‘না।’
‘সাড়ে নয়শ’… নয়শ’ পঁচাত্তর..।’ কীর্তির দৃষ্টিতে অহংকারের ভাব দেখে সে এক শ’ টাকার দশখানা নোট তার হাতে দিয়ে নেশাগ্রস্তের মতো মিথুন-মূর্তির দিকে এগিয়ে গেল। দাঁড়িয়ে ছিল কীর্তি। সে তার আপন শিল্পকর্মের তারিফ শোনার জন্য থেমে গিয়েছিল। মগন মিথুন-মূর্তির মধ্যে রমণী-মূর্তির দিকে তাকাল। সে মূর্তি কীর্তি নিজেই। তার চোখে জল কেন? সে কি আত্মতোষের গভীর অনুভূতির ফল অথবা কোনো জীবন-পীড়নের প্রতীক? তা কি দুঃখ আর সুখ, বেদনা আর বেদনা-উপশমের সম্পর্ক-জাত, যা থেকে পুরো সৃষ্টি উপস্থিত? মগন আবার পুরুষ-মূর্তির দিকে তাকাল–যে মূর্তি ওপর থেকে সুন্দর কিন্তু ভেতরে ছিল পুরো অসুন্দর। কীর্তি কেন পুরুষমানুষের কঠোরতার ওপর জোর দিল … এই মূর্তি হল মিথুন-মূর্তি, কিন্তু এ তো সে মিথুন নয় যা পুরুষ আর প্রকৃতির মিলনে হয়… ঠিক আছে … বিপরীত মূর্তিতে বেশি টাকা পাওয়া যাবে…।
মগন টকলা ওপরের দীপদান টেনে এনে পুরুষ-মূর্তির দিকে তাকিয়ে হঠাৎ বলে উঠল–
‘এই… আমি এই মূর্তিকে কোথায় যেন দেখেছি?
কীর্তি কোনো জবাব দিল না।
‘তুমি।’ মগন যেন সবটাই বুঝে ফেলেছে—
‘তুমি সিরাজার সঙ্গেই বাইরে গিয়েছিলে?’
কীর্তি এগিয়ে এসে মগন টকলার মুখের ওপর সজোরে এক থাপ্পড় মেরে নোটগুলো হাতে নিয়ে বেরিয়ে গেল।
দুই হাত – ইসমত চুগতাই
রামঅওতার যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ফিরে আসছে। বুড়ি মেথরানি চিঠি পড়িয়ে নেয়ার জন্য আব্বা মিঞার কাছে এসেছিল। রামঅওতারের ছুটি হয়ে গেছে। যুদ্ধ শেষ হয়ে গেল তো! তাই তিন বছর বাদে রামঅওতার ফিরে আসছে। কৃতজ্ঞতাবশত সে দৌড়ে-দৌড়ে সকলের চরণ স্পর্শ করছে যেন এইসব চরণের মালিকেরাই তার একমাত্র পুত্রকে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে জীবিত সুস্থ অবস্থায় ফেরত নিয়ে আসছে।
বুড়ির বয়স পঞ্চাশ বছর হয়েছে; কিন্তু তাকে সত্তর বছরের মতো দেখায়। দশ-বারোটা ছোট-বড় ছেলে জন্ম দিয়েছিল সে। তাদের মধ্যে কেবল রামঅওতারই অনেক মানত-টানত করার ফলে বেঁচে আছে। বিয়ে দেয়ার এক বছর পুরা না-হতেই, রামঅওতারের ডাক’ এসে গিয়েছিল। মেথরানি অনেক আপত্তি করেছিল; কিন্তু কোনো ফল হয়নি। কিন্তু যখন রামঅওতার উর্দি পরে শেষবারের মতো তার চরণ স্পর্শ করতে এল, তখন ছেলের দাপট দেখে বুড়িরও বুক ফুলে উঠেছিল, যেন তার ছেলে কর্নেলই হয়ে গেছে।
পেছনের মহলে চাকর-বাকররা হাসছিল। রামঅওতার ফিরে আসার পর যে ড্রামা হবার সম্ভাবনা, সবাই তা নিয়ে উৎসুক হয়ে বসে আছে। যদিও রামঅওতার যুদ্ধক্ষেত্রে কামান-বন্দুক ছুঁড়তে যায়নি, তবু সিপাহিদের পায়খানা সাফ করতে-করতেও তো তার মধ্যে কিছুটা সিপাহিয়ানা দেখা গেয়েছে। ধূসর উর্দি পরে সেই পুরনো রামঅওতার তো আর সেই লোকটি নেই যে সে গোরীর কার্যকলাপ চুপচাপ শুনবে, তার তরতাজা খুন বদনামির ওপর খেপে না-উঠবে।
বিয়ে করে আনার সময় গৌরীর যৌবন কত মচমচে ছিল। রামঅওতার যতদিন ছিল ততদিন তার ঘোমটা ছিল এক ফুট লম্বা। কেউ তার মুখের রূপ দেখতে পায়নি। যখন পতি বিদেশে গেল তখন সে ভেউ-ভেউ কেঁদেছিল–যেন তার সিথির সিঁদুর চিরকালের মতো মুছে যাচ্ছে। কিছুদিন কাঁদো-কাদো চোখে মাথা ঝুঁকিয়ে সে পায়খানার টব বহন করত। তারপর ধীরে-ধীরে তার ঘোমটার দৈর্ঘ্য কমতে শুরু করেছিল।
কিছু লোকের ধারণা যে, ঐ সময় মেয়েটার শরীরে বসন্ত ভর করেছিল। আর একধাপ এগিয়ে কেউ-কেউ বলেছিল, গোরী একটা ছিনাল। রামঅওতার চলে যাওয়াতেই আপদ এসে জুটেছিল। বদমাশ মেয়ে সব সময় ‘হি-হি’ করত, সব সময় যেন মদমত্তা হয়ে হাঁটত। কোমরে পায়খানার টব বসিয়ে কাঁসার কাকন ছনছ করে যেদিক দিয়ে সে চলে যেত সেদিকে লোকে বেহুঁশ হয়ে তাকিয়ে থাকত। ধোপার হাত থেকে সাবানের বাটি পিছলে চৌবাচ্চায় পড়ে যেত, তাওয়ার উপর ফুলে-ওঠা রুটি থেকে চলে যেত বাবুর্চির দৃষ্টি। ভিস্তির ডোল ডুবে যেত কুয়াতে। চাপরাশিদের ব্যাজ লাগানো পাগড়ি হেলে গিয়ে কাঁধে ঝুলতে থাকত। আর যখন এই আপদের প্রতিমা ঘোমটার আড়াল থেকে নয়ন-বাণ নিক্ষেপ করে চলে যেত তখন সারা পেছন-মহল এক নিষ্প্রাণ দেহের মতো স্থবির হয়ে পড়ত। আবার হঠাৎই চমকে উঠে একে অপরের দুর্গতি নিয়ে বিদ্রূপ করত তারা। ধোপানি প্রচণ্ড রাগে মাড়ের কড়াই উল্টে দিত। চাপরাশিনি বুকে চেপে-রাখা ছেলেকে ধমকে উঠত অকারণে। বাবুর্চির তৃতীয় পক্ষের বিবির হিস্টিরিয়া হয়ে যেত।
নামেই কেবল গোরী কিন্তু বদমাশ মেয়েটা কালো কুটকুটে–যেন উল্টানো তাওয়ার উপর কোনো নষ্ট মেয়ে পরোটা ভেজে চমকে উঠে রেখে দিয়েছে। চওড়া কুঁকদানির মতো নাক, ছড়ানো ঠোঁট। তার সাত পুরুষে দাঁত মাজার ফ্যাশন ছিল না। চোখে বিস্তর কাজল দেয়ার পরেও ডান চোখের টেরাভাব ঢাকা যেত না তার। ঐ টেরা চোখেই সে আবার এমন করে বিষ-মাখানো তীর ছুড়ত যে তা নিশানা ভেদ করত। মোষের চেয়ে চওড়া পা। যে দিক দিয়ে চলে যায় সে দিকে ছড়িয়ে যায় সর্ষের তেলের পচা গন্ধ। হাঁ, কণ্ঠস্বর ছিল আশ্চর্য রকমের মধুর। উৎসব-অনুষ্ঠানে যখন ভাবে বিভোর হয়ে কাজরি গাইত তখন তার কণ্ঠস্বর চলে যেত সবচেয়ে চড়ায়।
বুড়ি মেথরানি ওরফে তার শাশুড়ি, ছেলে চলে যাওয়ার পর গোরীর চরিত্র সম্পর্কে সন্দেহপ্রবণ হয়ে ওঠে। উঠতে-বসতে তাকে রক্ষার জন্য গালি দিত। তার ওপর নজর রাখার জন্য পেছন-পেছন ঘুরত। কিন্তু এখন বুড়ির স্বাস্থ্য ভেঙে পড়েছে। চল্লিশ বছর পায়খানা বহন করার ফলে তার কোমর চিরকালের মতো এক দিকে বেঁকে গিয়ে থেকে। গিয়েছিল ওখানেই। সে আমাদের পুরনো মেথরানি। আমাদের জন্মের পরে সে-ই ফুল-নাড়ি ওই মাটিতে পুঁতে দিয়েছিল। মায়ের প্রসববেদনা উঠলে সে এসে বসত চৌকাঠের উপর। আর কখনো কখনো লেডি-ডাক্তারকেও অনেক দরকারি পরামর্শ দিত। টোটকা চিকিৎসার জন্য মন্ত্রপূত তাবিজও নিয়ে বেঁধে দিত পট্টিতে। মেথরানিদের ঘরে সে ছিল গুরুগম্ভীর বয়স্কের মর্যাদায় আসীন।
