কাউকে দিয়ে কোনো কাজ করানো মায়ের কাছে খুব কঠিন মনে হত। নিজের সব কাজই তিনি নিজ হাতে করতেন–যদি কোনো চাকর-বাকর এসে জবরদস্তি করে তার কাজ করে দিত, তাহলে এক অভূতপূর্ব লজ্জা আর কৃতজ্ঞতার সঙ্গে সমস্ত দিন দোয়া করতেন তাকে।
সরলতা ও তিতিক্ষার এই বৈশিষ্ট্য কিছুটা প্রকৃতিগতভাবেই মায়ের চরিত্রে ছিল, কিছুটা এসেছিল জীবনের ঘাত-সংঘাত থেকে।
জিরানওয়ালায় কিছুদিন অবস্থানের পর তিনি যখন তার বাপ-মা ও ছোট ভাইদের নিয়ে জমির খোঁজে লায়ালপুর রওনা হলেন, তখন তাদের জানা ছিল না যে, তাদের কোথায় যেতে হবে এবং জমি পেতে গেলে কী পন্থা অবলম্বন করতে হবে। মা বলতেন, সেকালে তার মনে কলোনির কল্পনা একজন ফেরেশতা স্বভাবের মহাত্মার চিত্র হয়ে ভেসে উঠত, যিনি উঁচু বেদীর উপর বসে জমি-জিরাত বণ্টন করছেন।
কয়েক সপ্তাহ ধরে এই ছোট্ট কাফেলাটা লায়ালপুর এলাকায় ঘুরে বেড়াল; কিন্তু কোনো পথচারীর চেহারায় কলোনির মহাত্মাসুলভ চিত্র ফুটে উঠল না। অবশেষে ক্লান্ত হয়ে ৩৯২ নম্বর চকে–সে সময় সেখানে নতুন আবাদি বসছিল–ডেরা ফেলল তারা। দলে-দলে লোক এসে সেখানে ঘর বাঁধছিল–নানাজি তার সোজা বুদ্ধিতে বুঝলেন যে, কলোনিতে বসবাস করবার হয়তো এটা একটা নতুন নিয়ম। সুতরাং তিনি খানিকটা জায়গা ঘিরে নিয়ে ঘাসপাতা দিয়ে একটা কুড়ে তৈরি করে ফেললেন এবং পতিত দেখে এক টুকরো জমি খুঁজে নিয়ে চাষ করবার বন্দোবস্ত করতে লাগলেন। সেই সময়ই রাজস্ব বিভাগের একজন কর্মচারী পর্যবেক্ষণের জন্য এসে দেখলেন যে, নানাজির কাছে এলটমেন্টের দলিলপত্র নেই। ফলে তাঁকে চক থেকে বের করে দেয়া হল : অধিকন্তু সরকারি জমিতে বে-আইনিভাবে কুঁড়েঘর বানানোর জন্য তাঁর বাসন-কোসন ও বিছানা-পত্র ক্রোক করা হল। কর্মচারীদের একজন মায়ের কানের দুটো রুপোর বালি খুলে নিয়ে গেল। একটা বালি খুলতে দেরি হওয়ায় সে এমন জোরে টান মারল, যার ফলে মায়ের বা কানের লতিটা সাংঘাতিকভাবে কেটে গেল।
৩৯২নং চক থেকে বিতাড়িত হয়ে যে রাস্তা ধরে সামনে পেলেন সেই রাস্তা বেয়ে চললেন। গরমের দিন তখন–সারাদিন লু-হাওয়া বইছে। পানি রাখবার জন্য একটা মাটির ভাঁড়ও ছিল না তাদের। কোথাও কোনো কুয়া দেখলেই মা তার ওড়না ভিজিয়ে নিতেন, যাতে তৃষ্ণা পেলে ছোট ভাইদের চোষানো যায়। এভাবে চলতে-চলতে তারা ৫০৭ নম্বর চকে পৌঁছলেন। সেখানে একজন চেনাশোনা বসতি স্থাপনকারী নানাজিকে কামলা রাখল। নানাজি হাল বাইতেন, নানি গরু-মোষ চরাতেন, মা ক্ষেত থেকে ঘাস আর চারা কেটে জমিদারের গরু-মোষের খাবার জোগাতেন, তখন তাঁদের এতটুকু সঙ্গতিও ছিল না যা দিয়ে পেটভরে একবেলার খাবার খেতে পারেন। কখনো বুনো ফল খেয়ে থাকতেন সবাই। কখনো খেতেন কুড়িয়ে পাওয়া তরমুজের খোসা। কখনো বা কারো ক্ষেতে পড়ে থাকা টক ফুল কুড়িয়ে এনে তার চাটনি করা হত। একদিন কোত্থেকে যেন কলতা শাক পাওয়া গেল, নানা কাজ-কর্মে ব্যস্ত ছিলেন। মা চুলোয় শাক চাপিয়ে যখন একেবারে সিদ্ধ করে এনেছেন, এবার শাকটা নেড়ে-চেড়ে ঘাঁটতে হবে, সেই সময় হাতা দিয়ে নাড়তে গিয়ে হাড়িতে এত জোরে ঘা লাগল যে হাঁড়ির তলাটা গেল ভেঙে। সব শাক পড়ে গেল চুলোর মধ্যে। নানি এসে মাকে ধমকালেন এবং মারলেনও। সে-রাতে গোটা পরিবার চুলোর ভেতরে পোড়া কাঠে লেগে থাকা শাক কোনোমতে আঙুল দিয়ে চেটে-চেটে খেয়ে ক্ষুধা নিবৃত্তি করল।
৫০৭ নম্বর চকে নানাজির ভাগ্য ফিরে গেল। কয়েক মাস কঠোর পরিশ্রমের পর পুনর্বাসনের সূত্রে সাজে কিস্তিতে তিনিও একখণ্ড জমি পেয়ে গেলেন। আস্তে-আস্তে সুদিন আসতে লাগল এবং দু’তিন বছরের মধ্যেই নানাজি গ্রামের সচ্ছল লোকদের মধ্যে গণ্য হয়ে গেলেন। এমনি দিন-দিন যখন সচ্ছলতা বেড়ে চলল পিতৃভূমির কথা মনে পড়ে গেল তাঁর। সুতরাং সচ্ছলতার চার-পাঁচ বছর অতিবাহিত হওয়ার পর সমস্ত পরিবার নিয়ে রেলে চড়ে মেনিলা রওনা হলেন। রেল-ভ্রমণে মা খুব আনন্দ পেলেন। সারা পথ তিনি জানালা দিয়ে মুখ বের করে তাকিয়েছিলেন; এর ফলে বেশ কিছু কয়লার গুঁড়ো তাঁর চোখে পড়ে। কয়েকদিন চোখের পীড়ায় ভুগতে হয় তাকে। এই অভিজ্ঞতার কারণে তিনি সারাজীবনে তার ছেলেদের কোনোদিনই রেলগাড়ির জানালা দিয়ে মাথা গলিয়ে বাইরে দেখবার অনুমতি দেননি। মা রেলের তৃতীয় শ্রেণীতে সফর করতে পারলেই খুব সন্তুষ্ট থাকতেন। সহযাত্রিনী মেয়ে ও ছোট ছেলেদের সঙ্গে আলাপ জমিয়ে নিতেন খুব তাড়াতাড়ি। পথের ক্লান্তি আর ধুলোবালিতে তার কোনো অসুবিধা হত না। প্রথম শ্রেণীতে বরং ভ্রমণেই তিনি কষ্ট পেতেন বেশি। দু’একবার যখন তাঁকে এয়ারকন্ডিশন্ড গাড়িতে ভ্রমণে বাধ্য হতে হয়েছিল, তখন তিনি ক্লান্তিতে ভেঙে পড়েছিলেন। মনে হয়েছিল সারাক্ষণ যেন জেলখানার কষ্ট ভোগ করছেন।
মেনিলায় পৌঁছে নানাজি তার পরিত্যক্ত পৈতৃক বাড়ি ঠিকঠাক করলেন। আত্মীয় স্বজনদের নানা উপহার দিলেন, দাওয়াত করে খাওয়ালেন সবাইকে। তারপর মায়ের জন্য বর খোঁজা শুরু করলেন।
সে-যুগে জমিওয়ালাদের প্রভূত সম্মান ছিল। ভাগ্যবান এবং সম্মানিত বলে পরিগণিত হতেন তারা। সুতরাং চারদিক থেকে মায়ের জন্য বিয়ের খবর আসতে লাগল। এমনিতেও মায়ের জাঁকজমক ছিল; তার ওপর বরপক্ষের আকর্ষণ বাড়াবার জন্য নানি তাকে রোজ নতুন-নতুন কাপড় পরিয়ে নতুন বউ-এর মতো সাজিয়ে রাখতেন।
