জানকীর চোখে ছড়িয়ে রয়েছে অদ্ভুত ভীতি-ব্যাকুলতার ছায়া। ভীতি, ঘৃণা, অসহায়তা, নৈরাশ্য, নিষ্ফল করুণা ভিক্ষা–সবকিছু মিশিয়ে। সামনেই বাপকে বাঁধা হয়েছে একটা গাছের সঙ্গে। মেয়ের ইজ্জতহানি স্বচক্ষে দেখবার জন্যেই তাকে রাখা হয়েছে জিইয়ে। বীভৎস সে দৃশ্য। অসহ্য! হরিদাসের চোখের পাতা মুদে আসে।
স্মৃতির পর্দায় দৃশ্যটা ভেসে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে আপনিই তার চোখ বন্ধ হয়ে যায়। হায়, কান দুটোও যদি একেবারে বধির হয়ে যেত। তাহলে তো ঐ মর্মভেদী বিকট আর্তনাদ শুনতে হত না। শুনতে হত না গায়ের কাপড় নির্দয় হাতে ফড়ফড় করে টেনে ছেঁড়ার শব্দ, শয়তানটার কামার্ত নিঃশ্বাসের ভারি শব্দ, জানকীর মরণ চিৎকার, গোঙানি, কান্না। এখনও সে-সব কানে বাজে।
এমনকি মনের এতগুলো পাতা ডিঙিয়েও সেই ভয়ানক মুখগুলো একটার পর একটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এক, দুই, তিন, চার, পাঁচ… পরপর মুখগুলো ভেসে উঠছে যতক্ষণ-না সেই অসহায় কান্নাকে মৃত্যুর স্তব্ধতা শুষে নেয়। এ স্তব্ধতা আরো ভয়ঙ্কর, রক্ত ঘনতায় জমাট বাঁধা আর্তনাদের চেয়েও। তারপর সে চোখ খোলে…
ফুলের মতো জানকীর মুখখানা। ফুলটা যেন মাড়িয়ে নিষ্পিষ্ট করে দেয়া হয়েছে মাটির সঙ্গে। বিবর্ণ, সৌরভ্যুত, প্রাণহীন ফুল। আলুলায়িত কেশসম্ভারে অত্যাচারের বিশৃঙ্খলা। কপোলতটে নৃশংস দংশনের স্পষ্ট গভীরতা। ক্ষতমুখ থেকে রক্ত বেরোচ্ছে ফিনকি দিয়ে।
মৃত পাণ্ডুর মুখে যেন রুজের রক্তিম লালিমা। গারের পাপড়িরাঙা চামড়া কেটে রক্ত বেরোচ্ছে। নিষ্ঠুর ধারাল দাঁতের আঘাত স্পষ্ট। সমস্ত শরীরের ক্ষতমুখ দিয়ে রক্ত ঝরছে। গাল, কান, নাক এমনকি খোলা বুক থেকেও। জন্মের মতো, হ্যাঁ, যতদিন বাঁচবে ততদিনের জন্য হরিদাসের মনের ক্যানভাসে শয়তান রক্তের আখরে এঁকে দিয়েছে এ ছবিখানা। এ ছবি চির-অম্লান। কিছুতেই ভুলবার নয়। অসম্ভব!
নিজের হাতে হরিদাস সাজিয়েছে মেয়ের চিতা। দেখতে দেখতে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে জানকী। অগ্নিদেব তার কোমল, সুন্দর দেহ-নৈবেদ্য গ্রহণ করেছেন। পবিত্র নিষ্পাপ দেহনির্মাল্য। আহত, অপমানিত, ধর্ষিত সে দেহ। হরিদাস এখনও সেই চিতার অগ্নিশিখা দেখতে পায়। শিখাগুলো নাচছে তার চোখের সামনে। লাল আর হলুদ ঊর্ধ্বমুখী শিখা। তার মনে হয়েছিল জানকীর নয়, হিন্দুস্থানের ইজ্জত দাহ করা হচ্ছে। চিতাগ্নিশিখার সঙ্গে মানবতা উবে যাচ্ছে। সৌন্দর্য, দয়াধর্ম আর সহানুভূতি পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে।
চিতার আগুন একসময়ে নিভল। কিন্তু প্রতিহিংসার আগুন দাউদাউ করে জ্বলে উঠল হরিদাসের মনে। এ আগুন নিভবার নয়। না… না… কখনো না… অন্তত… যতদিন-না হরিদাস প্রতিশোধ নিতে পারে একটি মুসলমান মেয়ের নগ্ন বুকে ছুরিকাঘাত করে। তাই হরিদাস বেঁচে রয়েছে এখনো। একবার, শুধু একবার প্রতিহিংসা চরিতার্থ করে তার পরমুহূর্তেই মৃত্যুকে জড়িয়ে ধরবে সে।
প্রতিশোধ!
প্রতিশোধ!!
কোটের নিচে ধারাল ছুরি লুকানো রয়েছে। কিন্তু কোথায় সুন্দরী মুসলমান মেয়ে? জিঘাংসু হরিদাসের অতৃপ্ত আত্মা খুঁজে বেড়াচ্ছে তাকে। দিল্লির মুসলমানদের অনেকে দাঙ্গায় নিহত হয়েছে। কেউ কেউ পাকিস্তানে পালিয়ে প্রাণ বাঁচিয়েছে। যারা এখনও রয়ে গেছে, তারা তো পথে বেরাতেই সাহস করে না। কাপুরুষ কোথাকার, ভীতুর দল!
ভাগ্য হরিদাসের সঙ্গে অদ্ভুত খেলা শুরু করেছে। বাস্তুত্যাগী পুনর্বসতি সাহায্য তহবিল থেকে সে তিনশ’ টাকা পেয়েছে। এত টাকা দিয়ে কী করবে? কেউই তো নেই আর–না গৃহ, না পরিবার। আহার-পরিচ্ছদের দরকার নেই। এমনকি বাঁচবার পর্যন্ত ইচ্ছে নেই। কী করবে হরিদাস অত টাকা দিয়ে! ভাবতে ভাবতে নয়াদিল্লি আর পুরনো দিল্লির পথে পথে ঘুরে বেড়াতে থাকে সে।
কনট প্লেস থেকে চাঁদনি চক। চাঁদনি থেকে জামে মসজিদ। মসজিদের সরু সরু মিনার। সাদা গম্বুজের ওপর নজর পড়লে ফের জেগে ওঠে প্রতিহিংসার সঙ্কল্প। মুসলমানদের বিরুদ্ধে, গোটা মুসলিম সমাজের বিরুদ্ধে। জামে মসজিদ থেকে দরিয়াগঞ্জ–তারপর রাজঘাট। এমনকি রাজঘাটে মহাত্মা গান্ধীর সমাধিও তার মন থেকে প্রতিহিংসার অগ্নিশিখা নির্বাপিত করতে পারে না।
গান্ধীজী মহাত্মা ছিলেন। ঋষি। কিন্তু আমি যে সাধারণ লোক। তিনি পারেন শত্রুকে ক্ষমা করতে, আমি পারি না।
সেখান থেকে এডওয়ার্ড পার্ক। পার্কে রাজার পাথরের মূর্তি। ঘোড়ার পিঠে বসে রয়েছে।
: বাহ্, হুজুর বাহ্। চলে তো গেলে, এদিকে আমাদের ঠেলে দিলে এক মৃত্যুঘাতী দুর্দশায়।
ততক্ষণে রাত হয়ে গেছে। ঘুরতে ঘুরতে সে একটা অচেনা জায়গায় এসে পড়ল। তারই মতো অসংখ্য বাস্তুত্যাগী ঘুমোচ্ছে পাকা রাস্তার ওপর। বাতাসের সঙ্গে মিশে রয়েছে ভারি তীব্র গন্ধ। সেন্ট, ঘাম, ভ্যাপসা মাটি, প্রস্রাব, ফুল, ফিনাইল, পেট্রোলের গন্ধ। বাঁ ধারে একসার দোকান। মিঠাইয়ের দোকান, দুধের দোকান। হোটেল এখনও খোলা রয়েছে। বাকিগুলো বন্ধ। প্রতিটি পথিকের দৃষ্টি একতলার আলোকিত ব্যালকনিতে নিবদ্ধ। আলোয় উজ্জ্বল রশ্মিতে আমন্ত্রণের পত্ররেখা। বায়ুতরঙ্গের ছন্দে সঙ্গীত ঝঙ্কার। জায়গাটা?
: বাবুজি!
আচমকা সম্বোধন। একটা লোক, তার তির্যক দৃষ্টিতে প্রশ্ন।
: বাবুজি হুকুম করেন তো খাশা চিজ দেখাতে পারি।
