সবচাইতে তাজ্জবের ব্যাপার, কোনো পুরুষেরই মুখে গোঁফ নেই। তার মতো অমন লম্বা-চওড়া গোঁফ দূরের কথা– কারও নাকের নিচে সামান্য গোঁফের রেখাটুকু পর্যন্ত লক্ষ করা যায় না। দুই পাশে তা দিয়ে দিয়ে পাকিয়ে রাখা তার মতো অমন জমকালো গোঁফ তাদের গ্রামের সবারই যে রয়েছে, এমন কথা সে বলতে চায় না। কিন্তু একেবারেই গোঁফ নেই, এমন তো কখনো হতে দেখেনি সে।
দাড়ি কেউ রাখে, কেউ রাখে না; কিন্তু গোঁফ প্রত্যেকেই রাখে যার যার সাধ্য আর সামর্থ্য মতো। যার ছাতিতে যত তাকত, তার গোঁফ তত জমকালো। নিজের গ্রামে দিলাওয়ার খানের গোঁফ সবচাইতে বড় বলেই-না তার এত খাতির। তার গোঁফের খ্যাতি আশপাশের চৌদ্দটা গ্রামের মধ্যেও বিস্তার লাভ করেছে। গোঁফের এই মর্যাদা কোনোদিনও ক্ষুণ্ন হতে দেয়নি সে, তার সাহস আর বীরত্বকে যেমন দেয়নি কখনো ম্লান হতে। গ্রামের সবাই আগে তাকেই সালাম দেয়। তাই বলে সে দাম্ভিক নয়। আগে সে সালাম করতে চাইলেও গ্রামের লোকরাই সে সুযোগ দেয় না কখনো। যাই হোক, এ তার প্রাপ্য সম্মান। এমন সম্মান জুটতে পারে খুব কম লোকের ভাগ্যেই।
শহরের এইসব অদ্ভুত ব্যাপার লক্ষ করে দিলাওয়ার খান অবাক হল। তারপর সে লক্ষ করল, তার গোঁফের দিকে যার চোখ পড়ছে, সেই যেন ভয় পেয়ে যাচ্ছে। সেই জন্যই এই গোঁফ দেখছে তারা নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে।
তার মধ্যে একটা ছেলে– যার জামাটা মেয়েদের মতো গায়ের সঙ্গে সেঁটে রয়েছে আর সে জামায় ফুল-পাতায় নকশা কাটা– যেন খানিক মশকরার ভঙ্গিতে বেশকিছুটা কাছে থেকে দিলাওয়ার খানের গোঁফ দেখছিল। চাল-চলন, হাব-ভাব দেখে ছেলেটাকে দিব্যি জানানা বলেই বোধ হচ্ছে। এই কারণে তার এইভাবে তাকিয়ে থাকাকে সে গুরুত্ব দিল না। ভাবল, গোঁফ দেখার শখ মিটলেই চলে যাবে সে। কিন্তু ছেলেটা চলে যাওয়া দূরে থাক– এখন তার এক সঙ্গীর কাঁধের উপর কনুই রেখে হেলান দেওয়ার ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আরও মজা করে দেখতে লাগল, আর দেখার মধ্যে আগের মতো তেমনি মশকরার ভাব। দিলাওয়ার খান আর সহ্য করতে পারল না। তখন সে ঘাড় টান করে দাঁড়াল। এক মুহূর্ত চোখ ফেলল। গোঁফে সামান্য একটু কাঁপুনি দিল। এই গোঁফ নড়ানো দেখেই ছেলেটা তার সঙ্গীকে নিয়ে এমন এক দৌড় মারল যে, আর ফিরেও তাকাল না। মনে মনে মুচকি হেসে আস্তে আস্তে রাস্তায় নেমে পড়ল দিলাওয়ার খান।
রাস্তায় নেমেও সেই এক কাণ্ড! লুকিয়ে লুকিয়ে কিংবা প্রকাশ্যে, আড়চোখে কিংবা পেছন ফিরে, দূরে থেকে কিংবা কাছ থেকে একবার, দুবার, তিনবার করে প্রত্যেকে তার গোঁফ দেখছে। লোকগুলো যেন ভাবছে, রাজ্যের যত গোঁফ সবই দিলাওয়ার খানের নাকের নিচে এসে জড় হয়েছে। দিলাওয়ার খান ভাবল, তার কাছে যেমন শহরটা অদ্ভুত সেও তেমনি অদ্ভুত এই শহুরে লোকগুলোর কাছে।
যাই হোক, সে আনন্দিত যে, সবাই তার আগমন উপলব্ধি করছে। কত লোকই তো এই শহরে প্রতিদিন আসে, কিন্তু কেউ কি তাদের এইরকম ভয়ের চোখে দেখে! গ্রামের লোকরাও তাকে ভয় করে চলে। অবশ্য সেজন্য তাকে যথেষ্ট খাটতে হয়েছে। যথেষ্ট শক্তির পরীক্ষা দিতে হয়েছে। কত ভয়াবহ যুদ্ধে লিপ্ত হতে হয়েছে তাকে। কিন্তু শহরে এসে সেরকম কিছুই করতে হল না। বিনা খাটুনিতেই লাভ করল এমন মর্যাদার আসন। সুতরাং, দাঁড়িয়ে পড়ে একবার সে ভালো করে গোঁফে একটা তা দিয়ে নিল। ছাতিটা টান করল। গর্দান উঁচু করল। মনেই থাকল না কোথায় তাকে যেতে হবে। ভুলেই গেল, কেউ তাকে স্টেশনে নিতে আসেনি কেন।
যখন মনে পড়ল, তখন ভারি দুঃখ হল। ভাবল, হয়তো তার চিঠি এখনো পৌঁছায়নি। তারপর নোটবুকে লেখা ঠিকানা দেখে নিল। কিন্তু কেমন করে সেখানে যেতে হবে, তা সে জানে না। সামনের ফুটপাতে মিনমিনে ধরনের একটা লোককে দেখতে পেয়ে তার দিকে এগুলো জিগ্যেস করার জন্য। লোকটা আগে থেকেই তার গোঁফের দিকে তাকিয়ে ছিল। সে দিলাওয়ার খানকে তার দিকে এগুতে দেখে ভয় পেয়ে এলোপাথাড়ি দৌড় মারতে শুরু করে দিল।
‘আখো, বুদিল।’ লোকটাকে গালি দিল সে কাপুরুষ বলে। তারপর, অন্য একজনের কাছে ঠিকানা জানতে চাইল সে। এবারের লোকটা ভয় পেয়ে পালিয়ে গেল না। দিলাওয়ার খানকে সে বুঝিয়ে দিল যে ওই বাস-স্ট্যান্ডে গিয়ে বাসে চাপলে চৌরঙ্গি পৌঁছানো যাবে, সেখানে থেকে অন্য বাস ধরলে চলে যেতে পারবে গন্তব্যস্থলে।
বাস-স্ট্যান্ডে বিরাট একটা লাইন লেগেছিল। এই লাইনের মর্ম দিলাওয়ার খানের জানা নেই। জানবার চেষ্টাও সে করল না। লাইনের বাইরে এক জায়গায় দাঁড়িয়ে চালগোজা ছাড়িয়ে ছাড়িয়ে খেতে লাগল আর বাসের জন্য অপেক্ষা করতে লাগল। সবাই লুকিয়ে লুকিয়ে, আড়চোখে তাকে দেখছে। সামনে এসে দাঁড়ানোর সাহস নেই কারও মনে এইভাবে সর্ববিধ দৃষ্টির কেন্দ্রবিন্দু হতে পারায় তার মনে যদিও গর্বের অন্ত ছিল না, কিন্তু বাস-স্ট্যান্ডে আসার পর এই দেখার মাত্রা এত বেড়েছে যে, এখন সে বিরক্তি অনুভব করতে আরম্ভ করল। কাজেই ব্যাপারটাকে আর আদৌ আমল না দিয়ে আপন মনে চালগোজা চিবোতে থাকল সে। এমন সময় একটা বাস এল, আর সঙ্গে সঙ্গে সে বাসের দিকে ধাবিত হল। কিন্তু তার পৌঁছানোর আগেই বিরাট লাইনের একটা দিক বাসের ভেতরে প্রবেশ করতে শুরু করে দিয়েছে। এই অবস্থা’ দেখে সে কিছুক্ষণ হতভম্ব হয়ে থাকল। তারপর যখন বুঝল, তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে– বাস প্রায় ভরে গেছে। কাজেই আর সময় নষ্ট না করে সামনের দিকে লাইনের এক জায়গায় সে ঢুকে পড়ল। পেছনের লোকরা অস্বস্তি অনুভব করল, কিন্তু কারও সাহস হল না প্রতিবাদ করার।
