একদিন ওরা অসহায়দের সাহায্যের জন্য অমৃতসর যাচ্ছিল; সড়কের উপর ‘ছেরাট্রার কাছে একটি তরুণীকে দেখতে পেল তারা। ট্রাকের শব্দ শুনে ভীত-সন্ত্রস্ত মেয়েটি পালিয়ে যেতে শুরু করল। স্বেচ্ছাসেবকরা গাড়ি থামিয়ে মেয়েটির পিছু ধাওয়া করল। কিছুদূর যাওয়ার পর মেয়েটাকে পাকড়াও করল একটি ক্ষেত থেকে। মেয়েটি সুন্দরী; ডান গালে মোটা কালো তিল। একজন স্বেচ্ছাসেবী প্রশ্ন করল, ভয় পেয়ো না, তোমার নাম কি সকিনা? মেয়েটির চেহারা ফ্যাকাশে হয়ে গেল। একটি বাক্যও তার মুখ দিয়ে বের হল না। স্বেচ্ছাসেবকরা ভরসা দিলে মেয়েটির ভয় দূর হল এবং স্বীকার করল সে সিরাজউদ্দিনের মেয়ে সকিনা।
আটজন স্বেচ্ছাসেবী যুবক তার জন্য অনেক কিছু করল। তাকে দুধ ও রুটি খেতে দিল, ট্রাকে তুলে নিল তারপর। দো-পাট্টার অভাবে সকিনা বারবার বাহু দিয়ে বুক ঢাকবার চেষ্টা করছিল দেখে একজন যুবক কোট খুলে সকিনাকে পরতে দিল।
বেশ কয়েকদিন কেটে গেছে। সিরাজউদ্দিন সকিনার কোনো সংবাদ পায়নি। সারাদিন ক্যাম্পে এবং বিভিন্ন অফিসে ঘুরঘুর করছে সে। কিন্তু কোনো খোঁজই পায়নি মেয়েটির। রাত গম্ভীর হলে সে স্বেচ্ছাসেবক দলটির সাফল্যের জন্য প্রার্থনা করল। বেঁচে থাকলে তারা তার মেয়েকে ফিরিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
একদিন সিরাজউদ্দিন স্বেচ্ছাসেবক দলটিকে ট্রাকে দেখতে পেল। ট্রাক তখন ছেড়েই। দিয়েছে; সে দৌড়ে গিয়ে তাদের কাছে জিজ্ঞেসা করল, বাবারা আমার, সকিনার কোনো খোঁজ পেয়েছ?’ তারা ট্রাক থামিয়ে সমস্বরে বলল, ‘চিন্তা কর না। চিন্তা কর না, পাওয়া যাবেই।’ ট্রাক ছেড়ে দিল।
সিরাজউদ্দিন আবার এই যুবকদের সাফল্যের জন্য মোনাজাত করল। এর ফলে তার মনটা অনেকখানি হাল্কা বোধ হল।
ক্যাম্পে সিরাজউদ্দিন বসে ছিল। পাশেই শোনা গেল কিসের হট্টগোল। চার জন লোক কী জানি বহন করে আনছে। জিজ্ঞাসার পর জানতে পারল, রেললাইনের ধারে অজ্ঞান অবস্থায় একটি মেয়ে পাওয়া গেছে। ওরা তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছে। সিরাজউদ্দিন তাদের পিছু পিছু হাসপাতালে গিয়ে হাজির হল। লোকগুলো হাসপাতালের ইমার্জেন্সি ওয়ার্ডে মেয়েটিকে ন্যস্ত করে চলে গেল।
বাইরে লাইটপোস্টে হেলান দিয়ে সিরাজউদ্দিন কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। তারপর ধীরে-ধীরে হাসপাতালের ভেতরে গেল; কামরায় কেউ নেই। একটি স্ট্রেচারে মেয়েটির অচৈতন্য দেহ পড়ে আছে। হঠাৎ ঘরের বাতি জ্বলে উঠল। প্রাণহীন বিবর্ণ ডান গালে তিল দেখে সিরাজউদ্দিন চিৎকার করে উঠল সকিনা…।’
যে ডাক্তার ঘরে বাতি জ্বালিয়েছিলেন তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, কী ব্যাপার?’ উদ্বেলিত কণ্ঠে সিরাজ বলল, আমি… আমি ওর বাবা।
ডাক্তার স্ট্রেচারে শায়িতা মেয়েটির নাড়ি পরীক্ষা করে দেখলেন এবং সিরাজউদ্দিনকে নির্দেশ দিলেন, জানালা খুলে দাও। স্ট্রেচারে শায়িতা প্রাণহীন দেহ কেঁপে উঠল। কম্পিত হাতে ধীরে-ধীরে সে তার শওয়ারের দড়ির গিট খুলে নিচের দিকে নামিয়ে দিল।
বৃদ্ধ সিরাজউদ্দিন আনন্দে চিৎকার করে উঠল ‘ও বেঁচে আছে… আমার মেয়ে বেঁচে আছে। এই দৃশ্য দেখে ডাক্তারের আপাদমস্তক ঘামে ভিজে একাকার।
সর্দারজি – খাজা আহমদ আব্বাস।
খোদ দিল্লি আর তার আশপাশে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা চরমে উঠলে মুসলমানদের রক্তের কোনো মূল্য রইল না। আমি ভাবলাম, কী দুর্ভাগ্য! প্রতিবেশী প্রায় সবাই শিখ। ওদের প্রাণ বাঁচানোর চেষ্টা করব কি নিজের পেটেই কখন ছুরি চেপে বসে সেই ভয়ে সময় কাটতে লাগল। সত্যি কথা বলতে কি, শিখদের আমি খুব ভয় পাই, ঘৃণাও করি কিঞ্চিৎ। আমার মনে হয় ওরা এক অদ্ভুত জানোয়ার। এই মনে হওয়া সেই আমার ছোটবেলা থেকেই। তখন আমার বয়স বছর ছয়েক। একদিন এক শিখকে রোদে বসে চুল আঁচড়াতে দেখে চিৎকার করে উঠেছিলাম, দেখ, দেখ–মেয়েমানুষের মুখে কত লম্বা-লম্বা দাড়ি। বয়স বাড়ার সঙ্গে-সঙ্গে এই বোধ কেমন এক ধরনের ঘৃণায় রূপান্তরিত হয়। এই বোধটির অবশ্য পেছনে রয়েছে ১৮৫৭ সালের তিক্ত স্মৃতির স্মরণ। সে-সময় হিন্দু-মুসলমানের যৌথ স্বাধীনতা সংগ্রাম দমন করার জন্য পাঞ্জাবের শিখরাজ আর তাদের সেনাবাহিনী ফিরিঙ্গিদের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেছিল। এই কারণে একটা অস্পষ্ট ভীতি ও এক অদ্ভুত ধরনের ঘৃণা কেবল শিখ নয়, ইংরেজদের প্রতিও পোষণ করতাম। তবে শিখ-ঘৃণাটাই ছিল প্রবল; অন্যদিকে ইংরেজদের ভয় পেলেও তাদের প্রতি কিছুটা প্রতিবোধও ছিল আমার। মনে-প্রাণে আমি ইংরেজদের মতো কোর্ট-প্যান্ট পরতে চাইতাম। চাইতাম ওরা যেমন শ্লীলতাবোধশূন্য কথা-বার্তা চালিয়ে যায় সেভাবে। কথাবার্তা বলতে। তাছাড়া ওরা ছিল শাসক, আমিও চাইতাম ছোটখাটো একজন শাসক হতে। ওদের মতো কাটা-ছুরি-চামচ দিয়ে খাবার খাওয়ার প্রতি আমার আগ্রহ ছিল খুব যাতে পৃথিবীর মানুষ আমাকেও কিছুটা সভ্যভব্য ভাবে। কিন্তু শিখদের যে ভয় করতাম সেটা ছিল অনেকটাই অবজ্ঞা-মিশ্রিত। অদ্ভুত সৃষ্টি এই শিখ–যারা পুরুষ হয়েও চুল রাখে মেয়েমানুষের মতো। ইংরেজি ফ্যাশনের অনুকরণে মাথার চুল ছোট অবশ্য আমি পছন্দ করি না–সেটা ভিন্ন কথা। আব্বা বলতেন, প্রতি শুক্রবার যেন মাথার চুল ছাঁট করি; তাহলে মাথায় খুস্কি হতে পারবে না। কিন্তু আমি সে কথা না-শুনে চুল এমন বড় করে রাখতাম যাতে তা হকি ও ফুটবল খেলার সময় ইংরেজ খেলোয়াড়দের মতো বাতাসে ওড়ে। আব্বা বলতেন, একি! তুই যে মেয়েদের মতো চুল লম্বা রেখেছিস! কিন্তু আব্বা তো পুরনো চিন্তাধারার মানুষ, তার কথা কে শোনে। তিনি তো পারলে ছোটবেলাতেই আমাদের মুখে দাড়ি গজিয়ে দেন। ও হ্যাঁ, মনে পড়ল, শিখদের আর একটা অদ্ভুত নিদর্শন হল তাদের দাড়ি। আমার দাদার দাড়ি ছিল কয়েক ফুট লম্বা। তিনি সে দাড়িতে চিরুনি ব্যবহার করতেন। কিন্তু দাদাজানের ব্যাপার ভিন্নতম। যতকিছুই হোক তিনি আমার দাদাজান, আর শিখরা শিখ।
