বেয়ারার দেখাদেখি অন্য সবাইও কাঁটা-চামচ ধরল। কিন্তু তাদের কেউ কেউ এমনভাবে ধরল যে, ছুরি নিয়ে যেন শত্রুকে আক্রমণ করতে যাচ্ছে। কাঁটার ঘায়ে কারও কারও জিবে লাগল খোঁচা। কেউ কেউ মাংসের টুকরো হাত দিয়ে ছিঁড়ে, চামচে রেখে বা কাঁটায় বিঁধিয়ে মুখে ঢোকাল। বলাকার ঝাঁক হয় গ্লাসেই রয়ে গেল, না হয় ছড়িয়ে পড়ল টেবিলের উপর। সারা ডাইনিং-হল জুড়ে বিরাজ করতে লাগল কাঁটা-চামচ-প্লেটের ছন্দহীন ধ্বনি। তার সঙ্গে যোগ হয়েছে চপ্চপ্, সুড়ুৎ-সাড়ুৎ ইত্যাদি শব্দ। সবাই গিলছে গোগ্রাসে, ব্যস্তসমস্ত হয়ে। কথা বলার কারো ফুরসত নেই। কিছুক্ষণের মধ্যেই অনেকে বুঝল, কাঁটা-চামচের ঝকমারি ডিনারের সমস্ত স্বাদ নষ্ট করে ফেলছে। তখন তারা অস্ত্রশস্ত্র ত্যাগ করে হাতের সদ্ব্যবহারে মনোযোগী হল। একমাত্র বেয়ারাই শেষ পর্যন্ত কৌলীন্য বজায় রাখল। এই কারণে তাকে বেশ খানিক অতৃপ্ত, অর্ধভুক্ত থাকতে হল।
একটা টানতে গিয়ে অন্যটায় ধাক্কা লেগে যাওয়ায় কিছু প্লাস, প্লেট নিচে পড়ে ভাঙল। অনেক দূরের জিনিস হাত বাড়িয়ে নিতে গিয়ে জমাদারের কম্বলের কোনা ঝোলের স্বাদ টের পেল।
এইভাবে খাওয়া শেষ হলে ঢেকুর তোলার শব্দ উঠতে লাগল। স্পেনীয় সংগীতের সঙ্গে মিশে সেই শব্দ নতুন এক সুরের ব্যঞ্জনা সৃষ্টি করতে লাগল। গ্লাসের পানি খেতে গিয়ে ন্যাকিনগুলো টেবিলের তলায় চলে গেছে। কাজেই অনেকে টেবিলের চাদরেই হাত মুছে নিল। কেউ গেল বাথরুমে হাত ধুতে। বাদবাকি সবাই কোটের পকেটে হাত ঢুকিয়ে সে কাজ সম্পন্ন করে নিল।
শেষে বয় চা পরিবেশন করল। সবাই ঠোঁটের কোণায় ফাইভ ফিফটি ফাইভ সিগারেট ঝোলাল। কেবল খানসামা তার পোশাকের গাম্ভীর্যের দিকে লক্ষ রেখে একটা চুরুট ধরাল।
এমন সময় বেয়ারা দাঁড়িয়ে ঘোষণা করল, ‘এবার খানসামা সায়েব আমাদের ডিনার-পার্টির ওপর একটা বক্তিমে দেবেন।’
খানসামা চুরুটটা হাতে নিয়ে ঠিক বক্তার মতো পোজ্ করে দাঁড়াল। তারপর একটুও চিন্তা-ভাবনা না করে বলতে শুরু করে দিল, ‘ভাইসব, আমরা বহুত দিন পর আজকে গোলাম থেকে সায়েব হয়েছি। নিজেরাই যা-খুশি রান্না করেছি– নিজেদের হাতে যেমন-করে-খুশি খেয়েছি। আহা, ইংরেজ সায়েবদের কথা আজকে আমার মনে পড়ছে। তেনারা ছিল খাঁটি সায়েব। আজকে যেমন আপনারা সায়েব হয়ে খেয়েছ, ওই সময় আমরা প্রত্যেকদিন সায়েবি খানা খেয়েছি, ভাইসব। এক মাস, দু-মাস মাত্র পরে কোট- পালুন সায়েবরা অমনি দিয়ে দিয়েছেন। মেম-সায়েবরা মুড়ি-ভাজার মতো দুহাতে পয়সা বিলিয়েছে। ফাস্টো ক্লাস বিয়ারের বোতল আমরা সাবাড় করেছি। আয়াদের সঙ্গে কত ঠাট্টা-দিল্লাগি করেছি। তারপর পাকিস্তান হলেন, আমাদের দেশ স্বাধীন হলেন। কিন্তু আমরা গোলাম হয়ে গেলাম, ভাইসব। ইংরেজ সায়েবরা কুত্তারও কত খাতির করতেন। দিশি সায়েবরা মানুষকে কুত্তার অধম ভাবলেন। একটা টেডি পয়সা এদিক-ওদিক হলে ধমক খেতে হচ্ছেন। আপনারা এখন সারা জিন্দেগিতে একদিন ছুটি পাও না। আমাদের সায়েব কিন্তু খারাব লোক নয়। ইংরেজ সায়েবদের মতো আমার সায়েব কুকুর রাখে না, ঘোড়া রাখে না, মেম রাখে না, আর…’
খানসামার বক্তৃতা তখনো চলছে, কিন্তু বেয়ারা তাতে মজা পাচ্ছে না। এসব কথা সে প্রত্যেকদিনই শোনে। এখন তার খেয়াল অন্য দিকে। দুই-দুবার ফোটোগ্রাফারকে টেলিফোন করা হল এখনো সে আসছে না কেন, এই চিন্তায় সে মনে মনে ভারি ব্যস্ত। খানসামার ভাষণ শেষ হয়ে আসছে মনে করে বেয়ারা ইঙ্গিতে তাকে জানিয়ে দিল শেষ না করতে।
ঠিক এমনি সময়ে বাইরে গাড়ির শব্দ শোনা গেল। বেয়ারা বয়কে ইঙ্গিতে বলে দিল ফোটোগ্রাফারকে তাড়াতাড়ি ভেতরে নিয়ে আসতে। বয় চলে গেল।
খানসামা বেয়ারার ইঙ্গিত বুঝতে পেরে বক্তৃতার উপসংহারটাকে আর একটু লম্বা করল, ‘ভাইসব আমাদের সায়েবের জন্য আমরা দোয়া করি– আল্লা যেন তেনাকে আরও একশো বছর বাঁচিয়ে রাখে। আমাদের সায়েব যে কত ভালো লোক, তা আপনারা আজকের এই খানা-পিনা থেকেই বুঝতে পারছ।…‘
এমন সময় ডাইনিং-হলের দরজার পর্দা নড়ল। খানসামা ফোটোগ্রাফারের জন্য বক্তৃতার পোজটাকে আর একটু আকর্ষণীয় করে নিল। উপস্থিত শ্রোতৃমণ্ডলীও যে-যার দৈহিক ও চেহারাগত আকর্ষণ বাড়ানোর জন্য তৎপর হয়ে উঠল। কিন্তু যার যেমন পোজ, তেমনিই থেকে গেল। খানাসামার বক্তৃতার শেষ শব্দটি অর্ধোচ্চারিত রয়ে গেল। মুখ হাঁ হয়েই থাকল, সে হাঁ আর বন্ধ হল না। সবাই যেন পাথরের মূর্তি– কেউ নড়ল না, কেউ নিশ্বাসটুকুও ফেলল না, যেন সবাই জমে গেছে। যে দাঁড়িয়েছিল, সে দাঁড়িয়ে থাকল। যে বসেছিল, সে বসে থাকল। যে চুলকাতে যাচ্ছিল, তার হাত থেমে গেল অর্ধপথে। সবাই স্থবির। কেবল বয় এর ব্যতিক্রম। সে নড়ছিল, থরথর করে কাঁপছিল নদিমের পেছনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে।
নদিম ভালো করে একবার অবস্থাটা দেখে নিল। হলের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত নজর বুলাল। তারপর বলল, আজ থেকে তোমাদের সবারই চাকরি নট্। বলে সে দ্রুত পায়ে শোয়ার ঘরে চলে গেল।
অনুবাদ : নেয়ামাল বাসির
পুতুল – মমতাজ মুফতি
সাদা বাংলোর অধিবাসীদের সবাইকে যেন ভূতে ধরেছে। অথচ, এ বাড়ির আসবাবপত্রে কোনো পরিবর্তন আসেনি। রেশমের পর্দা আগের মতোই ঝুলছে। গালিচার উজ্জ্বল রং এখনো আগের মতো আলো ঠিকরায়।
