একদিন সকালে খবর এল যে, দিল্লিতে মুসলিম গণহত্যা শুরু হয়ে গেছে। কুরলবাগ এলাকায় মুসলমানদের বহু বাড়ি-ঘর ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে। চাঁদনি চকে মুসলমানদের দোকানপাট লুণ্ঠন করে তাদের পাইকারিভাবে হত্যা করা হয়েছে। এটা। হল কংগ্রেসের হিন্দু-রাজত্বের নমুনা। যাক সে কথা। আমি ভাবলাম নয়াদিল্লি তো বহুকাল ধরে ইংরেজদের শহর ছিল–লর্ড মাউন্টব্যাটেন, কমান্ডার-ইন-চিফ এখানে থাকেন। অন্ততপক্ষে তারা মুসলমানদের ওপর এ-ধরনের অত্যাচার হতে দেবেন না। এটা ভেবে আমি নিজের অফিসের পথে পা বাড়ালাম। সেদিন আমার প্রভিডেন্ট ফান্ডের। হিসাব হওয়ার কথা। আসলে এ-কারণেই আমি পাকিস্তানে যেতে দেরি করছিলাম। গোল মার্কেটের কাছে পৌঁছতেই অফিসের একজন হিন্দু বাবু বললেন, এ কী করছ, যাও, যাও বাসায় যাও, বাইরে বেরিয়ো না। কনট প্লেসে দাঙ্গাকারীরা মুসলমানদের মেরেছে। এ-কথা শুনে আমি বাসায় ফিরে এলাম।
বাসার সামনে আসতেই সর্দারজির সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। তিনি বললেন, শেখজি, চিন্তা করবেন না। আমি যতক্ষণ সহি-সালামতে আছি, কেউ আপনাকে হাত লাগাতে পারবে না। আমি ভাবলাম, শিখের ওই দাড়ির আড়ালে কত শয়তানি লুকিয়ে আছে কে জানে। মনে-মনে খুব খুশি যে, মুসলমানদের পাইকারিভাবে নিধন করা হচ্ছে অথচ মৌখিক সহানুভূতি দেখিয়ে আমার প্রতি অনুগ্রহ প্রদর্শন করছে। আসলে আমাকে চটানোর জন্যেই এ-ধরনের কথা বলছে। কেননা এই এলাকায় আমিই একমাত্র মুসলমান।
কিন্তু আমি কাফেরদের কোনো অনুগ্রহের প্রত্যাশী নই। এটা ভেবে নিজের ঘরে এলাম। ভাবলাম যদি মরেও যাই দশ-বিশটাকে মেরে মরব। সোজা কামরায় প্রবেশ করে পালঙ্কের নিচে উঁকি দিলাম–সেখানে আমার দোলা শিকারি বন্দুক রয়েছে। দাঙ্গা শুরু হওয়ার পর থেকে আমি প্রচুর গুলি ও কার্তুজ সংগ্রহ করে রেখেছি। কিন্তু এ ক! পালঙ্কের নিচে বন্দুক নেই। সব কামরা তন্ন-তন্ন করে খুঁজেও বন্দুক পাওয়া গেল না।
হুজুর, আপনি কী খুঁজছেন। আমার অনুগত বিশ্বস্ত ভৃত্য মামদো জিজ্ঞেস করল।
আমার বন্দুক কোথায় গেল?
মামদো কোনো জবাব দিল না। কিন্তু তার মুখভাব বলে দিচ্ছিল, সে জানে বন্দুক কোথায় আছে। হয়তো সে কোথাও লুকিয়ে রেখেছে।
বলছিস-না কেন? আমি ধমক দিয়ে বললাম।
ধমক দেয়ায় জানা গেল–মামদো আমার বন্দুক চুরি করে তার বন্ধুদের দিয়েছে। ওরা দরিয়াগঞ্জে মুসলমানদের হেফাজতের উদ্দেশ্যে অস্ত্র সংগ্রহ করছে।
আমাদের কাছে কয়েকশ’ বন্দুক আছে হুজুর। সাতটি আছে মেশিনগান। দশটি রিভলবার। একটি তোপ। কাফেরদের ভুনা করে ফেলব। ভুনা।
আমি বললাম, দরিয়াগঞ্জে আমার বন্দুক দিয়ে কাফেরদের ভুনা করলে এখানে আমার আত্মরক্ষার উপায় কীভাবে হবে? আমি তো এখানে কাফেরদের দঙ্গলের মধ্যে আটকা পড়ে আছি। এখানে আমাকে ধুনো দেয়া হলে কে দায়ী হবে?
মামদোকে বললাম, কোনো-না-কোনোভাবে চুপিসারে তুমি দরিয়াগঞ্জে যাও। সেখান থেকে আমার জন্যে একটা বন্দুক এবং শ’ দুয়েক কার্তুজ নিয়ে এস।
মামদো চলে যাওয়ার পর আমার স্থির বিশ্বাস হল যে, সে আর ফিরে আসবে না।
এখন আমি বাসায় সম্পূর্ণ একাকী। সামনের কার্নিশে স্ত্রী ও ছেলে-মেয়েদের ফটো নীরবে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। সেদিকে তাকিয়ে আমার চোখে পানি এসে গেল। ভাবলাম তাদের সাথে আর দেখা হবে কিনা কে জানে।
পরে এটুকু ভেবে স্বস্তিবোধ করলাম যে, তারা তো অন্তত ভালোয়-ভালোয় পাকিস্তান পৌঁছে গেছে। আমি যদি প্রভিডেন্ট ফান্ডের লোভ না-করে আগেই চলে যেতাম তাহলে কী ভালোই-না হতো! এখন আর আফসোস করে কী হবে?
সাতশ্রী আকাল হর হর মহাদেব!
দূর থেকে কোরাসকণ্ঠের আওয়াজ ক্রমেই নিকটতর হচ্ছিল। এরা দাঙ্গাকারী। আমার মৃত্যু ঘনিয়ে এসেছে। আহত হরিণের মতো আমি এদিক-ওদিক তাকালাম। সেই আহত হরিণ গুলিবিদ্ধ হয়েছে, তার পেছনে লেগে আছে শিকারি কুকুর। আত্মরক্ষার আর কোনো উপায় নেই। কামরার দরজা পাতলা কাঠের তৈরি। ওপরের দিকে গ্রাস ফিট করা। আমি দরজা বন্ধ করে বসে থাকলেও দু’মিনিটের মধ্যেই দাঙ্গাকারীরা দরজা ভেঙে ভেতরে চলে আসবে।
সাতশ্রী আকাল হর হর মহাদেব–এ-আওয়াজ ক্রমেই নিকটতর হচ্ছিল।
হঠাৎ দরজায় করাঘাত হল। সর্দারজি ভেতরে প্রবেশ করে বললেন, শেখজি, তুমি আমাদের ঘরে চল। তাড়াতাড়ি কর। কিছু চিন্তা-ভাবনা না-করেই সর্দারজিকে অনুসরণ করলাম। পেছনের দিকের বারান্দায় আমাকে লুকিয়ে রাখা হল। মৃত্যুর গুলি শন করে আমার মাথার উপর দিয়ে চলে গেল। কারণ আমি সর্দারজির ঘরে প্রবেশ করার পর-পরই আমাদের বাসার সামনে এসে থামল একটা লরি। সে লরি থেকে দশ-পনেরো জন যুবক নামল। যুবকদের মধ্যে নেতা-গোছের একজনের হাতে টাইপ করা একটা কাগজে নামের তালিকা রয়েছে। ৮নং কোয়ার্টারে শেখ বোরহান উদ্দিন কাগজের উপর তাকিয়ে যুবনেতা উচ্চারণ করল। উচ্ছখল যুবকরা পরক্ষণে ঝাঁপিয়ে পড়ল আমার কোয়ার্টারে। আমার চেয়ার, টেবিল, সিন্দুক, বই-পুস্তক ইত্যাদি এমনকি আমার ময়লা জামা-কাপড় সবকিছু লরিতে নিয়ে তোলা হয়।
.
ডাকাত!
লুটেরা!
দস্যু!
ভাবলাম সর্দারজি বাহ্যিক সহানুভূতি দেখিয়ে আমাকে যে এখানে নিয়ে এলেন তিনিই কি কম লুটেরা? তিনি দাঙ্গাকারীদের বললেন, থামো, থামো, এ-ঘরের ওপর আমার অধিকার বেশি রয়েছে। এ-লুণ্ঠনে অংশ নেয়ার অধিকার আমারও পাওয়া দরকার। এ-কথা বলেই তিনি নিজের ছেলে-মেয়েদের ইঙ্গিত করলেন। তারাও লুণ্ঠনে প্রবৃত্ত হল। কেউ প্যান্ট নিয়ে গেল, কেউ স্যুটকেস, কেউ আমার স্ত্রী ও ছেলেমেয়েদের ছবি। এসব গনিমতের মাল সোজা অন্দরমহলে চলে যাচ্ছে।
