সে-রাতটা নিরাপদেই কেটে গেল। পরেরদিন জরুরি ডাক এল করাচি যাওয়ার। যাওয়ার আগে ফওজিয়াকে সে অনেক পরামর্শ দিয়ে গেল, ‘ফিজি, এইসব বদমাইশদের ভয় করার কোনো কারণ নেই। ওরা ছোটলোক– নিজেরাই ভীরু। বুঝেছ? ওরা যদি বাড়ির ভেতর পর্যন্ত ঢুকে যায়, তাহলে পুলিশকে ফোন করে দিও। ওদের তেমন সাহস হবে না, তা আমি তোমাকে বলে দিচ্ছি। বুঝেছ, ফিজি? আর, যদি লুট করার জন্যে ঢুকেই পড়ে, তাহলে চাকরদের ঘরে চলে যেও। আমি ওদের সব বুঝিয়ে দিয়ে যাচ্ছি। চৌকিদার আর শোফার বাংলোর কোনার ঘরটায় শোবে। বুঝেছ, ডার্লিং?’
ফররুখ চলে গেল। সেই রাত্রেই হাঙ্গামা আরও বাড়ল। গোলমাল শুনে ঘুম ভেঙে গেল ফওজিয়ার। আতঙ্কে চিৎকার করে ডাক দিতে লাগল, ‘চৌকিদার, চৌকিদার!’ দাঙ্গাকারীরা আরও যেন বাংলোর কাছে এসে গেছে। আরও বেশি ভয় পেয়ে, পুতুল- ঘরের সমস্ত শিক্ষা ভুলে গিয়ে সে প্রাণপণে চিৎকার করে ডাক দিল, ‘নওয়াজিশ, নওয়াজিশ!’ এই প্রথম সে নওয়াজিশকে নাম ধরে ডাকল।
আগের মতোই তেমনি নিশ্চিন্ত, নিরুদ্বিগ্ন নওয়াজিশ কাঁধের উপর ওভারকোটটা ফেলে নিয়ে, ধীরে সুস্থে তার সেই নিজস্ব বড়লোকি চালে এসে ঢুকল বেগম সাহেবের শয়নকক্ষে। নওয়াজিশকে দেখতে পেয়ে ফওজিয়া চেঁচিয়ে উঠল, ‘ওই– ওই– ওই যে আসছে, ওরা আসছে।’
‘চেঁচাবেন না, বেগম সাহেব।’ শক্ত গলায় শাসিয়ে উঠল নওয়াজিশ, ‘চেঁচালে ওরা শুনতে পাবে, আর শুনতে পেলে আপনারই বিপদ।’
ধমক খেয়ে আতঙ্কটা ভয়ে রূপান্তরিত হল। ফওজিয়া এখন থিতিয়ে উঠে, সুর নামিয়ে
বলল, ‘ওরা আসছে, ওরা আসছে। আমি যাই, পুলিশকে টেলিফোন করে দিই।’ বলে সে টেলিফোনের দিকে এগুতে লাগল।
নওয়াজিশ পথ আগলে দাঁড়াল। ‘টেলিফোন করতে হবে না। দরকার নেই। তাতে কোনো লাভ হবে না।’
‘কিন্তু–’ ফওজিয়া আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল। ‘চুপ করুন, বেগম সাহেব, কথা বলবেন না।’ গর্জন করে উঠল নওয়াজিশ। ‘নওয়াজিশ যতক্ষণ রয়েছে, কেউ আপনার গায়ে হাত তুলতে পারবে না।’
ফওজিয়া ধমক-খাওয়া শিশুর মতো চেয়ারে গিয়ে বসে পড়ল থপ্ করে। আর, নওয়াজিশ তার সেই বড়লোকি ঢঙে দরজার কাছে গিয়ে শক্ত হয়ে দাঁড়াল। সিগারেট ধরিয়ে মুঠোয় মধ্যে চেপে ধরে হুঁকো টানার মতো করে টানতে লাগল। যেন কিছুই হয়নি, এমনি একটা ভাব।
দাঙ্গাকারীরা প্রাচীর টপকে বাংলোর মধ্যে ঢুকে পড়েছে। তাদের চিৎকারে শয়ন কক্ষের জিনিসপত্র পর্যন্ত কেঁপে উঠল। তবু নওয়াজিশ নিশ্চিন্তে দরজার কাছে দাঁড়িয়ে রয়েছে দেখে ফওজিয়া পেছনের দরজা দিয়ে পালিয়ে যেতে চাইল। আমি চাকরদের ঘরে চলে যাচ্ছি– ‘
মুখের কথা এখনো শেষ হয়নি, নওয়াজিশ এক লাফে সেখানে গিয়ে ফওজিয়াকে ধরে ফেলল। তারপর বাচ্চা ছেলের মতো করে তাকে কোলে তুলে নিয়ে বিছানার উপর ছুঁড়ে ফেলে দিল। ‘চুপ করে শুয়ে থাকুন, বেগম সাহেব।’ এবারে তার কণ্ঠে প্রচণ্ড ক্রোধ। ‘বললাম, নওয়াজিশ থাকতে ভয় করবেন না। ‘
নওয়াজিশের এই ব্যবহারে কী যেন একটা হয়ে গেল। কোথায় যেন আগুন জ্বলে উঠল। তারপর, এক মুহূর্তে সে আগুন নিভে গেল পানির মধ্যে পড়ে। বিছানায় ফওজিয়া মড়ার মতো আড়ষ্ট হয়ে পড়ে থাকল। একটুও নড়ল না। প্রশান্ত বিলে এতদিন যে ঢেউটুকু ছিল, তা-ও অবশিষ্ট থাকল না আর। এখন আর আতঙ্ক নেই, ভয় নেই। দাঙ্গাকারীরা একেবারে কাছে এসে গেছে– সে দেখতে পাচ্ছে। কিন্তু এ দেখা যেন ঠিক দেখা নয়। নওয়াজিশ তেমনি অটল পাহাড়ের মতো দরজা আগলে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সিগারেট টানছে। ঘরটাকে আড়াল করে রয়েছে সে পর্দার মতো। আর, সেই পর্দায় বায়স্কোপের ছবির মতো দাঙ্গাকারীরা যেন নড়ছে, ভাসছে। সে যা দেখছে, তা অনুভব করতে পারছে না; যা অনুভব করতে পারছে, তা যেন দেখতে পাচ্ছে না।
এমন সময় হঠাৎ নওয়াজিশ হুঙ্কার দিয়ে উঠল, ‘এখানে কী জন্যে এসেছ, তোমরা? যাও, বেরিয়ে যাও! এখানে কেউ নেই। বেরিয়ে যাও! যাও বলছি এখান থেকে! যাও!’
দাঙ্গাকারীরা চলে গেল। গোটা বাংলোয় ছড়িয়ে পড়ল মৃত্যুর মতো নিস্তব্ধতা। নওয়াজিশ আর একটা সিগারেট ধরিয়ে আরও কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকল। তারপর, দরজার কাছ থেকে সরে দাঁড়িয়ে ফওজিয়ার দিকে না তাকিয়েই বলতে লাগল, ‘বলেছি না, নওয়াজিশ থাকতে আপনার গায়ে কেউ হাত দিতে পারবে না! নিশ্চিন্ত মনে ঘুমিয়ে পড়ুন। দরকার পড়লে আমাকে ডাক দেবেন। ছিটকিনি লাগিয়ে নিন।’ কণ্ঠে সেই একই আদেশের সুর। সেই একই বড়লোকি চাল।
বিছানা থেকে উঠে ফওজিয়া ঠিক যেন হুকুম তামিল করার জন্যই ছিটকিনি লাগাতে গেল। বেগম যেন হঠাৎ আজ বাঁদিতে পরিণত হয়েছে।
অনেকক্ষণ পর্যন্ত বিছানায় পড়ে থাকল ফওজিয়া। ঘুম এল, কি এল না। আস্তে আস্তে রাত গড়িয়ে গেল। সকাল হল। বিছানা থেকে উঠে ফওজিয়া নতুন একটা অচেনা জগৎ বিছিয়ে রয়েছে দেখল তার সামনে। আর, তার পুরনো জগৎ– পুতুলের জগৎকে ছিন্নভিন্ন হয়ে পড়ে থাকতে দেখল তার চারপাশে। এ কী হল! পুতুলের রাজ্যে এ কী প্রলয় কাণ্ড! মখমল, রেশম, ঝালর, কুশন, পুতুলের শাস্ত্র– সবাই একসঙ্গে মুখ থুবড়ে পড়ে রয়েছে কেন?
কিন্তু না, সে ফওজিয়া, সে বেগম সাহেব। হঠাৎ তার চৈতন্য ফিরে এল। ভুলে যেতে চাইল রাত্রির ঘটনা। বাঁচতে হবে। ফিরে পেতে হবে নিজের সত্তাকে। এই তো মখমল, গালিচা। এই তো রেশম, ঝালর, কুশন, শো-কেস্। এই তো পুতুল, শাস্ত্র, পুতুলের শিক্ষা, দীক্ষা, সভ্যতা, ভব্যতা। এই তো ফওজিয়া, এই তো বেগম সাহেব।
