শুভরাত্রি জানিয়ে আবার বললাম, ‘তোমাদের ভালোবাসা অক্ষয় হোক।’
বলল, ‘না, না। তুমি এখনি যেও না। একটু বস। তোমার কালো চুল আর কালো চোখ আমার খুব ভালো লাগছে। আমার মন চাইছে, তুমি আমাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধর। একজন ভদ্রমহিলা যদি কিছুক্ষণের জন্যে তোমার সঙ্গ চায়, তুমি তার অনুরোধ রাখবে না?’
আমরা তিনজন একত্র হয়ে আবার সেই টেবিলে গিয়ে বসলাম।
ডন সিগারেট ধরাল। একই দিয়াশলাইয়ের আগুনে দ্বিতীয় সিগারেট জ্বালিয়ে সে আগুন নিভিয়ে দিল। এটা তার চিরাচরিত অভ্যাস। তৃতীয় সিগারেটের জন্য সে আরও একটা দিয়াশলাই জ্বালল। ডনের এই স্বভাবকে নিক বলে বোকামি। ডন বলে, এক আগুনে তিনটা সিগারেট ধরানো অশুভ।
সে বলে, আগের বারের যুদ্ধের নাকি ঘটনা এটা। ফ্রন্টে রাত্রির অন্ধকারে তিন সৈনিক সিগারেট ধরাচ্ছিল। প্রথম সিগারেট ধরানোর সময় শত্রু-পক্ষ দূর থেকে আগুন দেখে হুঁশিয়ার হয়ে গেল। দ্বিতীয় সিগারেট ধরানোর সময় তারা তাক্ করল। তৃতীয় সিগারেট ধরানোর সময় তারা গুলি ছুড়ল। এক বন্ধু মারা গেল সেই গুলিতে।
ইতালীয় বালা মাইক্রোফোনে আবার গান গাইছে। গান শেষ হলে নাচ শুরু হচ্ছে। কখনো একসঙ্গে অনেক মেয়ে। কখনো একটা মেয়ে একা নাচছে।
ডন ইঙ্গিতে দেখাল, এক পাশ থাকে পর্দা একটুখানি ফাঁক করে হোটেলের বাবুর্চিখানার একটা কর্মচারী লুকিয়ে লুকিয়ে নাচ দেখছে।
আমরা দেখলাম, দূরে একটা টেবিলে এক বৃদ্ধ অনেক মদ খেয়ে এখন টেবিল পিটিয়ে পিটিয়ে বেতালা সুরে গান গাইছে।
সব টেবিলেই মদ, আনন্দ, উল্লাস। যেন পরাজয় না মানার একটা নকল চেষ্টা। যেন এই সাময়িক কোলাহল দিয়েই শাশ্বত বেদনাকে ঢেকে রাখা যাবে। দুঃখ-ভারাক্রান্ত, পর্যুদস্ত মূল্যবোধের ভারবাহী এই মানুষেরা কেন এত হাস্যাস্পদ হতে চায় নিজেদেরই কাছে। কী কঠিন যাত্রায় রওনা হয়েছে তারা। কী দুর্গম তাদের পথ। কী দুর্লক্ষ্য তাদের মঞ্জিল। কী নিষ্ঠুর তাদের ভাগ্যের লিখন।
নিক বলল, ‘ডন, তুমিই না একবার বলেছিলে, জীবন হচ্ছে একটা মহাশূন্য। এই মহাশূন্যকে কে কতখানি আনন্দ দিয়ে, গান দিয়ে, হাসি দিয়ে ভরে রাখতে পারে, তারই ওপর নির্ভর করছে তার জীবনের সার্থকতা। তুমি বলেছিলে, মৃত্যু জীবনের মতো সত্য। বীমা কোম্পানির দালাল মৃত্যু দিয়ে তার ব্যবসায়ী কথার সূচনা করে। আর, আমরা করি জীবনকে হাওয়ার সাগরে ভাসিয়ে দিয়ে। আমরা যখন বেঁচে থাকি, মৃত্যুর কথা ভাবি না। আমরা যখন মরে যাই, তখন জীবনের কথা আমাদের মনে থাকে না।’
ডন শূন্য দৃষ্টি সদর দরজার পানে মেলে ধরে বলল, ‘হ্যাঁ, বলেছিলাম। কিন্তু আমি জানি না, কেন আমি সৈনিক হয়েছি। আমি এত ভাবপ্রবণ, সৈনিক হওয়া আমার উচিত হয়নি।’
সদর দরজার পর্দা নড়ল। প্রবেশ করল একটা নিগ্রো সৈনিক। কিছুক্ষণ সে দরজার কাছেই দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে হলটাকে দেখে নিল। তারপর, এককোনায় একলা বসল। বসেই মদ আনিয়ে কয়েক চুমুকে অর্ধেক বোতল খালি করে দিল।
জিফের শূন্য চেয়ারটার ওপর ডনের দৃষ্টি গেল। বলল, নিগ্রোটাকে এখানে এনে বসালে কেমন হয়।
এ প্রস্তাবে কেউ আপত্তি করল না। নিগ্রো সৈনিক জিফের চেয়ারে বসে নিজের পরিচয় দিল, ‘আমার নাম ডার্লিং।’
ডন বলল, ‘বাহ্, চমৎকার নাম তো! মেয়েপুরুষ নির্বিশেষে সবাই তাহলে আপনাকে ‘ডার্লিং’ বলেই ডাকে?’
‘না, তা ডাকবে কেন। মেয়েরা সাধারণত ‘মিস্টার ডার্লিং’ বলে ডাকে। আর, একান্ত আপনজন হলে ‘মিস্টার’ যোগ না করে আমার নামটাকে দুবার উচ্চারণ করে দেয়, ব্যস্। তবে অনেকে ‘ডার্কি’ বলেও ডাকে। তাতে আমি অপরাধ নিই না। গায়ের রংটা তো আর আমার নিজের দেওয়া নয়।’
ডার্লিং জানাল, আজ সন্ধ্যায় তার জাহাজ এখানে ভিড়েছে। মাত্র কয়েক ঘণ্টার ছুটি পেয়েছে সে। কাল সকালে আবার ফ্রন্টে চলে যাবে।
বলতে বলতে প্রথম বোতল শেষ করে দ্বিতীয় বোতল আনিয়ে নিল। আমাদেরও খাওয়াতে চাইল। কিন্তু আমরা আপত্তি জানালে কয়েক চুমুকে অর্ধেক বোতল শেষ করে গল্প জুড়ে দিল ডার্লিং।
মাত্র কয়েক বছর হল সে বাহিনীতে ঢুকেছে। এই কয়েক বছরেই দুনিয়ার সমস্ত ছোট-বড় দেশ, বিখ্যাত শহর তার দেখা হয়ে গেছে। প্রথম প্রথম ভালোই লাগত। নতুন নতুন মহাদেশ, নতুন নতুন শহর, নতুন নতুন মানুষ। কিন্তু অল্প দিনের মধ্যেই সাধ পূর্ণ হয়ে গেল। সারা দুনিয়া ঘুরে ডার্লিং দেখতে পেল মাত্র চারটা জিনিস : সমুদ্র, পাহাড়, জঙ্গল আর মাঠ। যেখানেই যাও, ঘুরে-ফিরে সেই একই জিনিস। কোনো শহর একটা থেকে অন্যটা ভিন্ন বলে মনে হয় না। একইরকম রাস্তা, রাস্তায় একইরকম মোটরগাড়ি, গাড়িতে একইরকম মানুষ। সব শহরেই পার্কে, চৌরাস্তায় মরে-যাওয়া মানুষের মূর্তি। সব শহরে একইকরম হোটেল, হোটেলে একইরকম মেয়েলোক, সব মেয়েলোক একই ভাষায় প্রেমনিবেদন করে। একই জিনিসের পুনরাবৃত্তি দেখে দেখে ডার্লিং-এর মনে ঘেন্না ধরে গেছে। যুদ্ধ থামলেই সে দেশে চলে যাবে– একেবারে নিজের গ্রামে, যে-গ্রামকে আগে সে ঘৃণা করত, অবজ্ঞার চোখে দেখত, যে-গ্রাম থেকে একবার বেরুতে পারলে আর সে কখনো গ্রামে ফিরবে না বলে প্রতিজ্ঞা করেছিল। এখন সে নতুন করে শপথ নিয়েছে, এই গ্রামে ফিরে যাওয়ার আবার যদি কখনো সুযোগ আসে, তাহলে যতদিন বেঁচে থাকবে, কখনো সে আর গ্রাম ছাড়বে না।
