তারপর, হঠাৎ সে প্রশ্ন করে বসল, ‘আমার সম্বন্ধে তোমাদের কিরকম ধারণা হল?’
বললাম, ‘আপনার সম্বন্ধে আমাদের খারাপ ধারণা হওয়ার কোনো হেতু নেই। আপনি চমৎকার লোক।
‘ভুল। সম্পূর্ণ মিথ্যা। আমি মিথ্যেবাদী। আমি কখনো সত্য কথা বলি না। আমি কাপুরুষ। আমি যুদ্ধকে ভয় করি। আমি যুদ্ধকে ভয় করি বলেই পালিয়ে যেতে চাই। গ্রামে ফিরে যেতে চাই।’
ডার্লিং ঘন-ঘন চুমুক দিয়ে বোতলটা শেষ করল। তারপর, আমাদের প্রতি সম্পূর্ণ অমনোযোগী হয়ে এদিক-ওদিক তাকাতে লাগল। একটি মেয়েকে কাছে ডেকে তার সঙ্গে নাচতে চাইল। তারপর নাচতে চলে গেল ডার্লিং।
যখন ফিরল, হোটেলের প্রৌঢ় মালিক তার সঙ্গে ছিলেন। তিনি অন্য টেবিল থেকে একটা চেয়ার টেনে নিয়ে আমাদের সঙ্গে বসলেন। ডার্লিং আরও একটা বোতল আনাল। মালিক বললেন, ‘ডার্লিং-এর সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছে। আমার জ্যাককে ও চেনে। ওরা দুজন একই ইউনিটে একসঙ্গে যুদ্ধ করেছে। জ্যাক আমার একমাত্র সন্তান।’ তারপর ডার্লিংকে প্রশ্ন করলেন, ‘আমার ছেলে এখন কোথায়, কিছুই কি বলতে পার না?’
‘কয়েক মাস থেকে আমি ইউনিটের বাইরে।’
‘জ্যাক আমার একমাত্র ছেলে। কলেজে পড়তে পড়তেই যুদ্ধে চলে গেল। একেবারে ছেলেমানুষ। বাচ্চা। আপনভোলা! জ্যাকের মা আর আমি ওরই জন্যে এখনো বেঁচে রয়েছি। এখন আমার বিশ্রাম নেয়ার সময়। কিন্তু জ্যাকের জন্যেই এখনো খেটে চলেছি। আমি এখানে, আর ওর মা দেশে। দু-বছর আগে একবার সে সামরিক পোশাকে ফিরেছিল ছুটি পেয়ে। আমরা চিনতেই পারিনি। একেবারে জোয়ান হয়ে উঠেছে। কতটুকু ছিল আর এই এক বছরে কত বড়টা হয়েছে। কতরকম সান্ত্বনা-বাক্য দিয়ে সে তার মায়ের কান্না থামাল। বলল, মা, তুমি মোটেও চিন্তা কর না। তোমার দেওয়া বাইবেল আমার বুক-পকেটে সবসময় থাকে। অমন ভালো ছেলে আর হয় না। মা মেরি নিশ্চয় তাকে রক্ষা করবেন।…শেষ কবে তার সঙ্গে তোমার দেখা হয়েছিল, ডার্লিং?’
‘অনেক দিন আগে। দু-তিন মাস থেকে আমি ইউনিটের বাইরে।’
‘ছোট থেকেই জ্যাক ভারি বুদ্ধিমান, মেধাবী। আজ পর্যন্ত কখনো সে একগুঁয়েমি দেখায়নি, আমাদের সামনে কখনো কড়া কথা বলেনি। আমার কত কাজ সে করে দিয়েছে। সকালে উঠে তার হাসি-মাখা মুখখানি দেখলেই আমি সব দুঃখ ভুলে যেতাম। মনে হত, যেন আমি নতুন সূর্যের আলো দেখলাম। কতবার যে কত দুর্ঘটনা থেকে সে অল্পের জন্যে বেঁচে গেছে। একবার মোটর সাইকেল থেকে ছিটকে দূরে গিয়ে পড়ল। কিন্তু ওর কিছুই হল না। তার আগে একবার খুব ছোটবেলায় সমুদ্রের ধারে জ্যাক হারিয়ে গিয়েছিল। অনেক খোঁজাখুঁজি করেও সারারাত তাকে পাওয়া যায়নি। রাত্রে খুব ঠাণ্ডা পড়েছিল আর ঝড় উঠেছিল। পরের দিন সকালবেলায় তাকে একদম ভালো অবস্থায় পাওয়া গেল। এমনি আরও একবার কঠিন একটা মোটর অ্যাক্সিডেন্ট থেকে সে বেঁচে গিয়েছিল। …গত বছর সে তার মা-কে চিঠি লিখেছে, অমুক তারিখ আমি উড়োজাহাজ হাঁকিয়ে তোমার মাথার উপর দিয়ে উড়ে যাব। মায়ের সঙ্গে হয়তো এটা তার মশকরা। কিন্তু জ্যাকের মা বেচারি সারাদিন আকাশপানে চেয়ে থাকল। কত জাহাজ এল, গেল, কিন্তু কোনটা যে তার ছেলের জাহাজ, তা সে কিছুতেই ঠাওর করতে পারল না। জ্যাক লিখেছিল, শিগগিরই সে বাড়ি ফিরবে। তার ঘরটা যেন তৈরি রাখা হয়। বাড়ি ফিরে সে রোজ রাত্রে শোয়ার আগে মায়ের হাতের একগ্লাস করে গরম দুধ খাবে আর সকালে উঠে তুলোর তৈরি মোলায়েম স্লিপার পরবে। জ্যাকের মা প্রত্যেকদিন জ্যাকের ঘর সাজিয়ে রাখে। প্রত্যেক রাত্রে দুধ গরম করা থাকে। বিছানার কাছেই রেখে দেওয়া হয় জ্যাকের মোলায়েম স্লিপার। আমাদের পুরনো কুকুরটা মরে গেল। জ্যাকের মা কিছুতেই অন্য একটা কুকুর রাখবে না। বলবে, জ্যাক এলে নতুন কুকুর ওকে বাইরের লোক ভেবে চিৎকার জুড়ে দেবে। জ্যাকের মা বেশিক্ষণের জন্যে বাইরে পর্যন্ত যায় না, পাছে জ্যাককে এসে দরজার কাছে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়।…
ডার্লিং ঘন-ঘন ঘড়ি দেখছিল। ওর বোধহয় ছুটির মেয়াদ ফুরিয়ে এসেছে। পকেট থেকে টাকা বের করে বিলের দিকে সে তাকাল।
হোটেলের মালিক বললেন, ‘তুমি জ্যাকের বন্ধু। তুমি তাই আজ আমার অতিথি। তোমার কাছ থেকে আমি টাকা নিতে পারব না। জ্যাকের সঙ্গে দেখা হলে তাকে আমাদের নববর্ষের শুভেচ্ছা জানিও।’ তিনি চলে গেলেন।
ডার্লিং বলল, ‘দেখেছ, কেমন মিথ্যে বললাম, সারাজীবন আমাকে এমনি মিথ্যে বলে যেতে হবে।’
ডন জিগ্যেস করল, ‘কেন, কেন, কী হয়েছে?’
‘জ্যাক কিছুদিন আগে মারা গেছে। আমরা একসঙ্গেই ছিলাম। গুলি ওর হৃৎপিণ্ড ভেদ করে গেছে। ওর বুক-পকেটে রাখা বাইবেল সুদ্ধ ছ্যাঁদা হয়ে গেছে।’ আর একবার ঘড়ির দিকে তাকিয়ে ডার্লিং চলে গেল।
পুরনো বছর শেষ হয়ে নতুন বছর শুরু হওয়ার মুহূর্তটি এসে গেল। হৈচৈ পড়ে গেল সারা হল-ঘরে। উন্মাদনা-সৃষ্টিকারী নাচে-গানে-বাজনায় সারা পরিবেশ মুখরিত হয়ে উঠল। নববর্ষের শুভেচ্ছা বিনিময় করতে লাগল সবাই।
নতুন বছরের মুহূর্তগুলো একে একে কাটতে লাগল। নেশায় ঢুলু-ঢুলু চোখ, টলমল পা– দাঁড়িয়ে থাকার সাধ্য নেই অনেকের। তারা কোনোরকমে টেবিলে বসে ঝিমোচ্ছে। তাদের এক-একটি আচরণ হাস্যকর। আর, সেই হাস্যকর আচরণ দেখে সবাই ঠাট্টা- মশকরায় মেতে উঠেছে। হাততালি দিচ্ছে। পরামর্শ দিচ্ছে আরও এক বোতল মদ খাওয়ার। হঠাৎ একটা টেবিলের দিকে অনেকে অঙ্গুলি-সঙ্কেত করল। সেখানকার তামাশাটা আরও মজার। এত বেশি টেনেছে যে, সব কাণ্ডজ্ঞানই লোপ পেয়েছে লোকটার।
