুলল ঘর্মাক্ত। এখানকার সব লোক আমোদপ্রিয়– বিপদে আমাকে সাহায্য করার কথা কোনো আদম-তনয়ের মনে যে মুহূর্তের জন্যও স্থান লাভ করবে না সে সম্বন্ধে আমি নিঃসন্দেহ।
হ্যান্ডেলের পর এখন আসন আবার নিচের দিকে নামতে লাগল। শেষে অবরোহণের মাত্রা। এমন এক সীমায় গিয়ে পৌঁছাল যে, আমি প্রায় মাটির কাছাকাছি গিয়ে নীত হলাম। একটা বাঁচাল ছেলে বলে উঠল, ‘দেখ, দেখ্, লোকটা কেমন কসরত দেখাচ্ছে!’ আমাকে শেষ পর্যন্ত সার্কাসের ক্লাউন মনে করল ওরা।
সাইকেল থেকে নেমে আমি আবার হ্যান্ডেল আর আসন ঠিক করলাম। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই তা আবার যা-কে-তাই। কখন যে আসনটা নিচে নামবে, আর কখন হ্যান্ডেল, তা আগে থেকে অনুমান করা অসম্ভব হয়ে উঠল। হ্যান্ডেল নিচে নেমে যাওয়ার চাইতে আসন নিচে নেমে যাওয়াটা বেশি পীড়াদায়ক। কাজেই আসন যাতে নিচে না নামে, সেজন্য বসবার লোভ সংবরণ করে আসন থেকে দেহের একটা নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে চলতে লাগলাম। কিন্তু তাতে করে সমস্ত ভার গিয়ে পড়ল হ্যাঁন্ডেলের উপর, আর হ্যান্ডেল তখন উত্তরোত্তর নামতে থাকল আরও নিচের দিকে।
এইভাবে সাকুল্যে যখন দু মাইল মাত্র চলা হয়েছে, তখন ডন টেনে আর উঠ-বোস্ করে আমি একেবারে ক্লান্ত হয়ে পড়েছি। এই রকম ব্যায়াম করতে করতে আরও চার মাইল অগ্রসর হওয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়। তখন সাব্যস্ত করলাম, সাইকেলটাকে একটা দোকানে দিয়ে মেরামত করিয়ে নেব।
সাইকেল মেরামতের দোকানে যত লোক কাজ করছিল, তারা সবাই একসঙ্গে আমার দিকে তাকাল। কিন্তু আমি তাতে একটুও ভয় না পেয়ে বুক ফুলিয়ে বললাম, ‘সাইকেলটা মেরামত করতে হবে।’
একজন এগিয়ে এল। হাতে তার একটা লোহার শিক। সেই শিক দিয়ে সে আমার অবোলা সাইকেলটার বিভিন্ন অঙ্গে নির্মম আঘাত হেনে অবস্থা পরীক্ষা করতে লাগল। এইভাবে অনেকক্ষণ ধরে ‘মরার উপর খাঁড়ার ঘা’ চালিয়ে সে আমাকে প্রশ্ন করল, ‘কোন কোন জায়গা মেরামত করাবেন?’
লোকটার কুমতলব টের পেয়ে আমি আগেই তার কুমতলবের গোড়া মেরে দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করলাম। বললাম, ‘তুমি তো বাপু বড় বেয়াদব, দেখছি! তোমার কি চোখ নেই? দেখছ না, শুধু গদিটা আর হ্যান্ডেলটা একটু উঁচু করে টাইট করে দিতে হবে তাড়াতাড়ি ঠিক করে দাও, আর কত দিতে হবে, সে-কথা বল!’
লোকটা বলল, ‘মাড-গার্ডটা তাহলে বাঁকাই থাকবে?’
‘ঠিক আছে, মাড-গার্ডটাও না হয় সোজা করে দাও।’
‘তাছাড়া অন্যান্য জায়গা খুলে ফিট্ করলে ভালো হত।’
‘আচ্ছা, তা-ও না হয় করে দাও– যদি ভালো চলে।’
‘এতে আপনার কিছু সময় লাগবে। তা দশ-পনরো দিন লাগতে পারে। সাইকেলটা দোকানে রেখে যান।’
‘আর খরচ পড়বে কত?’
‘তা ত্রিশ-চল্লিশ টাকা লাগতে পারে।’
বললাম, ‘থাক, অত মেরামতে কাজ নেই। যা বলেছি, এখন তাই করে দাও। বাদ-বাকি পরে দেখা যাবে।’
লোকটা হ্যান্ডেল আর আসন উঁচু করে কষে দিল। তারপর চলে যাচ্ছি, এমন সময় সে আবার একটা ফোড়ন কাটল, ‘কষে দিয়েছি বটে, কিন্তু আপনার স্ক্রু সব ক্ষয়ে গেছে। একটু পরে আবার ঢিলা হয়ে যেতে পারে।’
