হলুদ আর লাল, লাল আর হলুদ–প্রেতায়িত সূর্যরশ্মির তীব্রতা তার চোখ ভেদ করে সোজা মগজে খোঁচা মারছে; হাজার হাজার অদৃশ্য সূচের মতো লাল আর হলুদ রশ্মির তীক্ষ্ণতা তার সমস্ত দেহ খুঁচিয়ে বিধছে।
দিনে-রাত্তিরে, কি জাগরণে, কি নিদ্রায়–হয়তো হাঁটছে, হয়তো-বা বসে রয়েছে– সবসময়েই চোখের সামনে বিভীষিকার ভয়ঙ্কর আবৃত রঙ দুটোর শিখা নাচতে থাকে নারকীয় দানবের অজস্র লকলকে জিভের মতো। শয়তানের অগ্নৎসবে কাঠের বদলে পোপাড়ানো হচ্ছে অগুণতি মড়া। হাজার শব জ্বলছে এক চিতায়; আর অসংখ্য অদেহী আত্মা চারদিক ঘিরে নাচছে মৃত্যুতাণ্ডবের অদৃশ্য নাচ। তাদের ভীতিসঞ্চারী গর্জনে ধ্বনিত হচ্ছে :
প্রতিশোধ!
প্রতিশোধ!!
প্রতিশোধ!!!
লাল আর হলুদ, হলুদ আর লাল রঙ দুটোর জ্বলন্ত পাবকশিখার তীক্ষ্ণতা বেঁধে ফেলছে তার দেহমন আত্মার সামগ্রিকতাকে। কি প্রভাতের অরুণিমায়, কি সূর্যাস্তের মৃত্যুগরিমায় রঙ দুটোর শিখা তার চোখের সামনে সবসময়েই জ্বলতে থাকে। শিরার ভেতরে প্রবাহিত হতে থাকে জ্বলন্ত আগুনের তরলতা। রক্ত কোথায়? প্রতিটি নিঃশ্বাসের সাথে ভেসে আসে অগ্নিদাহের ধোয়ার গন্ধ। মাঝে মাঝে মনে হয় সে বুঝি মানুষী সত্তা হারিয়ে নরকের অদৃশ্য আগুনে প্রেতাত্মায় রূপান্তরিত হয়েছে।
সবাই জানে হরিদাস পাগল হয়ে গেছে। হরিদাসও কথা কয় না কারো সঙ্গে। আত্মীয়স্বজন, বন্ধু-বান্ধব–কারো সঙ্গে নয়। এই নির্বাকতাই তার মস্তিষ্কবিকৃতির যথেষ্ট পরিচায়ক। তা নাহলে সে কথা কয় না কেন? রাজ্যের যত মজার মজার মুখরোচক উত্তেজক আলাপ-আলোচনার আসরে তার অমন বোবা ও গোমড়া মুখ কেন? না কারো বিয়ের গল্প, কি সিনেমার গল্প, কি এমনি গালগল্প, কুৎসা, নিন্দা, রাজনীতি, সাহিত্য–না, হরিদাস এইসব কিছুরই চৌহদ্দির বাইরে। এমনকি চোখে-মুখে পর্যন্ত ভাবান্তর নেই, সমাজ-সংসারের বহু ঊর্ধ্বে, একেবারে নির্লিপ্ত। যেন সে পাথর হয়ে গেছে।
কিংবা অন্ধ, বোবা, বধির। কিন্তু একবার শুধু দাঙ্গা আর খুনের গল্প উঠিয়ে দাও, তারপর দেখ–ঘৃণা আর ক্রোধের লেলিহান আগুনের ঝলকে ওর চোখ দুটো উঠেছে জ্বলে। নির্বাক হরিদাসের অগ্নিভয়ঙ্কর চোখজোড়া তখন যেন লড়াইয়ের হাঁক দেয় :
প্রতিশোধ!
প্রতিশোধ!!
প্রতিশোধ!!!
পাঞ্জাব বিভাগের সময় হরিদাস ছিল লায়ালপুরের একজন ডাকসাইটে উকিল। তখন কেবল বিভক্ত পাঞ্জাবের টুকরো দুটোকে নৃশংস ভয়াবহ গৃহযুদ্ধের অগ্নিশ্রাবী কড়াইয়ে ছুঁড়ে ফেলে দেয়া হয়েছে। লায়ালপুরের বাস্তুত্যাগীরা বলেছে, দাঙ্গায় হরিদাসের গোটা পরিবারটাই খুন হয়ে গেছে। তারপর কেটে গেছে লম্বা দশ মাস। কাল নাকি সর্বদুঃখহরা। সেই মারাত্মক স্মৃতিও ধীরে ধীরে আবছা হয়ে এসেছে। তাছাড়া সঠিক কেউ জানতও না কীভাবে তার স্ত্রী আর কন্যা মারা গেছে। আরও হাজার হাজার জনের মতো নদীতে ঝাঁপ দিয়ে, না গৃহদাহে, না খুনখার ছুরির আঘাতে। হরিদাস কাউকে বলেনি সে-কথা।
হরিদাস পাগল হয়নি; অথচ মাঝে মাঝে পাগল হবার ইচ্ছাই তাকে পেয়ে বসে। তাহলে সবকিছু ভুলে যাওয়া যেত। হৃদয়বিদারী ভয়াবহ স্মৃতির অহর্নিশ নিপীড়ন অসহ্য–কীভাবে বাড়ি লুঠ হল, কীভাবে তার স্ত্রী নদীতে ঝাঁপ দিয়ে মরল, কীভাবে প্রতিবেশী-বন্ধুরা নিহত হল–এইসব। সবচেয়ে মারাত্মক হচ্ছে কন্যা জানকীর স্মৃতি। উঃ, ঘিলুতে কী যেন কামড়াতে থাকে। মনের পর্দায় মর্মান্তিক ছবিগুলো ভেসে ওঠে বিশৃঙ্খলভাবে।
সেইসব ছবি। সুন্দর ছবি। ভয়ঙ্করও বটে।
জানকী, সতেরো বছরের জানকী। মায়ের বুকের ধন, বাপের চোখের মণি।
গোলাপের পাপড়ির মতো কোমল গায়ের রঙ। আর চোখ, নার্গিস ফুল কোথায় লাগে! ছিপছিপে লতিয়ে ওঠা দেহবল্লরী। ভয় হয় মৃদুতম স্পর্শেই কুঁকড়ে যেতে পারে। গোটা লায়ালপুরে সবচেয়ে সুন্দরী, সবচেয়ে বুদ্ধিমতী মেয়ে জানকী।
মুখখানা কী চমৎকার! সারল্যের প্রলেপ রয়েছে তার ওপরে।
পাশাপাশি আরেকটা ছবি ঝিলিক মেরে ওঠে।
কয়েকটি কুৎসিত ভয়াবহ মুখাবয়ব। চোখে পাশব কামনার সর্বধ্বংসী অগ্নিশিখা। ওষ্ঠের কুঞ্চনে শয়তানের নারকীয় হাসি।
সূর্যালোকে চকচক করছে ছুরির শাণিত ধার। বন্দুকের অদৃশ্য কালো কালো চোখ দ্যুতিময়তায় জ্বলছে। সেই ভয়ঙ্কর মুখগুলো এগিয়ে আসে জানকীর দিকে ভয়ঙ্করের পদক্ষেপ ফেলে।
এখনও, দশমাস পরেও, হরিদাস নিজের অনুনয়-ভারাক্রান্ত কাতর ভিক্ষা প্রার্থনার প্রতিধ্বনি শুনতে পায়।
: মার আমাকে, মেরে ফেল–শুধু–শুধু আমার মেয়েকে ছেড়ে দাও। ফের এগিয়ে আসে ওরা জানকীর দিকে। বিভীষিকার কালো কালো ছায়া-রঙ ওদের মুখে।
: আমি মুসলমান হতে রাজি আছি। আমার মেয়েও হবে। শুধু দয়া কর, দয়া কর– ওকে বাঁচাও।
নৃশংস বিকট মুখগুলোতে কোনোরকম কারুণ্যের ছায়া নেই। কামনা-ভয়ঙ্কর চোখগুলো জানকীর দিকে এগোতে থাকে। গোখরো সাপ যেন এগোচ্ছে সম্মোহিত শিকারের দিকে।
: আমার মেয়ের কচি বয়স ও সুন্দরী। দেখতেই পাচ্ছ। তোমরা যে কেউ ওকে মুসলমান করে বিয়ে কর, কেবল জীবনটা নিয়ে না।
একটা মুখ। এতগুলো ভয়াবহ মুখের ভেতরে সেটা আরও ভয়ঙ্কর। হলদে ময়লা দাঁত, চোখ-ভরা বিকট কামনা। ক্ষুধার বিশ্বগ্রাসী দাবানল। উল্লাসে আর উত্তেজনায় ঘন কালো দাড়ি কাঁপছে তার। তার মাত্র কয়েক ইঞ্চি দূরেই জানকীর ফুলের মতো সৌন্দর্য। পরমুহূর্তে হরিদাসের দৃষ্টি আবছা হয়ে আসে। প্রেতায়িত কালো মেঘ যেন চাঁদ ঢেকে ফেলেছে। কিন্তু বর্বরের পাশব আক্রমণে জানকী গুঁড়িয়ে যাবার আগেই হরিদাসের দৃষ্টি আটকে যায়।
