‘আরে, তুই একেবারে উল্লুকের বাচ্চা… বদমায়েশ মাগীটাকে বাইরে বার করে দিসনি কেন?
‘না হুজুর, এ কি কখনো হতে পারে?’ রামঅওতার হে-হে করছিল।
‘কেন রে?’
হুজুর, আড়াইশ’-তিনশ’ টাকা আবার একটা বিয়ের জন্য কোথা থেকে আনব? আর ভাই-বেরাদারিকে খাওয়াতে একশ-দু’শ’ টাকা খরচা হয়ে যাবে…’
‘কেন রে, বেরাদারিকে কেন তোর খাওয়াতে হবে? বউয়ের বদমায়েশির জরিমানা কেন তোকে দিতে হবে?
তা আমি জানি না, হুজুর। আমাদের সমাজে এই রকমই হয়ে থাকে…’
‘কিন্তু ছেলেটা তোর নয়, রামঅওতার … ঐ হারামি রতীরামের।’ বাবা রেগে গিয়ে বোঝালেন।
তাতে কী হয়েছে, হজুর…রতীরাম আমার ভাইয়ের মতো–… অন্য কেউ তো নয়… নিজেরই রক্ত সম্পর্কের…
তুই একেবারে উলুকের বাচ্চা।’ বাবা খচে গিয়েছিল।
হুজুর, ছেলেটা বড় হয়ে আমার কাজ গুছিয়ে নেবে।’
রামঅওতার সবিনয়ে বোঝাল, ‘সে দুহাত লাগাবে, তখন বুড়ো বয়সের ভার কমে যাবে…’
রামঅওতারের মাথা লজ্জায় ঝুঁকে পড়ল। আর কে জানে কেন একদম রামঅওতারের সঙ্গে-সঙ্গে বাবার মাথাও ঝুঁকে গেল–যেন তার কাঠামোর ওপর লাখ-লাখ কোটি-কোটি হাত ছেয়ে গেল…এই হাতগুলো পাপপঙ্কিল নয়, শুদ্ধ। এ তো সেই জয়ী–সংগ্রামী হাত যা দুনিয়ার মুখ থেকে ময়লা ধুয়ে নিচ্ছে। তার বুড়ো বয়সের বোঝা তুলছে।
এই মাটিতে লেগে-থাকা কচি-কচি কালো হাত ধরিত্রীর সিথিতে সিঁদুর লাগিয়ে দিচ্ছে।
খুলে দাও – সাত হাসান মান্টো
অমৃতসর থেকে স্পেশাল ট্রেনটি দুপুর দু’টায় রওনা হয়ে আট ঘণ্টা পর মোঘলপুরা পৌঁছে। পথে কয়েকজন যাত্রী ক্রমাগত ট্রেনে হামলার ফলে প্রাণ হারায়; বহু যাত্রী হতাহত হয়। কিছুলোক দুষ্কৃতকারীদের হামলা থেকে কোনোমতে পালিয়ে আত্মরক্ষা করে।
পরদিন সকাল ১০টা। আশ্রয়-শিবিরের ভিজে মাটিতে চোখ মেলে সিরাজউদ্দিন। চারদিকে অসংখ্য নারী-পুরুষ-শিশুদের ভিড় আর জনতার সমুদ্র দেখে তার চিন্তাশক্তি আরও শিথিল হয়ে পড়ে। অনেকক্ষণ সে এক-দৃষ্টিতে ধূসর আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে। উদ্বাস্তু শিবিরের হৈ-হল্লা কিছুই সিরাজউদ্দিনের কানে যায় না। তার স্মৃতিশক্তি বিলুপ্ত। কেউ তাকে দেখলে গভীর চিন্তায় মগ্ন বলে মনে করবে কিন্তু আসলে তা নয়; সে চারদিকের কোলাহলময় পরিবেশ সম্পর্কে সচেতন অথচ সবকিছু যেন শূন্যে খেই হারিয়ে যাচ্ছে।
মেঘলা আকাশের দিকে উদাস দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে সিরাজউদ্দিন; সূর্যের আলোর সঙ্গে চোখাচোখি হতেই তার দেহের অনুভূতিগুলো পুনঃসজীব ওঠে আর ফিরে আসে তার স্মৃতিশক্তি। তার চোখের সামনে দাঙ্গা, লুটতরাজ, আগুন, হুড়োহুড়ি, দৌড়, স্টেশন, গোলাগুলি অন্ধকার রাত্রি এবং মেয়ে সকিনা প্রভৃতি চিত্র একের পর এক ভেসে ওঠে। মুহূর্তে সিরাজউদ্দিন উঠে দাঁড়ায় এবং পাগলের মতো চারদিকে ইতস্তত জনতার ভিড়ে ঘুরতে থাকে।
তিন ঘণ্টা যাবৎ ‘সকিনা’ ‘সকিনা’ নাম ধরে ডেকে-ডেকে শিবিরে তোলপাড় করে চষে বেড়ায় সে। কিন্তু একমাত্র কন্যা সকিনার কোনো সন্ধান মেলে না। চারদিকে বিশৃঙ্খলা। কেউ তার সন্তানকে খুঁজছে, কেউ খুঁজছে মা, কেউ স্ত্রী বা কন্যাকে। সিরাজউদ্দিন পরাজিত ও ক্লান্ত-শ্রান্ত হয়ে বসে পড়ে। কোথায় সে সকিনাকে হারিয়েছে তা স্মরণ করার চেষ্টা করে। তার স্ত্রীর মৃত্যুর ক্ষণটির কথা মনে পড়ে,–তার পেটের নাড়িভুড়ি বের হয়ে গিয়েছিল। এর বেশি সে ভাবতে পারে না।
সকিনার মা মারা গেছে। সে সিরাজউদ্দিনের চোখের সামনে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছে। কিন্তু সকিনা কোথায়? মৃত্যুযন্ত্রণায় কাতর সকিনার মা মিনতি করেছে, আমার আশা ত্যাগ কর। সকিনাকে নিয়ে তাড়াতাড়ি এখান থেকে পালিয়ে যাও।’
সকিনা তার সঙ্গেই ছিল। দু’জনেই নগ্নপায়ে প্রাণ হাতে নিয়ে পালাচ্ছিল। সকিনার ওড়না পড়ে গিয়েছিল মাটিতে। সিরাজউদ্দিন কুড়োতে গেলে সকিনা চিৎকার করে উঠেছিল, আব্বা, ওটা ছেড়ে দিন…।’ কিন্তু সে তবুও তা কুড়িয়ে নিয়ে কোটের পকেটে রেখেছিল। এ-সব কথা ভাবতে গিয়ে সে ধীরে-ধীরে পকেট থেকে সকিনার ওড়নাটা বের করে। এটা সকিনারই ওড়না; কিন্তু সে কোথায়?
সে শ্রান্ত স্মৃতিশক্তির ওপর অনেক চাপ দিয়েও কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারল না। সে কি সকিনাকে তার সঙ্গে স্টেশন পর্যন্ত এনেছিল? তারা কি ট্রেনে উঠেছিল একসঙ্গে? পথে ট্রেন থেমেছে? গুণ্ডারা হামলা চালিয়েছে?
তার অজ্ঞান হয়ে পড়ে থাকার সময় কি গুণ্ডারা সকিনাকে নিয়ে গেছে? মনে তার অনেক প্রশ্নের ভিড় জমে; কিন্তু তার কোনো জবাব পায় না সে।
তার সান্ত্বনার দরকার। কিন্তু চারদিকে হাজারো মানুষের প্রয়োজন একটি জিনিস, তা হল সান্ত্বনা। কে কাকে সান্ত্বনা দেবে? সিরাজউদ্দিন কাঁদতে চেষ্টা করেছে। কিন্তু হতভাগ্য চোখদুটি তাকে সাহায্য করে না। অশ্রু যেন শুকিয়ে গেছে।
ছয়দিন পর সিরাজের বোধশক্তি কিছুটা ফিরে আসে। এমন কয়েকজন লোকের সঙ্গে দেখা করে সে যারা তাকে সাহায্য করতে পারে; এরা আটজন যুবক। তাদের কাছে বন্দুক ও ট্রাক আছে। সিরাজউদ্দিন তাদের হাজার-হাজার আশীর্বাদ জানিয়ে সকিনার আকৃতি বর্ণনা করে, দেখতে ফর্সা, খুবই সুন্দরী, মায়ের সঙ্গে চেহারার মিল আছে… বয়স সতের’র কাছাকাছি, ডাগর-ডাগর চোখ… ডান গালে বড় একটি তিল… আমার একমাত্র কন্যা। ওকে খুঁজে দিলে খোদা তোমাদের মঙ্গল করবেন।’ তরুণ স্বেচ্ছাসেবকরা আবেগভরে বৃদ্ধকে আশ্বাসবাণী শোনায়, যদি তোমার মেয়ে বেঁচে থাকে, তাহলে কয়েকদিনের মধ্যে তাকে উদ্ধার করে তোমার কাছে হাজির করবই।’
