বুড়ি শান্ত হয়ে দেউড়িতে বসে আধ-খোলা চোখে এই মিলনান্ত নাটক দেখতে দেখতে গুড়গুড়িতে টান দিত। চারদিকেই শীতল শান্তি ছেয়ে গিয়েছিল–যেন সব ফেঁড়া থেকে পুঁজ বেরিয়ে গেছে।
এদিকে বউয়ের বিরুদ্ধে এক নতুন দল তৈরি হল আর তাতে যোগ দিল শার্গিদ-পেশার পুরুষেরা। কথায়-অকথায় যে বাবুর্চি একদিন তার পরোটা ভেজে দিত সে পায়খানার টব সাফ না-করার জন্যে গালি দিতে লাগল। ধোপার অভিযোগ সে মাড় লাগিয়ে কাপড় দড়িতে টাঙিয়ে দেয়, আর এই হারামজাদি ধুলো উড়িয়ে চলে যায়। যে ভিশৃতি তার হাত ধুইয়ে দেবার জন্য মশক নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকত আজ তাকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আঙিনায় জল ছিটাবার জন্যে বলে কিন্তু সে শোনে না, ফলে বউ শুকনো জমিতে ঝাড় দিয়ে দিলে চাপরাশি ধুলো ওড়ানোর জন্যে দোষারোপ করে তাকে গালি দিতে থাকে।
সে মাথা ঝুঁকিয়ে সকলের তিরস্কার এক কান দিয়ে শুনে অন্য কান দিয়ে বের করে দেয়। কে জানে বউ শাশুড়িকে গিয়ে কী বলে দিয়েছিল, ফলে বুড়ি ঠা-া করে সকলের মাথা খেয়ে ফেলত। এখন তার দৃষ্টিতে বউ একেবারে শুদ্ধ আর পুরোপুরি ভালো।
দাড়িওলা দারোগাজি হল সব চাকরদের সর্দার। বাবাকে সে আসল পরামর্শদাতা বলে মানত। সে একদিন বাবার কাছে হাজির হয়ে হাত জোড় করে দাঁড়িয়ে ভয়ানক বদমায়েশি আর শয়তানির কান্না কেঁদে বলল যে বউ আর রতীরাম অনুচিত সম্পর্ক সংস্থাপন করে সারা শার্গিদ-পেশাকে নোংরা করে দিয়েছে। বাবা মামলা সেশনে সোপর্দ করে দিলেন অর্থাৎ এতে লাগিয়ে দিলেন মাকে। মহিলাদের সভা ফের বসল আর বুড়িকে ডেকে আনিয়ে গালাগালি করা হল।
‘আরে হারামজাদি, তুই কি জানিস তোর ছিনাল-বউ কী বদমায়েশি করে বেড়াচ্ছে?’
মেথরানি এমনি ঝাপসাভাবে তাকাল যেন সে বুঝতেই পারছে না কার সম্পর্কে কথা হচ্ছে। আর যখন তাকে স্পষ্টাস্পষ্টি বলা হল যে চোখে-দেখা সাক্ষীদের বক্তব্য এই যে। বউ আর রতীরামের মধ্যে সম্পর্ক অশোভনীয় রকম খারাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে, দু’জনকে খুবই যাচ্ছেতাই অবস্থায় ধরা হয়েছে, তখন তার মঙ্গলাকাঙ্ক্ষীদের ধন্যবাদ দেয়াই উচিত ছিল বুড়ির। উল্টে বিগড়ে গেল সে। ভারি ঝামেলা লাগিয়ে দিল। রামঅওতার আজ যদি এখানে থাকত তো যারা তার নিষ্কলঙ্ক বউয়ের ওপর কলঙ্ক লেপন করছে তাদের মজা দেখিয়ে দিত। বউ হারামজাদি তো এখন চুপচাপ, রামঅওতাদের কথা মনে করে চোখের জল ফেলছে। প্রাণ দিয়ে কাজকও করছে। কারুর কোনো অভিযোগ থাকতে পারে না। ঠাট্টা তো কেউ করছে না। লোকে নিছক তার দুশমন বনে গেছে। বুড়ি কাঁদতে শুরু করল। তাকে অনেক বোঝানো হল কিন্তু শোক করতে সে নিজেই এমন চোখ বুজে স্থির হয়ে আছে যেন সারা দুনিয়া তার জান নিতে উদ্যোগী হয়েছে। বুড়ি আর তার নিকলঙ্ক বউ লোকের কী ক্ষতিটা করেছে? সে তো কারোর কোনো-কিছুর মধ্যে নেই। বুড়ি নিজে তো সকলের সব রহস্য জানে কিন্তু আজ পর্যন্ত তো কারোর হাটে হাঁড়ি ভাঙেনি। তার কী দরকার কারোর ছিদ্র অন্বেষণ করার? কুঠিবাড়িগুলোর পেছনে কী-না হয়ে থাকে? মেথরানি কারোর ময়লা লুকিয়ে রাখে না। এই দুই বুড়ো হাতে বড়-বড় লোকের কত পাপ সে মাটিচাপা দিয়েছে। এই দুই হাত ইচ্ছে করলে এখন রানীর সিংহাসন উল্টে দিতে পারে। কিন্তু না। কারোর সঙ্গে তার কোনো শত্রুতা নেই। কিন্তু কেউ যদি তার গলায় ছুরি চালায় তো তাহলে সব-কিছু গড়বড় হয়ে যাবে, যেমন-তেমন কারো-না-কারো চাপা রহস্য আপন বুড়া কজে থেকে বের করে দেবার দরকার বোধ করি হবে না।
তার ভ্রুভঙ্গি দেখে শীঘ্রই ছুরি-চালানেওয়ালিদের হাত ঝুলে পড়ল। সব মহিলাই তার পক্ষ নিতে লাগল। বউ যাই করুক-না কেন তাদের নিজ-নিজ কেল্লা তো সুরক্ষিত আছে। তা হলে অভিযোগটা হয় কী করে? এবার কিছুদিনের জন্যে বউয়ের প্রেমটা কমে গেল। মানুষও ভুলে গেল ব্যাপারটা। কিন্তু রহস্যভেদকারীরা ধরে নিয়েছিল যে কোথাও একটা গণ্ডগোল আছে। বউয়ের ভারিসারি শরীরও বেশিদিন গণ্ডগোল লুকিয়ে রাখতে পারল না। ফলে লোকে বুড়ির কাছে খুব হৈ-চৈ বাধিয়ে দিল। কিন্তু এই নতুন মামলায় বুড়ি বিলকুল হাবিজাবি বকতে লাগল। একেবারে এমনি হয়ে যেত যেন একদম শুনতেই পাচ্ছে না। এখন সে প্রায়ই খাটের উপর শুয়ে থেকে বউ আর রতীরামের ওপর হুকুম চালায়। কখনো কাশে, হাঁচে, বাইরে রোদে গিয়ে বসে। এখন ওরা দু’জনে বুড়ির এমনই দেখাশোনা করে যেন সে কোন পাটরানি।
ভালো-ভালো বউ-ঝিরা তাকে অনেক বুঝিয়েছে। রতীরামের মুখে কালি মাখাও। আর তারও আগে রামঅওতার ফিরে এসে বউয়ের চিকিৎসা করাক। সে তো নিজেই এই কৌশলে খুব নিপুণ। দু’দিনেই সবকিছু পরিষ্কার হয়ে যাবে। কিন্তু বুড়ি কিছু বুঝতেই চাইল না। এদিকে-ওদিকে সকলের কাছে অভিযোগ করতে লাগল যে, তার হাঁটুতে আগের চেয়ে বেশি যন্ত্রণা হচ্ছে। তার কারণ এইসব কুঠিবাড়িতে লোকে বেশি পরিমাণে নিষিদ্ধ দ্রব্য খেতে শুরু করেছে। কোনো-না-কোনো কুঠিতে পায়খানা লেগেই আছে। এতে টালমাটাল বুঝানোওয়ালারা জ্বলে-পুড়ে খাক হতে থাকে। মেনে নাও যে বউ মেয়েছেলের জাত, অজ্ঞ, বোকা। বড়-বড় সম্ভ্রান্ত মহিলার পদস্খলন হয়ে যায়, কিন্তু ওই বড়-বড় ঘরের ইজ্জতদার শাশুড়িরা তো কানে তেল দিয়ে বসে থাকে না। কিন্তু কে জানে কেন এই ষাট বছরের বুড়ি যে বিপদকে সে খুব সহজেই কুঠিবাড়ির জঞ্জালের নিচে কবর দিয়ে দিতে পারে, সে নিজেই এখন চোখ বুজে স্থির হয়ে আছে।
