মা নববধূর মতো মাথা নামিয়ে আখ কাটতে লাগলেন। তাঁর বুকে একসঙ্গে অনেক কথা গুমরে উঠল।
‘সময় এখনো হল কোথায় প্রিয়? বিয়ের আগের এগোরো পয়সার ঋণ তো বইছিই। কিন্তু বিয়ের পরে যেমন করে তুমি আমাকে আদর-যত্ন করেছ সেজন্য তোমার পা ধুয়ে পানি খেতে হয়। আমার গায়ের চামড়া দিয়ে জুতো বানিয়ে তোমাকে পরানো উচিত। আমার। এখনই কি শোধ করবার সেই সময় এসেছে!’
কিন্তু আজরাইলের খাতায় সময় এসে পড়েছিল। মা যখন মাথা তুললেন, তখন আবদুল্লাহ সাহেব আখের টুকরো মুখে নিয়ে পাশবালিশের উপর ঢলে পড়েছেন। মা তাঁকে ডাকলেন, নাড়া দিলেন, সুড়সুড়ি দিলেন; কিন্তু আবদুল্লাহ্ সাহেব এমন ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিলেন যে, তা থেকে জাগানো কিয়ামতের আগে কারো পক্ষে সম্ভব নয়।
.
মা তাঁর অবশিষ্ট দুই ছেলে ও এক মেয়েকে বুকে জড়িয়ে ধরে সান্তনা দিলেন : ‘বাছারা, কেঁদো না–তোমাদের আব্বা যেমন শান্তিতে এই দুনিয়ায় বাস করতেন, তেমনি শান্তিতেই এই দুনিয়া ছেড়ে চলে গেছেন। কেঁদো না, কাঁদলে তার আত্মা কষ্ট পাবে।’
মুখে তো মা বললেন, তোমাদের আব্বার কথা মনে করে কেঁদো না, তাহলে তাঁর কষ্ট হবে। কিন্তু তিনি কি তার স্বামীর কথা স্মরণ করে বাকি জীবনে একটুও কাঁদেননি?
যখন তিনি নিজেও বিদায় নিলেন, তখন তার সন্তানদের মনে এক প্রশ্নবোধক চিহ্ন এঁকে দিয়ে গেলেন, যা কিয়ামত পর্যন্ত তাদের মনের মণিকোঠায় অক্ষয় হয়ে থাকবে।
যদি মায়ের নামে কিছু দান করতে যাই, তাহলে এগারো পয়সার বেশি দিতে সাহস হয় না, অথচ মসজিদের মোল্লা তো বিস্মিত হয়ে বলেন যে, বিজলির রেট বেড়ে যাচ্ছে– তেলের দামও বাড়ছে।
মায়ের নামে যদি ফাতেহা দিতে চাই, তাহলে মকাই-এর রুটি আর লবণ-মরিচের চাটনির কথা মনে পড়ে। যাকে খাওয়াই সে বলে ফাতেহা দরুদে তো পোলাও-জরদা হওয়াই উচিত।
মায়ের কথা মনে এলেই বাঁধ ভেঙে কান্না আসে। কিন্তু যদি কাঁদি তাহলে ভয় হয়, পাছে মায়ের রুহের কষ্ট হয়, আর যদি কান্না দমন করতে যাই–খোদার কসম, কান্না থামানো যায় না।
৩. শ্ৰেষ্ঠ উর্দু গল্প – ৩য় খণ্ড
ভূমিকা
বর্তমানে পাকিস্তান আর ভারত মিলিয়ে উর্দুভাষী জনসংখ্যা ৭ কোটির ওপরে। উর্দু ভাষা এবং সাহিত্যের উৎকর্ষ তাই এই দুদেশের মিলিত প্রয়াসে।
১৯৪৭-পূর্ববর্তী উর্দু ছোটগল্পের প্রধান বিষয়বস্তু মূলত রাজনৈতিক আন্দোলন, সামাজিক জাগরণ কিংবা নারী-পুরুষের মিলন। কিন্তু দেশবিভাগের পরবর্তীতে নাটকীয় পরিবর্তন ঘটল ছোটগল্পে– সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার কিংবা পরাধীন কাশ্মিরের কাহিনীতে মানুষের নীচতা আর নির্যাতনকে ছাপিয়ে মর্মস্পর্শী হয়ে উঠল মানবতাবোধ; বিদ্বেষ বিতৃষ্ণা হতাশা ছাপিয়ে উঠে এল প্রেম আর আশার উচ্চকিত উচ্চারণ। ক্রমশ স্থিরতা এল সমাজ ও মানবজীবনে– প্রতিদিনের তুচ্ছ সাধারণ ঘটনার মধ্যে দিয়ে প্রকাশিত হল অন্তরের বিচিত্র সূক্ষ্ম অনুভূতির অনবদ্য অতলস্পর্শী রূপ।
উর্দু ছোটগল্পের এই সৌন্দর্য পাঠকের কাছে পৌঁছে দিতে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র থেকে ইতোপূর্বে নাতিদীর্ঘ ভূমিকাসহ প্রকাশিত হয়েছে শ্রেষ্ঠ উর্দু গল্পের দুটি সংকলন। খণ্ড দুটিতে উর্দু সাহিত্যে আধুনিকতার উদ্ভব-পর্ব থেকে সাম্প্রতিককাল পর্যন্ত প্রধান লেখক হিশেবে যাঁরা নিজেদের ভাষা-বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসতে পেরেছেন তাঁদের লেখাই অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। নির্বাচিত গল্পগুলো লেখকদের প্রতিনিধিত্বকারী ও শ্রেষ্ঠ রচনা, ফলে খণ্ড দুটিকে উর্দু কথাসাহিত্যের প্রামাণ্য বাংলা সংকলন হিশেবে সহজেই চেনা যায়। কিন্তু উর্দু ছোটগল্পের বিপুল ঐশ্বর্যের সামান্য অংশই ধরা সম্ভব হয়েছে খণ্ড দুটির স্বল্প পরিসরে। তাই ১৯৪৭-এর দেশবিভাগের পরবর্তীকাল থেকে এ পর্যন্ত অনূদিত– আশ্চর্যজনক হলেও ১৯৭১-পরবর্তীতে যা গুণগত মানে না হলেও পরিমাণে বিপুলতর– রচনা থেকে বাছাইকৃত সেরা রচনাগুলো দিয়ে আরও তিনটি খণ্ডে (তৃতীয় থেকে পঞ্চম) প্রকাশিত হল শ্রেষ্ঠ উর্দু গল্প নামে। প্রতিটি খণ্ডেই রয়েছে বিচিত্র স্বাদের অনন্য কিছু গল্প। এখানে অনেক চেনা, নামী লেখকের পাশে স্থান পেয়েছে অজানা কিংবা প্রায়-অনামা লেখকের বিস্ময়কর সাহিত্যগুণসম্পন্ন রচনা; ধরা পড়েছে মানবিকতা, হাস্যরস, মনোবিশ্লেষণ, জীবনবোধ কিংবা প্রতীকী গল্পের মধ্যে দিয়ে উর্দু ছোটগল্পের ঋদ্ধ বিস্তৃত ভুবন।
জাহিদ হাসান
গোঁফ – হামিদ কাশ্মিরি
স্টেশনে ট্রেন থেকে নেমে, ফটক পর্যন্ত এসে দিলাওয়ার খান কিছুক্ষণ থমকে দাঁড়িয়ে থাকল। রাস্তায় এত লোক। সবাই তো পায়ে হেঁটে চলেছে। প্রত্যেকটি চলমান লোকের মুখের ওপর সে একবার করে গভীর দৃষ্টি ফেলল। শহরে তার এই প্রথম আসা। তা-ও এত বড় শহর। কাজেই শহর দেখতে যে অদ্ভুত লাগবে, সেরকম একটা ধারণা মনে মনে পোষণ করে রেখেছিল আগেই থেকেই। কিন্তু এ শহর যে এত অদ্ভুত, তা সে আগে কখনো ভাবেনি।
শুধু শহর নয়– শহরের মানুষগুলোও অদ্ভুত। এমন একটা মানুষও তো দিলাওয়ার খান গ্রামে কখনো দেখেনি। এদের পোশাক কেমন বিচিত্র। মাথায় তার মতো কেউই পাগড়ি জড়ায়নি। গ্রামের যারা গরীব লোক, যারা চল্লিশ গজি পাগড়ির পয়সা যোগাতে পারে না, তারাও কখনো মাথা খালি রাখে না। আর কিছু না-হোক একটা লুঙ্গি হলেও তাই মাথায় জড়িয়ে নিয়ে তবে বাড়ির বাইরে বেরোয়। আর, এ শহরের মানুষ টুপিটা পর্যন্ত মাথায় চাপায়নি। সবারই মাথা উলঙ্গ। তার ওপর আবার মর্দানা আর জানানা চেনা দায়। কোনো কোনো মেয়েলোকের চুল পুরুষ মানুষের মতো করে ছাঁটা, আর শরীরের অর্ধেকের বেশি বেআবরু। আবার অনেক পুরুষ জানানা পোশাক পরেছে।
