মা নিজের ঘরে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে পাশ ফিরে শুয়ে পড়েন। আসিয়া কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে যায়। আর, নওয়াজিশ নিজের কামরায় ফিরে গিয়ে লেপের তলায় উপুড় হয়ে শুয়ে সিগারেট ধরায়। দুই আঙুলের ফাঁকে চেপে ধরে, মুঠো বেঁধে, হুঁকো খাওয়ার কায়দায় জোরে জোরে টান দেয় সিগারেটে। বৃদ্ধা আর অনামিকায় চুটকি বাজিয়ে ঘন-ঘন ছাই ফেলতে থাকে, আর বায়স্কোপের গানের একটা কলি, গাইতে থাকে গুনগুন করে, ‘আব্ কওন্ তুঝে সঝায়ে…।’
সাদা বাংলোর প্রত্যেকে চিন্তিত। এমনকি, সাদা বাংলোর বাইরের লোক ডাক্তারও গভীর চিন্তামগ্ন– যদিও তাঁর কথা থেকে সেটা বুঝবার উপায় নেই। ডাক্তারের মুখে ওই এক কথা, ‘শি ইজ্ অল্রাইট। সামান্য একটু শক্ পেয়েছে, ঠিক হয়ে যাবে।’ তিনি প্রত্যেকদিন আসেন। রুগীর নাড়ি টেপেন। জিবের রং দেখেন। টেথিস্কোপ লাগান। দু-একটা প্রশ্ন করেন। তারপর ইঞ্জেকশন লাগিয়ে দিয়ে, নার্সকে উপদেশ দিয়ে, হাত-বাক্সটা তুলে নিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসেন।
বাইরে সবাই দাঁড়িয়ে, অপেক্ষায়। মা সঙ্গে সঙ্গে প্রশ্ন করেন, ‘আজকে কেমন দেখলেন, ডাক্তার সাহেব?’
‘হুঁ।’ ডাক্তার যেন নতুন করে কেইসটা পরীক্ষা করছেন, এইরকম একটা ভঙ্গি। তারপর, মাথা তুলে বলেন, ‘ভালো হয়ে যাবে, ভালো হয়ে যাবে। আপনারা ঘাবড়াবেন না। এখনো শকের ইফেক্ট্ কাটেনি। কাল আবার আসব। খোদা হাফেজ।’
.
এই ঘটনার পাত্র-পাত্রী মাত্র তিনজন। সারা মুখ পাউডার দিয়ে ঢেকে রাখা একটি মেয়ে-পুতুল, নিষ্প্রাণ একটা ছেলে-পুতুল আর সজীব প্রাণবন্ত একটা ড্রাইভার।
পুতুল শুধু পাউডার ঘষে, তাই নয়– কথাও বলে। মল্ রোডের কেনা-কাটায় অহরহ যেমন অনেক পুতুল দেখতে পাওয়া যায়, সে-ও তাদেরই মতো একজন। ঠোঁটে মাখানো থাকে পুরু করে কৃত্রিম লালিমা– যেন অসংখ্য পুতুলের মধ্যে থেকে সে কারো দৃষ্টি এড়িয়ে যায় না। গাড়ি থেকে নীরবে নেমে ভারিক্কি চালে এদিক-ওদিক দেখে নেয়। যারা তার ওপর চোখ ফেলে চোখ সরায় না, তাদের দিকে তাকিয়ে সে নাক-সিটকায় ঘৃণায়। সময় নষ্ট না করে অচিরে মগ্ন হয়ে যায় কেনা-কাটায়। কখনো ভেবে দেখে না, কেন সে এত আকর্ষণ করে লোকজনকে। কেনই-বা ভাববে! স্বামী বিত্তবান। নিজস্ব প্রাসাদতুল্য বাংলো। মূল্যবান আসবাবপত্র দিয়ে সে বাংলো সাজানো। গাড়ি। টেবিলে আপনা-আপনি খাবার লেগে যায়। পার্সে টাকা সবসময় গিজগিজ্ করে। মরা-মরা, ময়লা, নোংরা লোকগুলো কেন যে তার দিকে অমন করে তাকিয়ে থাকে। পাউডার মাখে সে চামড়া নরম রাখার জন্য। চোখে কাজল দেয় চোখের জ্যোতি বাড়ে বলে। ঠোঁটে লালিমা মাখায়– তা সে যে জন্যই হোক, তাতে কার কী! সব কাজেরই যে ব্যাখ্যা দিতে হবে, তেমন কোনো শর্তে সে আবদ্ধ নয় কারো সঙ্গে। তার ইচ্ছা, সে মাখবে।
মল্ রোডের পুতুল শুধু সামাজিকভাবে নয়– মানসিকভাবেও একটা পুতুলই। পুতুল-ঘরের শিক্ষা তার মানসিকতাকে আবদ্ধ করে রেখে দিয়েছে। তার দেহের রূপ আর মনের শিক্ষা শান্ত একটা বিলের মতো– তাতে ঢেউ ওঠে, কিন্তু তরঙ্গ কখনো বিক্ষুব্ধ হয় না।
শো-কেসে সাজিয়ে রাখা পুতুলের মতোই পরিবারের সবাই ওরা উঠেছে, বসেছে, চলা-ফেরা করেছে। ঠিক সময়টিতে যুৎসই কথা বলা, ঠিক সময়ে বাইরে যাওয়া, ঠিক সময়েই পুতুলের মতো শো-কেসে বন্ধ হয়ে ঘুমিয়ে পড়া। কখন কোন কথাটুকু বলতে হবে, তা যেন মুখস্থ করা। ঠিক সময়ে, ঠিকমতো সেই মুখস্থ-করা কথা ছেড়ে দিলেই পুতুলের শিক্ষা সম্পূর্ণ হল।
যে পুতুল-ঘরে ফওজিয়া বড় হয়েছে, তার বাইরে দশ পা হেঁটে গেলে জীবন্ত রক্ত-মাংসের মানুষরাও ছিল। কিন্তু পুতুল-ঘরের শিক্ষা তাদের দিকে চোখ তুলে তাকানোর অনুমতি দেয়নি। তারা সব নফর-মানুষ, চৌকিদার-মানুষ, খেটে-খাওয়া মানুষ। তাদের জীবন মনোযোগ দিয়ে দেখবার মতো নয়। ‘মনোযোগ দিয়ে দেখা’ কথাটাই পুতুল-ঘরের শাস্ত্রে নেই। শুধু নফর মানুষ কেন– অন্য কাউকেও, এমনকি নিজের আত্মীয়-স্বজনদেরও মনোযোগ দিয়ে দেখা অভদ্রতা। শাস্ত্রের বাইরে কিছু বললেই সেটা হবে কারো ব্যক্তিগত ব্যাপারে হস্তক্ষেপ। কাজেই অন্যকে দেখার চাইতে নিজেকে দেখানোর গুরুত্ব পুতুল-ঘরে বেশি। তাই সবসময় চেষ্টা, যেন নিজেকে সুন্দর দেখায়, অন্যের কাছে নিজেকে যেন সুপ্রিয় করে তোলা যায়।
ফওজিয়া জন্ম থেকে এইসব শিক্ষাই পেয়ে এসেছে। সকাল-সকাল টবের মধ্যে গরম পানিতে স্নান করিয়ে চুলে রিবন লাগিয়ে, মুখে পাউডার ঘষে ফিটফাট ফ্রক পরিয়ে তৈরি করে দেওয়া হত। নিজেরই মতো ফুটফুটে একটা পুতুল নিয়ে সে প্যারালেটারে গিয়ে বসত। সেই বাহন ঠেলতে ঠেলতে অন্য একজনে নিয়ে যেত বাগানে। সেখানে গিয়ে বসত বিশেষভাবে তৈরি করা, কুশন-আঁটা একটা বেতের চেয়ারে। মাটিতে কখনো পা ঠেকত না।
ড্রয়িং-রুমে বলার জন্য একরকম ভাষা তাকে শেখানো হয়েছিল। ‘থ্যাঙ্ক ইউ’, ‘হাউ ডু ইউ ডু’, ‘মামি, ড্যাডি’, কিংবা ইংরেজি কোনো কবিতা। ফুরফুরে বাতাসের মতো নরম করে হাঁটা। সারাদিন ভুরভুরে গন্ধ ছড়িয়ে এ-ঘর থেকে ও-ঘরে যাওয়া। তারপর, রাত হলে মোলায়েম রেশমের শো-কেসে আট্কা পড়া। এই ছিল জীবন পুতুল-ঘরের।
তারপর, যৌবনের পদার্পণেও সে-জীবনে বিশেষ পরিবর্তন আসেনি। পরিবর্তন এসেছে শুধু দেহের ভাঁজে ভাঁজে। শরীর ফুলেছে, ফেঁপেছে। চুল বাঁধার স্টাইল গেছে বদলে। ছক-কাটা ভাষায় কথা বলার সীমানা কিছু প্রসারিত হয়েছে। প্রশস্ত হয়েছে ড্রয়িংরুম। যাতায়াতের পুতুলের সংখ্যাও বেড়েছে। মেয়েদের কাছে আসে পুরুষ-পুতুল, পুরুষদের কাছে যায় মেয়ে-পুতুল। তাদের হাসিতে ছুরিকার ধার।
