সামনে দূরে দাঁড়িয়ে বয় এতক্ষণ চুপ-চাপ শুনছিল। এবারে সে-ও তার অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিতে লাগল, ‘আর বল কেন! আমিও এক বেগম সায়েবের পাল্লায় পড়েছিলাম বটে। বেগম সায়েবের ছিল ইঁদুরের মতো ছোট মন। কোনোদিন যদি একটা টেডি পয়সা হাতে ধরে দিয়ে থাকে।
অনেকক্ষণ পরে ড্রাইভার আবার মুখ খুলল, ‘সায়েব বিয়ে করলে আমাকেও নতুন চাকরি খুঁজতে হবে। পার্ট-টাইম চাকরিটা তো আর থাকবে না।’
খানসামা মুরুব্বির চালে জবাব দিল, ‘মুফতের ড্রাইভারি করছ। সবসময় তো সায়েবই গাড়ি চালায়। আর, তুমি করে বেড়াও পার্ট-টাইম। বেগম সায়েব এলে তো আর সেটি চলবে না। এদিকে মিছামিছি পেট্রলের বিল, রিপিয়ার আর এই-সেই করে আরও খানিক কামিয়ে নিচ্ছ।’
‘কী করব বল। গরিব মানুষ, আর আটটা খানেওয়ালা। কিন্তু খানসামা ভাই, তুমিই-বা আর কম যাও কার চাইতে। গোটা ঘিয়ের টিন দু-দিনেই খতম। আর আস্ত আস্ত আটার বস্তা…।’
‘এখন থামাও এসব কথা। আমরা সবাই আল্লার দেওয়া রুজি কামাই করি আর খাই। অন্যের রুজি কি আর একজনে খেতে পারে!’ এই কথা বলে খানসামা এখন সোফার উপরে হাত-পা ছড়িয়ে সটান হয়ে শুয়ে পড়ল। তারপর, হাঁক ছাড়ল, ‘বয়, তাড়াতাড়ি চা বানিয়ে আন্। আর, শোন, সেই সঙ্গে কিছু ঘিয়ে-ভাজা পুরি। বুঝলি? তাড়াতাড়ি।’ রীতিমতো সাহেবের অনুকরণ শুরু করে দিল খানসামা।
জমাদার এতক্ষণ মেঝের উপর বসে বসে এইসব শুনছিল। ঝাড়ুটাকে বালিশ বানিয়ে সে-ও লম্বা হয়ে শুয়ে পড়ল ফরাশের উপর।
বেয়ারা কোলের উপর একটা কুশন টেনে নিয়ে বলল, ‘আমার মাথায় একটা ভারি মজার খেয়াল এসেছে।
‘কী, কী! বল, বল!’ সবাই একসঙ্গে আগ্রহ প্রকাশ করল।
‘আমরা সবাই মিলে একটা পার্টি দিই, এস।’
‘পার্টি! ভোজের পার্টি নাকি?’ খানসামা বিস্ময় প্রকাশ করল, ‘তোমার তো সাহস কম নয় হে! তাহলে কেমন পার্টি, বল দেখি, বাপু, শুনি।’
‘হ্যাঁ দোস্ত, ভালোই খেলেছে তোমার মাথাখানা। হয়েই যাক একটা পার্টি।’ ড্রাইভার প্রথম সায় জানাল।
‘কিন্তু সায়েব না থাকলে তো আমাদের রোজই পার্টি চলে, ফুর্তি চলে। তাহলে আর নতুন ব্যাপারটা কী হতে যাচ্ছে?’
বেয়ারা বলল, ‘সেরকম নয়, খানসামা সায়েব। এ হবে স্পেশাল ডিনার-পার্টি। আমরা স্যুট পরব। অনেক মেহমান আসবে। টেবিল জুড়ে থাকবে কোর্মা, পোলাও, জর্দা। রেডিও বাজবে। বক্তিমে হবে।’ কিছুক্ষণ থেমে আবার সে বলল, ‘কিন্তু আমি ভাবছি, পার্টিটা মিক্স হবে, না সিঙ্গেল!’
‘সেটা আবার কী জিনিস?’
‘বুঝলে না? মানে, পার্টিতে শুধু সায়েবরাই থাকবেন না, বেগম সায়েবদেরও আনা হবে?’ ড্রাইভার বলল, ‘না ভাই, বেগম সায়েবদের সঙ্গে করে আনলে আবার নানা ঝামেলা বাধবে। পর্দা কর, এই কর, সেই কর। তার চাইতে আমরা, মানে শুধু সায়েবরাই ঠিক আছি।’
‘তাহলে তো দেখছি, সব ঝক্কি আমাকেই সামলাতে হবে।’ খানসামা আসল কথাটা পেড়ে বসল, ‘তা ঠিক আছে, তোমরা যখন বলছ, তখন করতে হবে বৈকি!’
‘কিন্তু খানসামা সায়েব, মনে থাকে যেন, গণ্যমান্য সব অতিথিরা আসবেন। ভালো খানা হওয়া চাই কিন্তু।’
‘সে আর তোমাকে বলতে হবে না। এমন খানাটাই খাওয়াব যে, জিন্দিগি-ভর মনে থাকবে।’
‘তাহলে একটা দিন-ক্ষণ ঠিক হয়ে যাক।’
‘কাল।’
‘বেশ, কাল রাত্রেই তাহলে হোক। ডিনারের দাওয়াত সব জায়গায় পৌঁছে দাও।’
‘আর শোনো, মেহমানরা সব হুড়দ্দুম যেন ডাইনিং-হলে ঢুকে না পড়ে। সবাই আগে ড্রেসিং-রুমে আসবে, ফিটফাট কাপড় পরবে। তারপর আবার বাইরে যাবে। বাইরে গিয়ে ওই সামনের দিক থেকে এসে ড্রয়িংরুমে ঢুকবে। ড্রয়িংরুম থেকে তারপর ডাইনিং-হল।’
‘আর হ্যাঁ, মালিবাবাকে ডাকো। ওকে বলে দাও, যেন চমৎকার করে কয়েকটা ফুলের তোড়া বানিয়ে রাখে।
এমন সময় বয় ট্রেতে করে চা নিয়ে এল। আর, গরম গরম পুরি ভাজা। বেয়ারা কোথাও থেকে ফাইভ ফিফটি ফাইভ সিগারেটের টিন নিয়ে এল বের করে। সবাইকে দিল একটা করে। বয় চা পরিবেশন করল। চায়ের পেয়ালায় আরও অনেকক্ষণ ধরে রাজনৈতিক এবং অন্যবিধ আলাপ-আলোচনা চলল। তারপর, সবাই একে একে যে-যার ঘরের দিকে চলে গেল। সাহেবই যখন নেই, তখন কাজেরও কোনো প্রশ্ন ওঠে না। বেয়ারা বয়কে দিয়ে চায়ের পেয়ালা ইত্যাদি সরাল। তারপর, ঘরে তালা লাগিয়ে বেড়াতে বেরিয়ে পড়ল বাইরে।
.
পরদিন সকাল থেকেই ডিনার-পার্টির আয়োজন শুরু হয়ে গেল। আগেই ঠিক হয়েছিল যে, প্রত্যেকে একজন করে ঘনিষ্ঠ, নির্ভরযোগ্য, বিশ্বাসযোগ্য আত্মীয় বা বন্ধুকে দাওয়াত দিতে পারবে। সে এমন হবে, যেন পার্টির কথা একটা তার মুখ থেকে বাইরে না বেরোয়।
খানসামা মহাব্যস্ত। তার চাইতে ব্যস্ত করে রেখেছে সে বয়কে। তাকে সে বাঁদর-নাচ নাচাচ্ছে। বয় আবার খুব করে খাঁটিয়ে নিচ্ছে জমাদারকে। এরাই এখন এ বাড়ির সর্বেসর্বা।
ধোপাকে ডেকে এনে সব কাপড়ে ইস্তিরি করিয়ে নেওয়া হল। তারপর, ধোপাকেও দাওয়াত দেওয়া হল ডিনার খাওয়ার।
মালিবাবা সকাল থেকে ফুলের তোড়া তৈরি করছে নিবিষ্ট মনে
জমাদার সমস্ত ঘর-দোর ঝেড়ে-ঝুড়ে পরিষ্কার, ফিটফাট করে তুলল।
বয় একা পেরে উঠছে না বলে খানসামা আরও একজন অ্যাসিস্টেন্ট নিয়ে এল বাইরে থেকে। বয় আর নতুন অ্যাসিস্টেন্ট মেশিনের মতো কাজ করে যাচ্ছে। একের পর এক মুরগি জবাই করে ওরা দুজন দ্রুত হাত চালিয়ে সেই মুরগি ছাড়িয়ে চলেছে। নতুন অ্যাসিস্টেন্টকেও ডিনার পার্টির দাওয়াত দেওয়া হল।
