কী দাম দেব এর জন্য?’ সে হাল্কাভাবে প্রশ্ন করল।
কীর্তি চকিত নজরে তার দিকে দেখল আর বলল, ‘এবার আমি পঞ্চাশ টাকা নেব।’
‘পঞ্চাশ?’
‘হাঁ, এক পাই কম না…’
মগন হতাশভাবে ‘রোলটপ’ তুলল আর চল্লিশ টাকা বের করে কীর্তির সামনে রাখল আর বলল–
যা তুমি বল, কিন্তু এখন আমার কাছে চল্লিশ টাকাই আছে…দশ টাকা পরে নিয়ে যেয়ো…’।
কীর্তি টাকা হাতে নিল আর বলল—
‘আচ্ছা।
সে চলে যাচ্ছিল মগন তাকে থামাল–’শোনো।’
কীর্তি চলার মাঝে থেমে গিয়ে তার দিকে আমাকে সাহায্য কর’ এই ঢঙে। তাকিয়ে দেখল। কীর্তির চেহারায় বিষণ্ণতা, কিন্তু তা যখন ছড়িয়ে যাবার বদলে স্থির হয়ে গেল ঠিক তখনই মগন টকলা শুধাল–এই টাকায় তোমার কাজ হয়ে যাবে তো?
কীর্তি মাথা হেলিয়ে হাত ছড়িয়ে দিয়েছিল, যার অর্থ আর কী করা যায়?’–সে মুখে বলল, ‘মা’র অপারেশন এসে গেল, একশ’ টাকা লাগবে।’
কিছুক্ষণ পর কীর্তি ফের বলল, আমি তো বলেছি’; একটু থেমে বলল, মা যত শীঘ্র মরে যায় ততই ভালো।’ সেখানে দাঁড়িয়ে আঙুল দিয়ে মাটি খুঁড়তে লাগল কীর্তি।
শেষে কীর্তি নিজেই বলে উঠল, ‘এইভাবে ছুটে বেড়ানোর চেয়ে মরণও ভালো।
যতক্ষণ মগন চোখ খুলে না-তাকায় ততক্ষণ কীর্তিকে তার আঠারো-উনিশ বছরের মেয়ের বদলে পঁয়ত্রিশ-চল্লিশ বছরের ভরন্ত রমণী বলে মনে হয়, সে জীবনের প্রত্যেক আঘাত নিজের ওপরে নিয়ে তাকে ব্যর্থ করে ফেলে দিচ্ছে।
একটা কথা বলি। টকলা কাছে এসে বলল, ‘তুমি মিথুন বানাও… অপারেশনের সব খরচ আমি দেব।’
‘মিথুন?’ কীর্তি বলে কেঁপে উঠল।
‘হ্যাঁ। ওর খুব চাহিদা আছে। টুরিস্টরা ওগুলোর জন্যে পাগল হয়ে ওঠে।
‘কিন্তু…’
বুঝতে পারছি।’ মগন মাথা হেলিয়ে বলল।
তুমি না-জানো তো একবার খাজুরাহো চলে গিয়ে দেখে এস। আমি তার জন্য তোমাকে রাহা-খরচ নিতে রাজি আছি…’
‘তুমি!’ কীর্তি ঘৃণার সঙ্গে তার দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ পরে বলল, তুমি তো বলেছ, তোমার কাছে আর পয়সা নেই…’
মগন ঝটপট মিথ্যা তৈরি করে নিল–
আমার কাছে সত্যি পয়সা নেই’, সে বলল, আমি দোকানের ভাড়া দেয়ার জন্য কিছু টাকা আলাদা করে রেখেছিলাম।’
সে ফের টাকা দেয়ার চেষ্টা করল, কিন্তু কীর্তি আপন অহংকারে তা না-নিয়ে সেখান থেকে চলে গেল। মগন টকলা ঘুরে দাঁড়িয়ে যক্ষী-মূর্তিটি দেখল। ছোট হাতুড়ি দিয়ে তার নাক ভেঙে দিল, ঠ্যাং ভেঙে দিল আর মূর্তির শিরের আভরণের উপর লঘুভাবে এমন করে আঘাত করল যাতে কিছু অংশ ভেঙে পড়ে যায়। তারপর ভেতরের ঘরে গিয়ে সে মূর্তিটিকে দড়িদড়া দিয়ে বেঁধে লবণের অ্যাসিড-জলে ডুবিয়ে রাখল। ফলে ধোয়া উড়ল খানিকটা। মগন দড়ি ধরে টেনে যক্ষীকে বার করে জলে ডুবোতে লাগল। তারপর যখন জল থেকে তাকে তুলে নিল তখন যক্ষীর সাজ-আভরণ মলিন হয়ে গেছে। মাঝে-মাঝে কোথাও হঠাৎ দেখা দিয়েছে গর্ত। এখন এই মূর্তি হাজার টাকায় বিক্রির জন্য তৈরি।
এবার কীর্তি যে মূর্তি নিয়ে এল তা মিথুন-মূর্তি। তা ছিল প্রমাণ মানুষের উচ্চতাবিশিষ্ট। মূর্তি একটি বস্তায় বাঁধা অবস্থায় ঠেলাগাড়িতে চাপিয়ে সে নিয়ে এল। কয়েকজন মজুর তা মগন টকলার দোকানে তুলে দিয়ে রেখে মজুরি নিয়ে চলে।
কীর্তি আর নিজেকে একা পেয়ে এক নিঃশ্বাসে মগন টকলা বস্তার দড়িদড়া কেটে ফেলল। কৌতূহলের সঙ্গে খুলে নিল মূর্তির আবরণ। এখন মূর্তিটি তার সামনে। ‘পারফেক্ট’–মগন মূর্তিকে দেখল, শুকিয়ে গেল তার গলা। সে ভেবেছিল যে কীর্তি তাকে নিজের সামনে ওই শিল্পমূর্তিকে দেখতে দেবে না। কিন্তু কীর্তি সেখানেই দাঁড়িয়ে রইল। তার সামনে, কোনোরকম আবেগ ছাড়াই শিল্পের নারীমূর্তি পূর্ণতাপ্রাপ্ত হল, আর পুরুষমূর্তি আত্মবিস্মৃত হয়ে তার দুই কাধ ধরে দাঁড়িয়ে রইল–মগন টকলা এই যুগলমূর্তিকে যত্নের সঙ্গে দেখল–সে বোধহয় নিভৃত অবসরে মূর্তিটাকে আরো ভালো করে দেখতে চাইছিল।
মগন দ্রুত জিজ্ঞেস করল।
অপারেশনের জন্যে কত টাকা চাই?
অপারেশনের জন্য নয়–নিজের জন্য।
‘নিজের জন্যে? … মা…’
কয়েক সপ্তাহ হল মারা গেছেন।
মগন তার নিজের চেহারায় দুঃখ আর আফসোসের ভাব ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করেছিল কিন্তু কীর্তি তা চায়নি। তার দুই ঠোঁট চেপে বসেছিল। ওই রকমই বিষণ্ণভাবে সে বলেছিল, ‘আমি এর জন্যে হাজার টাকা নেব…’
মগন চকিত হয়ে গিয়েছিল। তার কথায় ছিল তোতলামি–এর জন্যে কেউ হাজার টাকা দিতে পারে?
‘হ্যাঁ।’ কীর্তি জবাব দিয়েছিল–’আমি কথা বলে এসেছি… বোধহয় আমি আরো বেশিই পাব … আমি তোমাকে কথা দিয়েছিলাম তাই…।
‘আমি তো…আমি তো পাঁচশ’ টাকার বেশি দিতে পারব না।’
না।’ কীর্তি মজুরের সন্ধানে বাইরের দিকে দেখতে লাগল। মগন টকলা তাকে থামাল–’আর দুশ’ নিয়ে নাও।’
‘হাজারের চেয়ে কম এক টাকা নেব না।’
মগন হয়রান হয়ে কীর্তির দিকে তাকিয়ে রইল। আজ কীর্তির মেজাজ অন্যরকমও। ও কি খাজুরাহো গিয়েছিল? দেখা হয়েছিল ট্যুরিস্টদের সঙ্গে? যে-কোনো মূল্যে কলাকারকে তার মার্কেট থেকে দূরে সরিয়ে রাখা দরকার। কিন্তু… কিন্তু… সে ‘রোলটপ’ তুলে আটশ’ টাকার নোট গুণে কীর্তির সামনে রাখল। কীর্তি তাড়াতাড়ি তা গুণে দেখে মগনের মুখের ওপর ছুঁড়ে ফেলল।
‘আমি বলেছি–হাজার টাকার কম নেব না।’
‘আচ্ছা, নয়শ’ টাকা নাও…’
