সন্ধ্যায় মেহমানদের আগমন শুরু হওয়ার আগেই খাবার টেবিলে ধপধপে সাদা কাপড় বিছিয়ে তার উপর ডিনার সেট, চকচকে ছুরি-কাঁটা, সুন্দর করে সাজানো ফুলদানি সাজিয়ে রাখা হল। গ্লাসে গ্লাসে সাদা ন্যাপকিনের সারি লেগে গেল, যা দেখতে মনে হল সারিবদ্ধ বলাকার মতো।
টেবিলের পরিচর্যা শেষ হলে পর সবার আগে বেয়ারা কেতা-দুরস্ত পোশাকে সেজে নিল। সমস্ত মেহমানের জন্যও যার যার পদমর্যাদার দিকে খেয়াল রেখে ওয়ার্ড-রোব থেকে বের করে করে এগিয়ে দেওয়া হল স্যুট, জ্যাকেট, শেরওয়ানি, চুড়িদার ইত্যাদি। বেয়ারা নিজে পরল ডিনার স্যুট– সাদা শার্টের উপর ডিনার-জ্যাকেট, গলায় কালো বো, বুক-পকেটে বের করে রাখা সাদা রুমাল, পায়ে আলো-ঠিকরানো কালো জুতো আর বাটন-হোলে সুইট-পি ফুল গুঁজে যখন সে আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াল, তখন নিজের কাছেই সে একটা লাটসাহেব বলে বোধ হতে লাগল। আর, তাই দেখে খানসামা মন্তব্য করল, ‘যা না, একবার মালিবাবার কাছে গিয়ে দাঁড়া। তোকে যদি সায়েব মনে করে একটা সালাম না ঠোকে, তো আমায় বলিস।’
সবার যখন মোটামুটি সাজাগোজা শেষ হয়েছে, তখন ড্রেসিং-রুমের জৌলুস দেখে খানসামা একেবারে আত্মহারা। কিন্তু সেই আত্মহারা অবস্থাতেও তার মাথায় একটা বুদ্ধি গজাল। ভাবল, এমন জৌলুস, ছবি তুলে ধরে না রাখলেই নয়। পার্টির শেষ হওয়ার পর সেই ছবি সবাইকে দেখিয়ে বেড়ানো যাবে। চিরকাল সে ছবি হয়ে থাকবে সারাজীবনের একটা মনোরম স্মৃতি। কাজেই খানসামা টেলিফোন করে ফোটোগ্রাফারকে আসার জন্য ডাকতে চলে গেল।
নিজের দৈনন্দিন কাজ শেষ করে মালিবাবাও এসে গেল তৈরি হতে। হাত-পায়ের কাদা ছাড়ানোর জন্য সে গোটা একটা খোশবুদার সাবান ঘষে ঘষে শেষ করল। তারপর গরম আর ঠাণ্ডা পানি মেশানো বাথটাবে শুয়ে থাকল কিছুক্ষণ। মালিবাবার দেরি হচ্ছে দেখে বেয়ারা যখন হাঁক ছাড়ল, তখন মানুষ-সমান লম্বা তোয়ালেতে সারা শরীর ঢেকে সে বাইরে বেরিয়ে এল। চুড়িদার পাজামা আর শেরওয়ানি পরল। মাথার উপর বাঁকা করে জিন্না-টুপি চাপাল। পায়ে দিল সলিম-শাহি পাদুকা। তারপর, আয়নার সামনে যখন দাঁড়াল, তখন তাকে মনে হতে লাগল স্বপ্নপুরীর রাজপুত্র বলে। তাই-না দেখে বেরিয়ে পড়ল তার বত্রিশ-পাটি দাঁত, আর সে দাঁত সারাসন্ধ্যা বেরিয়েই থাকল– কিছুতেই ভেতরে করা গেল না। বারবার শেরওয়ানিতে হাত বুলিয়ে বুলিয়ে তার মসৃণতা অনুভব করতে লাগল। মনে মনে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করল সেই আল্লার দরবারে, যিনি তাকে একদিনের সুলতান করেছেন।
ড্রাইভার মাথায় একটা সাদা পাগড়ি জড়িয়ে নবাব সাজল।
বেয়ারা মাথায় দিয়েছে তার সাহেবের ফেল্ট হ্যাটটা।
বয় বেচারা সবচাইতে বেঁটে। কোনো কাপড়ই তার গায়ে ফিট্ করে না। যেটাই পরে, সেটাতেই হারিয়ে যায় সে। তখন সবার পরামর্শে তাকে পরানো হল একটা সিল্কের পাঞ্জাবি আর একটা সাদা লুঙ্গি। পাঞ্জাবির আস্তিন খানিকটা গুটিয়ে দেওয়া হল আর লুঙ্গি মাজায় খানিক জড়িয়ে দেওয়া হল তবে গিয়ে সে কিছুটা মানুষ-মানুষ বোধ হতে লাগল।
মুকিল হল জমাদারকে নিয়ে। স্যুট-কোট-হ্যাট তার পছন্দ নয়। শেরওয়ানিও সে পরবে না। তার চোখ সাহেবের স্লিপিং গাউনের দিকে। তার এই ইচ্ছায় বাধা দেওয়া কারো যুক্তিসঙ্গত মনে হল না। কিন্তু মালিবাবার পরামর্শে সেই গাউনের উপর সে আবার যোগ করল একটা নতুন ফ্যাশন। দেড়শো টাকা দামের নতুন শৌখিন কম্বলটা সে জড়িয়ে নিল গাউনের উপর
ডিনার-পার্টিতে বাইরের মেহমানরা তো মেহমানই; কিন্তু ভেতরের যারা, তারাও মেহমান বলে কেউ কাউকে খাবার পরিবেশন করবে না। সুতরাং, খাদ্য-সামগ্রী আগে থেকে টেবিলে সাজিয়ে রাখা হল।
পেছনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে তারা সবাই বাইরে এল। ভেতরে থাকল কেবল বেয়ারা। তারপর, সামনের দরজায় একে একে বেলটিপে এমনভাবে তারা ভেতরে ঢুকল, যেমন ঢোকে যথার্থ মেহমানরা। বেয়ারা এগিয়ে এসে, করমর্দন করে তাদের এগিয়ে নিয়ে যেতে লাগল। পকেট থেকে ফাইভ ফিফটি ফাইভের টিন বের করে মেলে ধরল সামনে। কুশল-বিনিময় চলতে লাগল পরিমিত ভাষায়। ব্যাগ্রাউন্ডে রেকর্ড-প্লেয়ার থেকে বাজতে লাগল স্পেনীয় সংগীত।
ডিনার শুরু হয়ে গেল। বেয়ারা বিরাট একটা গামলায় করে গরম গরম সুপ এনে রাখল। যার যার পাত্রে ঢেলে নিয়ে কেউ ঢুঁ মেরে আর কেউ নুলো ডুবিয়ে খেয়ে ফেলল সেই সুপ।
জমাদারকে দেওয়া হল প্রথম খানা তুলবার সম্মান। তারপর, প্রত্যেকে যার যার পাতে খানা তুলে নিল। প্রথম গ্রাস খানা মুখে তুলবার সম্মানও আবার দেওয়া হল জমাদারকেই তখন জমাদার কাঁটা-চামচ টেবিলের মাঝখানে সরিয়ে রাখল। রেখে হাত দিয়েই অতি দ্রুত গোগ্রাসে গিলতে আরম্ভ করে দিল। বেয়ারা মনে করল এটাকে হাভাতেপনা বলে।
ডিনার-পার্টির মর্যাদা ক্ষুণ্ন করা উচিত নয় ভেবে অতি অল্প পরিমাণে প্লেটে খানা নিল সে। কোলের উপর ন্যাপকিন বিছিয়ে নিল, ঠিক যেমন ভদ্রলোকদের নেওয়া উচিত, তেমনি করে। তারপর ফিশ-ফ্রাই-এ ছুরি-কাঁটা চালাতে লাগল আস্তে করে। নির্ভুল কায়দায় সে ছুরি-কাঁটা ধরেছে। কিন্তু অনভ্যস্ততা হেতু মাঝে মাঝে পিছলে যাচ্ছে, আর পিছলে যাওয়ার জন্য মাছের টুকরো পড়ে যাচ্ছে নিচে।
