মনে-মনে ভাবলাম যদি বেঁচে থাকি তবে, ওরে সর্দার, তোর সঙ্গে বোঝাপড়া হবে। কিন্তু এখন তো আমি টু শব্দও করতে পারছি না। সশস্ত্র দাঙ্গাকারীরা আমার কাছ থেকে মাত্র কয়েক গজ দূরে। যদি তারা জানতে পারে যে আমি এখানে আছি
‘এস, ভেতরে এস।’ হঠাৎ দেখি সর্দারজি নগ্ন তলোয়ার হাতে নিয়ে আমাকে বাড়ির ভেতরে ডাকছেন। আমি বৃদ্ধের চেহারার দিকে তাকালাম। লুটপাটে অংশ নেয়ার ছুটোছুটিতে তার চেহারা আরো ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছে। তার হাতের চকচক করা কৃপাণ আমাকে মৃত্যুর আমন্ত্রণ জানাচ্ছে।
কথা বলার সময় নেই। যদি আমি কিছু বলি এবং দাঙ্গাকারীরা শুনতে পায় তাহলে একটা গুলি আমার বুক ভেদ করে যাবে।
কৃপাণ এবং বন্দুকের মধ্যে যে কোনো একটা বেছে নিতে হবে। দাঙ্গাবাজ দশটি যুবকের চেয়ে একজন বৃদ্ধের কৃপাণ অনেক ভালো। আমি নীরবে কামরায় প্রবেশ করলাম।
ওখানে নয়, ভেতরে এস।
আমি ভেতরের দিকের একটি কামরায় গেলাম। মনে হচ্ছিল, কসাইখানায় করি প্রবেশ করছে। আমার চোখ কৃপাণের তীক্ষ্ণ ধারে ধাঁধিয়ে যাচ্ছে।
এই নাও তোমার জিনিসপত্র। এ-কথা বলে সর্দারজি নিজে এবং তার ছেলেমেয়েরা মিছেমিছি লুণ্ঠিত দ্রব্যাদি আমার সামনে এনে রাখল।
সর্দার-গিন্নি বললেন, বাবা তোমার কোনো জিনিসই বলতে গেলে রক্ষা করতে পারলাম না।
আমি কোনো কথা বললাম না। হঠাৎ বাইরে ঝনঝন শব্দ শোনা গেলে। সাঙ্গাকারীরা আমার লোহার আলমারি বাইরে বের করে সেটি ভাঙার চেষ্টা করছে।
একজন বলল, এর চাবি পাওয়া গেল সহজে ঝামেলা মিটে যেত। অন্যজন বলল, এর চাবি তো পাকিস্তানে পাওয়া যাবে। ভীরু তো, তাই পালিয়ে গেছে। মুসলমানের বাচ্চা হলে তো মোকাবেলা করত!
ছোট্ট মোহিনী আমার স্ত্রীর কয়েকটি রেশমি কামিজ এবং ঘাঘরা দাঙ্গাকারীদের কবল থেকে কেড়ে নিচ্ছিল। ওদের উক্তি শুনে সে বলল, হু হু! তোমরা বড় বাহাদুর বটে! শেখজি ভীরু হতে যাবেন কেন? তিনি তো পাকিস্তানে যাননি।’
একজন যুবক বলল, যদি না-ও গিয়ে থাকে তবে এখানে কোথাও মুখ কালো করে লুকিয়ে আছে।
মুখ কালো করে লুকোবে কেন, উনি তো আমাদের এখানে।
আমার হৃৎস্পন্দন মুহূর্তের জন্যে থেমে গেল। মোহিনী নিজের ভুল বুঝতে পারার সঙ্গে সঙ্গে চুপ করে রইল। কিন্তু দাঙ্গাবাজদের জন্যে এটুকু তথ্যই যথেষ্ট।
সর্দারজির মাথায় যেন রক্ত উঠে গেল। তিনি আমাকে ভেতরের অন্য একটা কামরায় ঢুকিয়ে দিয়ে দরজায় হুক লাগিয়ে দিলেন। তারপর নিজের পুত্রকে কৃপাণ হাতে দরজায় রেখে নিজে বাইরে বেরিয়ে গেলেন। বাইরে কী হল আমি তখনো ভালোভাবে বুঝতে পারিনি। তবে চড়-থাপ্পড় এবং পরক্ষণে মোহিনীর কান্না শোনা গেল। তারপর পাঞ্জাবি ভাষায় সর্দারজির মুখ নিঃসৃত অশ্লীল খিস্তি-খেউড়। বুঝতে পারলাম যে, কাকে এবং কেন তিনি গালি দিচ্ছেন। আমি চারদিক থেকে বন্দি ছিলাম, এ কারণে সঠিক কিছু শুনতে পেলাম না।
কিছুক্ষণ পর গুলিবর্ষণের আওয়াজ শোনা গেল। সর্দার-গিন্নি তীব্র আর্তনাদ করে উঠলেন।
লরির ঘরঘর আওয়াজ শোনা গেল ক্ষণিক পরেই। সমগ্র বিল্ডিং এলাকায় নৈঃশব্দ ছেয়ে গেল। আমাকে কক্ষবন্দি অবস্থা থেকে বের করার পর দেখি সর্দারজি পালঙ্কের উপরে পড়ে আছেন, তার বুকের কাছাকাছি জায়গায় সাদা কামিজ ভেদ করে রক্তধারা গড়াচ্ছে। তার পুত্র প্রতিবেশীর বাসা থেকে ডাক্তারকে টেলিফোন করতে গেছে।
সর্দারজি! এ তুমি কী করলে? নিজের অজ্ঞাতেই আমার মুখ থেকে এ-কথা বেরিয়ে এল। আমি স্তব্ধ বিমূঢ় দাঁড়িয়ে রইলাম কেবল। আমার চিন্তা-চেতনা, অনুভূতি লোপ পেয়ে গেছে তখন।
সর্দারজি, এ তুমি কী করলে?
আমার ঋণ পরিশোধ করলাম, খোকা!
ঋণ!
হ্যাঁ খোকা! রাওয়ালপিভিতে তোমার মতোই একজন মুসলমান নিজের জীবন দিয়ে আমার এবং আমার পরিবারের জীবন ও ইজ্জত রক্ষা করেছে।
তার নাম কী ছিল সর্দারজি?
গোলাম রসুল।
গোলাম রসুল? আমার মনে হল ভাগ্য যেন আমার সঙ্গে প্রতারণা করেছে। দেয়ালের ঘড়িতে বারোটা বাজল। এক দুই তিন চার পাঁচ…।
সর্দারজি হঠাৎ ঘড়ির দিকে তাকালেন। তিনি যেন হাসছেন। আমার নিজের দাদার কথা মনে পড়ল। তার মুখে কয়েক ফুট লম্বা দাড়ি ছিল। সর্দারজির চেহারা তার চেহারার সাথে যেন মিলে যাচ্ছে। ছয় সাত আট নয়…।
সর্দারজি যেন হাসছিলেন। তার শাদা দাড়ি এবং খোলা চুল চেহারার চারদিকে একটি আলোক আভা তৈরি করেছে।
দশ এগারো বারো। মনে হল সর্দারজি যেন বলছেনজ্বী হ্যাঁ, আমাদের এখানে চব্বিশ ঘণ্টাই বারোটা বেজে থাকে। কিছুক্ষণের মধ্যেই সর্দারজির দু’চোখ বুজে গেল।
দূর, বহু দূর থেকে যেন গোলাম রসুলের কণ্ঠস্বর শোনা যাচ্ছিল : আমি বলেছি না, বারোটা বাজলেই শিখদের বুদ্ধি লোপ পেয়ে যায়? এখন এই সর্দারজিকে দেখ। একজন মুসলমানের জন্যে নিজের জীবন দিলেন।
সর্দারজি সেদিন মারা যাননি, আমিই মরেছি।
প্রতিশোধ – খাজা আহমদ আব্বাস
দুটো রঙের বিভীষিকা। ভয়ঙ্করের প্রেতচ্ছায়া অদৃশ্য কায়াহীন পদসঞ্চারে পিছু নিয়েছে। তার দিনরাত্রির।
লাল, টক্টকে লাল; আর ফ্যাকাশে হলুদ, ভয়াবহ বিবর্ণতা।
লাল। মানুষের তাজা খুন যেন।
হলুদ। মড়ার মুখের রক্তশূন্য পাণ্ডুরতা!
লাল আর হলুদ, হলুদ আর লাল, বাতাসের গায়ে ভেসে বেড়াচ্ছে রঙ দুটোর বুদ্বুদ।
