ফরুখ ফিরে আসতে আসতে ফওজিয়ার আর কিছুই মনে থাকল না সে রাত্রির ঘটনা। কাজেই সেসব কথা ফরুখকে বলারও প্রয়োজন করছে না। থাকল বাকি নওয়াজিশ। কিন্তু নওয়াজিশ নামের কাউকে সে চেনে না। তবে হ্যাঁ, শোফারের কথা যদি বলেন, শোফার তাদের একটা রয়েছে বটে। কিন্তু এখন তার মোটরে চড়তে ভালো লাগে না। তাহলে আর কিসের শোফার, কেমন শোফার!
.
ছ-মাস অতিবাহিত হয়ে গেছে। পুতুল-ঘরের পুতুলরা আগেই মতোই। তেমনি মাপা মাপা হাসি, মাপা মাপা কথা। তেমনি দরজা খুলে দেওয়া, কোট পরিয়ে দেওয়া, পার্স তুলে দেওয়া।
ছ’মাস অতিবাহিত হয়ে গেছে। ফওজিয়া যেন সত্যি সত্যি ভুলে গেছে নওয়াজিশের কথা।
তারপর, একদিন ফরুখ এসে ফওজিয়াকে বলল, ‘আমরা করাচি যাচ্ছি। তুমিও সঙ্গে যাচ্ছ, ডার্লিং। এবারে অনেকদিন থাকতে হবে। শোফারকেও নিয়ে যেতে হবে।
ফওজিয়া শুনল। কেবল শেষ বাক্যটি শুনতে পেল না। শুনতে চায় না বলে।
পরের দিন তারা সেই মেলগাড়িতে চাপল, যে গাড়ি ঝিম্পিরে সেই বিখ্যাত দুর্ঘটনায় বিধ্বস্ত হয়ে গেল। প্রথম শ্রেণির দুই আসনের একটি ছোট প্রকোষ্ঠে ওরা বসে বসে মাপা মাপা হাসিতে আর মাথা মাপা কথায় সারাটা দিন কাটিয়েছে। তারপর, ওরা ঘুমিয়ে ছিল। হঠাৎ বিস্ফোরণের মতো বিকট এক শব্দে ফওজিয়ার ঘুম ভেঙে গেল। সম্বিৎ ফিরে পেয়েছে কি পায়নি–চোখে দেখছে কেবল আগুন আর ধোঁয়া আর ধুলো। সেই আগুনে, ধোঁয়ায় আর ধুলোতে ফররুখের সারা শরীর জড়িয়ে রয়েছে। ফওজিয়া চিৎকার দিতে গেল, কিন্তু পারল না। সে যেন স্বপ্ন দেখছে। কিন্তু স্বপ্নেও তো চিৎকার দেওয়া যায়। তবু সে কেন পারছে না চেঁচাতে। তার গলা কেন রুদ্ধ হয়ে আসছে। এমন সময় ঝড়ের বেগে ঢুকল নওয়াজিশ। দেখার সঙ্গে সঙ্গে ফওজিয়া চিৎকার করে উঠল, ‘নওয়াজিশ–!’ সঙ্গে সঙ্গে অজ্ঞান হয়ে গেল সে।
ফওজিয়াকে ছোট ছেলের মতো করে কোলে তুলে নিয়ে নওয়াজিশ ধ্বংসস্তূপ থেকে ছিটকে বেরিয়ে ছুটে পালাল।
ফওজিয়ার যখন জ্ঞান ফিরে এল, দেখতে পেল, সামনে দাঁড়িয়ে নওয়াজিশ তার গোঁফে তা দিচ্ছে। নওয়াজিশ বলল, ‘কিচ্ছু ভাববেন না, বেগম সাহেব। নওয়াজিশ যতক্ষণ আপনার কাছে রয়েছে, আপনার কোনো ভয় নেই।’ কিন্তু তার মুখে কথা শেষ না হতেই ফওজিয়া অজ্ঞান হয়ে গেল আবার।
দ্বিতীয় দফা যখন তার জ্ঞান ফিরল, তখন সে হাসপাতালে। তখনো নওয়াজিশ কাছে দাঁড়িয়ে গোঁফে তা দিচ্ছিল।
.
মা, বোন, নার্সের উপস্থিতি সত্ত্বেও ফওজিয়া কারও সঙ্গে কথা বলে না। সারাদিন পড়ে থাকে বিছানায়। মস্ত বড় সাদা বাংলোর পুতুল-ঘরে কোন্ পুতুল কী বলছে, তা সে বুঝতে পারে না। সবাই তার কথাই বলছে : কিন্তু সে জানে না, কেন বলছে।
তারপর, রাত যখন গম্ভীর হয়, সবাই যখন ঘুমিয়ে পড়ে, তখন বিকট চিৎকারে ফওজিয়ার রাত্রির নিস্তব্ধতা ভেঙে খানখান হয়ে যায়। তার চারপাশে ভেঙে গুঁড়িয়ে পড়ে থাকে রেশমের, ঝালরের, কুশনের, মখমলের, পুতুলের দুনিয়া। পাথরের মতো শক্ত, বাস্তব, কঠোর, নিষ্ঠুর দুনিয়াকে সামনে পাওয়ার জন্য সে চিৎকার করে ডাক দেয়, ‘নওয়াজিশ—।’
অনুবাদ : নেয়ামাল বাসির
সাইকেল – পিত্তরাম বোখারি
সেই সাইকেল চেপে শেষ পর্যন্ত রওয়ানা হলাম। প্রথম দফা প্যাডেল ঘোরাতেই বোধ হল যেন একটা কঙ্কাল অসংখ্য কঙ্কালের উপর দিয়ে হেঁটে চলেছে।
কিছু দূর যেতে-না-যেতেই একটা ঢালু রাস্তা পড়ল। তখন আর প্যাডেল করার দরকার হল না– সাইকেল আপনাআপনিই চলতে লাগল। তবু তার গতি ঘন আলকাতরা মাটির উপর ঢেলে দিলে যত হয়, তার চাইতে বেশি নয়।
সাইকেলের বিভিন্ন অংশ থেকে বিবিধ ধ্বনি নির্গত হতে লাগল। এইসব ধ্বনি বিভিন্ন গোত্রে বিভক্ত। গদির নিচে থেকে আর পেছনের চাকা থেকে যে ধ্বনি বেরুচ্ছে তা এই রকম : ‘চিঁ চাঁ চুঁ।’ অন্য গোত্রের ধ্বনি ছিল : ‘খট্ খড়্গ খড়্গ খড়্গ ডু।’ এই গোত্রের নিবাস মাড-গার্ডে। আর এক গোত্র ডেরা গেড়েছে সাইকেলের চেইনে আর প্যাডেলে, যা এইরকম : ‘ছর্-ছরর্ ছর-ছরর্।’ কিন্তু এই শেষোক্ত গোত্রের ধ্বনি আবার বদলে যাচ্ছে যখন আমি জোরে প্যাডেল ঘোরানোর চেষ্টা করছি। তখন হচ্ছে : ‘ছরর্-ছরর্ ছরর্-ছরর্।
পেছনের চাকা কেবল যে ঘুরছে, তাই নয়– সে চাকা দুলছেও। অর্থাৎ, সামনের দিকে গড়িয়ে যাচ্ছে, উপরন্তু একবার ডাইনে আর একবার বাঁয়ে হেলছে। এর ফলে রাস্তার ধুলোর উপর যে ছাপ পড়ছে, তা দেখে যে-কারও মনে হতে পারে, কোনো নেশাখোর সাপ সেদিক দিয়ে চলে গেছে।
কাদা-পানির ছিটে না লাগে, সেই জন্য মাড-গার্ড। কিন্তু আমার সাইকেলের মাড-গার্ড ঠিক জায়গায় অবস্থিত নয়। ফলে, আমি যখন উত্তর দিক দিয়ে চলব আর সূর্য থাকবে পশ্চিমে, তখন সাইকেলের টায়ারে রোদ লাগতে পারবে না।
পেছনের টায়ারে বিরাট একটা ব্যান্ডেজ। ফলে, এক পাক ঘুরে ওই জায়গায় এলেই গোটা সাইকেল পালোয়ানি কায়দায় লম্ফ দিয়ে উঠছে। আপনার চিবুকের নিচে জোরে একটা ঘুসি মারলে যেমন হতে পারে, আমার সাইকেলের অবস্থা ওই সময় ঠিক তেমনি হচ্ছে। প্রতি চক্রেই ওইরকম হচ্ছে। তার মানে, বুঝে নিন, চাকাটা যতবার ঘুরছে, ততবারই আপনার চিবুকের তলায় একটা করে ঘুসি পড়ছে।
সামনের চাকারও নিজস্ব একটা গোত্রগত ধ্বনি রয়েছে; কিন্তু সেটাকে আলাদাভাবে বিশ্লিষ্ট করা কষ্টকর। কাজেই সামনের আর পেছনের মিলিয়ে যে সমষ্টিগত ধ্বনি হচ্ছে, তা এইরকম : ‘চুঁ-চুঁ-ফট্ চুঁ-চুঁ-ফট্।’ ঢালু রাস্তা দিয়ে নামবার সময় গতি যেহেতু আপনাআপনি বেড়ে যাচ্ছে, সেহেতু এই একই ধ্বনি বদলে দ্রুততা লাভ করেছে : চুঁ-চুঁ-ফট্ চুঁ চুঁ-ফট্ চুঁচুঁফট্-চুঁচুঁফট্।’ আফ্রিকার কোনো ভাষায় বাচ্চারা সমস্বরে নামতা পড়লে ধ্বনির সামগ্রিক রূপ এইরকম দাঁড়ায় কিনা কে জানে।
