এমনি জনপ্রিয় মেথরানির পুত্রবধূ হঠাৎ একদিন লোকের চক্ষুশূল হয়ে গেল। চাপরাশিনি আর বাবুর্চিনির তো আরো অভিযোগ ছিল। আমাদের শান্ত-শিষ্ট বউদিদের মাথা তার ঢং দেখে থমকে যেত। আর যে-কামরায় তাদের স্বামীরা আছে সে-কামরা ঝাঁট দিতে যদি সে যেত, তাহলে তারা পড়িমরি করে বুক থেকে দুধের বাচ্চাদের মুখ সরিয়ে দৌড়ত সেখানে যাতে ঐ ডাইনি তাদের স্বামীদের ওপর টোটকা প্রয়োগ না করতে পারে!
গোরী যেন একটা মারকুটে লম্বা শিংওলা ষড়–যা এখানে-ওখানে দিব্যি ছুটে বেড়াত। মেয়েরা তাকে দেখলে নিজ-নিজ কাঁখের বাসন-গামলা দুই হাতে সামলে চেপে ধরত বুকে। আর যখন সে হাল্কা কোমল চেহারা নিয়ে ঘুরে বেড়াত তখন পেছন-মহলের মহিলাদের এক হঠাৎ গড়ে-ওঠা প্রতিনিধি-মণ্ডল এসে হাজির হত। মায়ের দরবারে খুব চেঁচামেচি হত, ভাবী বিপদ আর তার সাংঘাতিক ফলাফল নিয়ে হত তর্কবিতর্ক। পতিরক্ষার জন্য এক কমিটি বানানো হয়েছিল তার কারণে, যাতে সব বউদিরা হৈ-চৈ করে ভোট দিল। মাকে দেয়া হয়েছিল ওই সমিতির সম্মানিত প্রধানের পদ। সব মহিলা নিজ-নিজ পদের মর্যাদা অনুযায়ী পিড়ি আর পালঙ্কের কিনারে বসল। পানের দোনা ভাগ করে দেয়া হল তাদের আর ডেকে পাঠানো হল বুড়িকে। বাচ্চাদের মুখে মাই দিয়ে সভায় নিস্তব্ধতা রক্ষা করা হল। পেশ করা হল মোকদ্দমা। আমাদের মা খুব রোয়াবের কণ্ঠে বলেছিলেন, কী রে চুড়েল! তুই বদমাশ বউকে কী এইজন্যে ছেড়ে রেখেছিস যাতে সে আমাদের বুকের উপরে শিল-নোড়া বাটে? তোর মতলবটা কী? মুখে কালি মাখাবি?’
মেথরানিও রেগে উঠল। ফেটে পড়ে বলল, ‘কী করব, বেগম সাহেবান? হারামখোরকে চার লাথি মেরে ছিলাম। রুটিও খেতে দিইনি; কিন্তু রাড়ি তো আমার কজায় নেই…’
.
‘আরে ওর কি রুটির কিছু কমতি আছে?’ বাবুর্চিনি ঢিল ছুড়ল। সাহারানপুরের খানদানি বাবুর্চি ঘরের মেয়ে সে, আবার তৃতীয় পক্ষের বিবি। আল্লার আশ্রয়, কেমন তেজ আর রাগ তার। অন্যদিকে চাপরাশিনি, মালিনী, ধোপানি–সবাই মোকদ্দমাকে আরো সঙিন করে তুলল। বেচারি মেথরানি বসে বসে সকলের লাথি-ঝাঁটা খেতে-খেতে নিজের চুলকানি-ভরা থলথলে গা চুলকাতে লাগল।
‘বেগম সাহেবান, আপনি যেমন বলবেন তেমন করতে দ্বিধা করব না। কিন্তু করব কী, মাগির গলা টিপে দেব?’
টেটিয়াকে শিক্ষা দেবার তীব্র অভিলাষে ঐ মহিলাদের মনে খুশির ঢেউ উঠছিল। আর সকলেরই মনে বুড়ির প্রতি সীমাহীন দরদ তখন…
মা রায় দিয়েছিলেন–মড়াটাকে ধরে বাপের বাড়িতে ছেড়ে দে।’
এ বেগম সাহেবান, এ কি কখনো হতে পারে?
মেথরানি জানিয়েছিল যে, বউ খালি হাতে আসেনি। সারা জীবনের কামাই পুরো দু’শ’ ফেললে তবে এই দামাল মাগী হাতে আসবে। বরং এই টাকায় দুটো গরু কেনা যাবে। অনায়াসে কলসিভরা দুধ দেবে। তখন এই রাড়িকে দুই লাথি দেয়া যাবে হয়তো। আর যদি গোরীকে বাপের বাড়ি পাঠিয়ে দেয়া যায় তাহলে এর বাপ খুব তাড়াতাড়ি অন্য মেথরের হাতে বেচে দেবে একে। সে তো কেবল ছেলের শয্যা-শোভা নয়। দুই হাতওয়ালা মেয়েমানুষ, যে চারটে পুরুষ মানুষের কাজ করে ফেলে। রামঅওতার। যাওয়ার পর থেকে বুড়ি এত কাজ সামলাতে পারে না। এই বুড়ো বয়সে বউয়ের দুই হাতের সাহায্য নিয়েই চলছে তার।
মহিলারা কেউ অবুঝ নয়। মামলা সামাজিক চালচলন থেকে সরে এসে আর্থিক বাস্তব অবস্থার ওপর দাঁড়িয়ে গেল তখন। সত্যি কথাই, বুড়ির জন্যে বউটা থাকাই দরকার। কার এমন দিল আছে দু’শ’ টাকা ফেলে দেবে। এই দু’শ টাকা ছাড়াও বিয়েতে বেণের কাছ থেকে নিয়ে খরচ করেছে, লোকজন খাইয়েছে। বেরাদরিকে রাজি করিয়েছে। এই সমস্ত খরচ আসবে কোথা থেকে। রামঅওতার যে বেতন পায় তা তো ধার শুধতেই বেরিয়ে যায়। এমন মোটা-তাজা বউ এখন তো চারশ’ টাকার কমে পাওয়া যায় না। পুরো সাফাইয়ের কাজের পর আশপাশের আরো চার কুঠিতে কাজ করে গোরী। মাগী কাজে চৌকস।
মা শেষ সওয়াল দিয়ে দিলেন–যদি ঐ লুচ্চির জলদি-জলদি কোনো ব্যবস্থা না-কর তো কুঠির হাতায় থাকতে দেওয়া হবে না…’
বুড়ি অনেক চেঁচামেচি করল আর ফিরে গিয়ে প্রাণ ভরে অনেক গালি দিল বউকে। চুল ধরে মারলও। বউ তার কেনা-বউ। সে পিটতে থাকল, হড়বড় করে বকতে থাকল তারপর একদিন সে সব চাকরদের ঘর তছনছ করে দিল প্রতিশোধ হিসেবে। বাবুর্চি, ভিশৃতি, ধোপা আর চাপরাশিরা নিজ-নিজ বউদের ধরে-ধরে খুব পিটল। এবারও মেথরানি বউয়ের মামলায় আমার সভ্যা বউদির দল ও সম্ভ্রান্ত ভাইদের মধ্যে খচাখচি হয়ে গেল আর বউদিদের বাপের বাড়িতে তার পাঠানো হতে থাকল। ফলে বউরা প্রতি ঘরে সই-পাখির কাটা হয়ে গেল।
দু-চারদিন পরে বুড়ি মেথরানির দেওরের ছেলে রতীরাম আপন জেঠিমার সঙ্গে দেখা করতে এসে ওখানেই থেকে গেল। দু’-চারটে কুঠিতে কাজ যা বেড়ে গিয়েছিল তা সে সামলে দিল। নিজের গায়ে তো নিষ্কর্মা হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছিল। তার বউ এখনো নাবালিকা, এ-কারণে দ্বিরাগমন হয়নি।
রতীরাম আসায় মৌসুম উল্টে-পাল্টে একেবারে বদলে গেল; যেমন হাওয়ার দমকের সঙ্গে ঘন মেঘের দল চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। বউকে বলে-বলে সবাই চুপ হয়ে গিয়েছিল। কাঁসার কাকন মূক হয়ে গিয়েছিল। যেমন বেলুন থেকে হাওয়া বেরিয়ে গেলে সেটা চুপচাপ ঝুলতে থাকে তেমনভাবে বউয়ের ঘোমটা ঝুলতে-ঝুলতে নিচের দিকে বেড়েই চলল। এখন সে নাকে দড়ি-না-বাধা বলদের বদলে একেবারে লজ্জাবতী বধূ। পেছন-মহলের সব মহিলা সান্ত্বনার নিঃশ্বাস ফেলল। স্টাফের পুরুষরা তাকে খোঁচা দিলে সে লজ্জাবতী লতার মতো নুয়ে থাকত, আর কেউ বেশি চোখ মারলে সে ঘোমটার মধ্যে থেকে অশ্রু-ভেজা চোখের তেরছা নজরে রতীরামের দিকে দেখত, আর দৌড়ে বাহু চুলকাতে-চুলকাতে রতীরামের সামনে এসে দাঁড়িয়ে যেত।
