ম্যাট্রিক পাস করার পর আমাকে পড়ালেখার জন্যে আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠানো হয়। কলেজে যে-সব পাঞ্জাবি ছেলে পড়ত আমরা অর্থাৎ দিল্লি ইউপির ছেলেরা তাদেরকে নীচ, মূর্খ এবং বখাটে মনে করতাম। ওরা কথা বলার নিয়মও জানত না। পানাহারের মধ্যেও কোনো রুচিজ্ঞান ছিল না। সভ্যতা-সংস্কৃতি সম্পর্কে তাদের কোনো ধারণাই ছিল না। একগুঁয়ে অভদ্রের একশেষ। লাসসির বড়-বড় গ্লাস সাবাড়কারীরা কেওড়াদার ফালুদা ও সিফটন চায়ের স্বাদ কী বুঝবে! তাদের ভাষা নিতান্ত অমার্জিত। কথা বলার সময় মনে হয় যেন ঝগড়া করছে। কথায়-কথায় তুই-তোকারি এই-সেই। আমি সব সময় এসব পাঞ্জাবিদের এড়িয়ে চলতাম। কিন্তু আমাদের ওয়ার্ডেন সাহেব খোদা তার মঙ্গল করুন–হঠাৎ করেই আমার কামরায় একজন পাঞ্জাবি ছাত্রকে জায়গা। দিলেন। আমি ভাবলাম, কী আর করা, একত্রে যখন থাকতে হবে কিঞ্চিৎ ভাব পাতিয়েই থাকা যাক। এভাবে থাকতে গিয়ে কয়েকদিনের মধ্যে তার সঙ্গে বেশ ঘনিষ্ঠতাই গড়ে উঠল। তার নাম গোলাম রসুল। রাওয়ালপিন্ডিতে বাড়ি। বেশ রসিক ছেলে। আমাকে প্রায়ই চুটকি শোনাত।
আপনারা এখন বলবেন, সর্দার সাহেবের কথা শোনাতে গিয়ে আবার এই গোলাম রসুল কোথা থেকে এসে পড়ল। কিন্তু আসলে এ কাহিনীর সঙ্গে গোলাম রসুলের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। কথা হচ্ছে যে, গোলাম রসুল যে-সব চুটকি শোনাত সেগুলো প্রায়ই শিখদের সঙ্গে সম্পর্কিত। সেসব চুটকি শুনে-শুনে শিখদের স্বভাব-চরিত্র রুচি-বৈশিষ্ট্য ও সামগ্রিক চরিত্র সম্পর্কে আমি যথেষ্ট জ্ঞান লাভ করেছিলাম।
যেমন ধরুন গোলাম রসুল বলত, সব শিখই বেকুব এবং বুন্ধু। দুপুর বারোটা বাজলেই তাদের বিবেকবুদ্ধি লোপ পেয়ে যায়। এ-সম্পর্কে অনেক উদাহরণ দেয়া যায়। যেমন একজন সর্দারজি সাইকেলে আরোহণ করে দুপুর বারোটায় অমৃতসরের হল বাজার দিয়ে যাচ্ছিল। চৌরাস্তায় একজন শিখ কনস্টেবল তাকে থামিয়ে জিজ্ঞেস করল তোমার সাইকেলের লাইট কোথায়? সাইকেল আরোহী সর্দারজি বিনয়ে বিগলিত কণ্ঠে বলল, জমাদার সাহেব, এই একটু আগে নিভে গেছে। বাড়ি থেকে তো জ্বালিয়েই বেরিয়েছিলাম! কনস্টেবলটি তখন সর্দারজিকে থানায় চালান দেয়ার হুমকি দিল।
অন্য একজন পথচারী শুভ্র-শ্মশ্রু শিখ সর্দারের মধ্যস্থতা করে বললেন, যাও ভাই, গোলমাল কর না। লাইট যদি নিভে গিয়ে থাকে এখন জ্বালিয়ে নাও, ব্যস।
এ ধরনের বহু গল্প গোলাম রসুলের জানা ছিল। পাঞ্জাবি ভাষার সংমিশ্রণে সে যখন এসব গল্প শোনাত তখন হাসতে-হাসতে আমাদের পেটে খিল ধরে যেত। আসলে পাঞ্জাবি ভাষায়ই সে-সব গল্প শুনে মজা পাওয়া যেত। কারণ, শিখদের অদ্ভুত ও উদ্ভট তৎপরতা বর্ণনা করার জন্যে পাঞ্জাবির মতো উটকো ভাষাই ছিল মানানসই।
সে থাকগে। অন্যের চালচলন নিয়ে আমাদের মাথাব্যথা করে লাভ নেই! কিন্তু শিখদের সবচেয়ে বড় দোষ হল ওরা ঔদ্ধত-হঠকারিতা-মারদাঙ্গা করে মুসলমানদের মোকাবেলা করতে সাহস দেখাত। এখন তো পৃথিবী জেনেই গেছে যে, একজন মুসলমান দশজন হিন্দু বা শিখের সমান। কিন্তু মুসলমানদের এ শক্তিমত্তা তারা স্বীকার করত না। তারা কৃপাণ ঝুলিয়ে গোঁফে এমনকি দাড়িতে তা দিয়ে চলত। গোলাম রসুল বলত, ওদেরকে একদিন আমরা এমন শিক্ষা দেব যে, জীবনভর মনে থাকবে।
কলেজ ছাড়ার পর কয়েক বছর কেটে গেল। ছাত্র থেকে ক্লার্ক, ক্লার্ক থেকে হেড ক্লার্ক পদে উন্নীত হলাম। আলিগড় ছাত্রাবাস ছেড়ে নয়াদিল্লিতে একটা সরকারি কোয়ার্টারে থাকি। বিয়ে হয়ে গেছে, ছেলে-মেয়েও হয়েছে। রাওয়ালপিন্ডি থেকে বদলি হয়ে আমার মুখোমুখি কোয়ার্টারে একজন শিখ সর্দার এসে উঠলে বহুদিন পর গোলাম রসুলের কথা আমার মনে পড়ল। গোলাম রসুলের ভবিষ্যদ্বাণী অনুযায়ী রাওয়ালপিভিতে শিখদের আচ্ছাসে ধোলাই দেয়া হয়েছে। মুজাহিদরা শিখদের নির্মূল অভিযান শুরু করেছিল। শিখরা সেখানে দারুণ দাপট দেখাচ্ছিল, মুসলমানদের সামনে সেসব দাপট টেকেনি। দাড়ি কামিয়ে অনেক শিখকে মুসলমান করা হয়েছে, অনেককে খত্না করিয়ে দেয়া হয়েছে জোর করে। হিন্দুদের সংবাদপত্রে মুসলমানদের দুর্নাম রটানোর জন্যে লেখা হচ্ছিল যে, মুসলমানেরা, শিখ নারী ও শিশুদেরকেও হত্যা করেছে। অথচ এটা ইসলামি ঐতিহ্য পরিপন্থী। মুসলিম মুজাহিদরা কখনো নারী ও শিশুদের ওপর হাত তোলেনি। হিন্দুদের সংবাদপত্রে যেসব শিখ নারী ও শিশুর ছবি ছাপা হয়েছে সেগুলো ছিল হয় জাল ছবি অথবা শিখরা মুসলমানদের দুর্নাম রটানোর জন্যে নিজেরাই নিজেদের নারী ও শিশুকে হত্যা করে পত্রিকায় ছেপেছিল। রাওয়ালপিন্ডি এবং পশ্চিম পাঞ্জাবের মুসলমানদের এ অপবাদও দেয়া হচ্ছিল যে, তারা হিন্দু ও শিখ মেয়েদের অপহরণ করেছে। অথচ ঘটনা এই যে, মুসলমানদের বীরত্ব দেখে শিখ মেয়েরা মুগ্ধ ও অভিভূত হয়ে তাদের সঙ্গে চলে গেছে। এমতাবস্থায় ওরা যদি মুসলমানদের সঙ্গে স্বেচ্ছায় পালিয়ে যায় তাতে মুসলমানদের দোষটা কোথায়? তারা তো ইসলাম প্রচারের অংশ হিসেবেই সে সব মেয়েকে আশ্রয় দিয়েছে।
সে যাই হোক, শিখদের তথাকথিত বীরত্বের চেহারা এখন পাল্টে গেছে। এখন কৃপাণ বের করে মুসলমানদের হুমকি দেয়া দূরে থাক রাওয়ালপিন্ডি থেকে পালিয়ে আসা সর্দারের দুরবস্থা দেখে ইসলামের গৌরবে বুক ফুলে উঠল আমার।
