এইভাবে একদিন এক পুরুষ-পুতুল ফওজিয়াদের ড্রয়িংরুমে এল। ফওজিয়ার দিকে তার সে কী চাহনি! প্রথম প্রথম সে ভয় পেয়েছিল এই দৃষ্টি দেখে। কিন্তু ভয়ের সঙ্গে মেশানো ছিল আনন্দের দোলা। নিরিবিলিতে ডেকে নিয়ে গিয়ে সেই পুতুল এমন সব-কথা বলল, যা এর আগে ফওজিয়া কখনো শোনেনি, শেখেনি। ছকের বাইরে যেন কথাগুলো। ভারি আনন্দের, ভারি মজার। তার সামনে নতুন একটা গোটা জগৎ উন্মোচিত হয়ে গেল।
আরো অনেক পুতুলের আনাগোনা ছিল। কিন্তু কয়েক মাসের মধ্যেই ফরুখের সঙ্গে ফওজিয়ার বিয়ে হয়ে গেল বলে আরও অনেক নতুন জগৎ উন্মোচিত হতে পারল না। ফররুখের মুখের কথাও অমনি ছক-কাটা পুতুলের মতো। তার দেখাও দেখবার জন্য নয়– দেখানোর জন্য। সে-ও এসব আয়ত্ত করেছে অন্য এক পুতুল-ঘরের পরিমণ্ডলে থেকে।
বিয়ের পরেও ফওজিয়ার পুতুল-জীবনে বিশেষ কোনো পরিবর্তন এল না। পরিবর্তন হল কেবল এটুকুই যে, এক পুতুল-ঘর থেকে অন্য পুতুল-ঘরে গিয়ে নামল সে। সেখানেও রেশমের পর্দা, দামি দামি আসবাবপত্র, ঘুমোনার জন্য শো-কেস্ আর তেমনি বাগান। বিয়ের পরে সে একেবারে একলা হয়ে গেল। আগে যেখানে দাস-দাসীরা তার কাজ করে যেত, এখন সে জায়গায় যোগ হল আরও একজন– ফরুখ। ফরুখ তার জন্য দরজা খুলে দেয়, চেয়ার এগিয়ে দেয়, কোট পরিয়ে দেয়, পার্স তুলে দেয়। ডাক পড়লেই ‘ডার্লিং’ বলে ছুটে আসে। বিয়ের পরে নাম হয়ে গেল বেগম ফওজিয়া। কিন্তু ফররুখ ডাকে ফিজি বলে। আর, সে তার ফিজিকে এমন আগলে আগলে, ঢেকে ঢেকে রাখে, যেন অস্থাবর সম্পত্তি– কেউ টুক করে চুরি করে নিয়ে পালাবে। ফওজিয়া যেন কাঁচের জিনিস– পুট্ করে ভেঙে যাবে, তাই ফররুখ তাকে আলতো করে গাড়িতে চাপায়, আলতো করে গাড়ি থেকে নামায়। যত সাবধানতা, ভেঙে পড়ার আশঙ্কা যে ততই বেশি, সে-বোধ তার মনে জাগেনি কখনো।
নতুন পুতুল-ঘরে এসেই প্রথম ফওজিয়া নওয়াজিশকে দেখেছে। নওয়াজিশকে দেখেছে, সেটা এমন কোনো ঘটনা নয়। নেহাত দেখছে, এই যা। নওয়াজিশ হয়েছে তার কাছে শোফার মাত্র– নওয়াজিশ নয়। সে হচ্ছে নফর মানুষ, খেটে-খাওয়া মানুষ। তার দিকে দেখার মতো করে তাকানো শাস্ত্রে লেখা নেই। যদি থাকত, তাহলে ফওজিয়া দেখতে পেত শোফারকে নয়– নওয়াজিশকে, দীর্ঘ শক্ত যার দেহখানা, প্রশস্ত যার ছাতি, ঘন দীর্ঘ গোঁফের ফাঁকে যার সবসময়ই লেগে থাকে অকৃত্রিম, স্বভাবসিদ্ধ হাসি, আর যার অস্বাভাবিক উজ্জ্বল চোখের গভীরতা থেকে অবিরাম বিচ্ছুরিত হয় বিদ্যুতের ছটা।
সাধারণভাবে নওয়াজিশের সঙ্গে কখনো কথা বলার দরকার হয় না ফওজিয়ার। কারণ, কাজে-অকাজে সবসময় উপস্থিত থাকে ফরুখ। সেই-ই সব কাজ করে দেয় কিংবা করিয়ে দেয়। কিন্তু সম্পত্তির খবরদারি করতে মাঝে মাঝে ফরুখকে যখন করাচি চলে যেতে হয়, তখন ফওজিয়া পুতুল-ঘরে একলা থাকে। নওয়াজিশকে দরকার পড়লে বাইরে পেরির্চে দাঁড়িয়ে ডাক দেয়, ‘শোফা, এ শোফা!’
নওয়াজিশ এই ডাক শুনে ব্যস্ততার কোনো ভাব দেখায় না। ধীরে-সুস্থে সিগারেটে শেষ কয়টা টান দিয়ে নেয়। তারপর ওভারকোটটা কাঁধে ফেলে শিস্ কাটতে কাটতে চলে যায় গ্যারাজের দিকে। গাড়ি নিয়ে পেরির্চে এসে থামায়। অতিরিক্ত কথা দূরে থাক প্রয়োজনীয় কথাও কম বলে। যখন যা হুকুম হয়, তামিল করে যায় নীরবে, ধীরে নিরুদ্বেগে।
নওয়াজিশ স্বভাবগতভাবে ড্রাইভার। কিন্তু চিন্তায় আর মানসিকতায় সবসময় একটা বড়লোকি ভাব। তার হাঁটা দেখলে মনে হবে পবন-দেব মাটিতে নেমেছেন। তার মোটর চালানো দেখলে মনে হবে, এটা গাড়ি নয়– একটা খেলনা। সে কখনো মনে করে না, সে কোনো সাহেবের বা বেগম সাহেবের ড্রাইভার, বরং মনে করে, সে মোটরগাড়ির ড্রাইভার। তার স্বভাবের মধ্যে যে অবাধ্যতার ভাব, তা তার ঘাড় টান করে চলা দেখলেই অনুভব করা যায়। কিন্তু এই অবাধ্যতা দাম্ভিকতা নয়। এ যেন স্বাভাবিক, জন্মগত একটা অধিকার। তাই পুতুল-ঘরের বেগম সাহেবকে সে কখনো মনোযোগ দিয়ে দেখেনি, দেখার প্রয়োজন বোধ করেনি।
ফওজিয়া তার এই নিরাভরণ অবাধ্য-ভাব লক্ষ করেনি, এমন কথা জোর দিয়ে বলা যায় না। কিন্তু লক্ষ যে করেছে, তা সে বুঝতে দেয়নি কখনো। কারণ, বুঝতে দেওয়া মানেই নফর মানুষকে স্বীকৃতি দেওয়া। পুতুলদের শিক্ষায় সে জিনিসের অনুমতি নেই। সে সময় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হচ্ছিল। মারমুখো জনতা রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াচ্ছে আহমদিয়া-বিরোধী ধ্বনি দিতে দিতে। রাত্রে গোলমাল আরও বেড়ে গেল। উত্তেজনাকর ধ্বনি দিয়ে বেড়াচ্ছে দাঙ্গাকারীরা আর ‘মারো মারো, কাটো কাটো’ রব উঠছে। বাহ্যত ভয়ের কোনো কারণ ছিল না, তবু এইসব দেখেশুনে ভয়কে একেবারে মন থেকে তাড়ানোও যাচ্ছিল না। ফররুখ দাঙ্গাকারীদের ‘জংলি, অসভ্য’ ইত্যাদি বলে গালাগালি দিচ্ছিল। বলছিল, ওদের গুলি মেরে উড়িয়ে দেওয়া উচিত। কিন্তু রাত্রে যখন গোলমাল খুব কাছে থেকে শোনা যাচ্ছে, তখন ভয়ে ফরুখের বুক দুরুদুরু কাঁপতে লাগল। ফওজিয়াকে ডেকে বলল, ‘ফিজি, এদিকে এস। আর শোনো, যদি তেমন কিছু হয়, তাহলে আমরা চাকরদের ঘরে চলে যাব, বুঝেছ? ওখানে ওরা আমাদের খুঁজে পাবে না। ধর্মটর্ম কিছু নয়– ওরা তো আসবে লুট করতে। ছোটলোক।’
