সিরাজা নিশ্চয় কোনো আফ্রোডিজিয়া খাচ্ছিল। হতে পারে মাইকেল তার জন্য ওটি নিয়ে এসেছে। হয়তো ওরা দু’জনে মিলে মগন টকলার কাছে এসে তার সঙ্গে ছদ্মব্যঙ্গে কথার ঘাত-প্রতিঘাত চালাত, কিন্তু ঠিক সেই সময় মগন বন্ধ করে নিল দোকান। ভেতর থেকে দরজা বন্ধ করে দিয়ে সে কীর্তির সেই উড-ওয়ার্কটিকে দেখল। শিল্পীকর্মটি বেশ উঁচু দরের। শেষনাগের নিম্নাংশ খুব সুন্দর, কিন্তু তার উপরাংশের চিত্রিত দেহচর্মে কীর্তি উল্কির ছাপ ও রঙে ভরে দিয়েছিল। বিষ্ণুমূর্তিটির মধ্যে এমন একটা ভাব ফুটে রয়েছে যা যে কোনো রমণী আস্থাবান পুরুষের মধ্যে দেখতে চায়। হ্যাঁ লক্ষ্মী হেলে পড়েছিল, তার শরীরের রেখাগুলোও স্পষ্ট ছিল না। বোধহয় কীর্তি লক্ষ্মীর আর কোনো রূপকে জানত না, যদিও তাকে রুচিগ্রাহ্য রূপে বানানো খুবই সোজা। যখন রমণী পা টেপবার জন্য ঝুঁকে পড়ে তখন তার হাতের বাজু দেখা যায়, শরীর থেকে তা আলাদা হয়ে আসে; ফলে তা রমণীকে তার বিশেষত্ব নিয়ে স্পষ্টরূপে ফুটিয়ে তোলে। আবার পাশের দিকে উপবিষ্টা উপরাসীন রমণীকে নিম্নাসীনার চেয়ে কত তফাত বলে মনে হয়। পুরুষের দৃষ্টিতে নারীশরীর কতই-না উঁচুনিচু রেখাময়। আবার এ-কথাও বলা যায়, কীর্তি নিজে রমণী বলেই হয়তো রমণীর তুলনায় সে পুরুষের প্রতি বেশি আগ্রহী, সে-কারণেই লক্ষ্মীমূর্তি নির্মাণে তার এই ক্রটি। রমণী আপন সৌন্দর্যের ব্যাপারে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আত্মরতিতে ডুবে থাকে আর যখন তার এই আত্মরতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় তখন কোনো পুরুষের সহায়তায় তা থেকে মুক্তি পায়।
কীর্তির ঐ ‘উড-ওয়ার্ক’ মগন এক হাতে ধরে অন্য হাতে ছুরি নিয়ে তার উপর ‘সিদ্ধম নমঃ’ অক্ষর খোদাই করে পেছনের ঘরে চলে গেল। সেখানে জমি কাঁচা মাটির। মাটি খুঁড়ে সে তার মধ্যে উড-ওয়ার্ক’টিকে রাখল। মাটির ভেতর থেকে আরেকটি মূর্তি বের করল সে, সেটাও কীর্তির বানানো। গর্তের মধ্যে মাটি দিয়ে তার মধ্যে খয়েরের জল ছিটিয়ে দিল। পুরনো মূর্তির ধুলো ঝেড়ে সে দেখতে পেল তাতে বড়-বড় ফাটা-দাগ হয়ে গেছে আর তা কয়েক শতাব্দীর পুরনো বলে মনে হচ্ছে। পরের দিন যখন সেটিকে নিয়ে মগন ট্যুরিস্টদের কাছে গেল তখন তারা খুশি হল খুব। মগন তাদের জানাল যে এই মূর্তির উল্লেখ কালিদাসের রঘুবংশে আছে। রঘু কোঙ্কণ দেশে ত্রিকূট নামে এক শহর স্থাপন করেছিলেন, সেখান থেকে ওই মূর্তি পাওয়া গিয়েছিল। এ-ধরনের কিছু মূর্তি মহীশূরের চামরাজা ওয়াডিয়ারের কাছে আছে। আর কিছু তার কাছে। এইভাবে মগন টকলা ঐ মূর্তিটিকে সাড়ে পাঁচশ’ টাকায় বেচে দিল। এটার জন্যে সে কীর্তিকে দিয়েছিল মাত্র পাঁচটি টাকা।
এই ঘটনার এক সপ্তাহের মধ্যে কীর্তি ন্যুড’ নিয়ে এল। তার মুখে আগের মতোই চিন্তার ছাপ। ওর মা অসুস্থ। সে নিজেও অসুস্থ বোধ করছিল। ওর প্রায় নিউমোনিয়া হয়ে গেছে। সে খকখক করে কাশছিল আর বারবার নিজের গলা ধরছিল। তুলোর পট্টি গলায় রেখে তা এক ফাটা-ছেঁড়া কাপড় দিয়ে বেঁধেছিল সে।
কীর্তি অন্যান্য দিনের মতোই মগন টকলার সামনে মূর্তিটি রেখে দিল। এই মূর্তি সে কাঠ দিয়ে নয়, পাথর দিয়ে বানিয়েছিল। আশা আর আশঙ্কার সঙ্গে কীর্তি মগন টকলার দিকে তাকিয়েছিল। মগন যদি অপছন্দ করে তবে তা অমার্জনীয় মিথ্যা কথা হবে। এ-কারণে মগন কেবল তা পছন্দই করেনি, পরন্তু প্রাণভরে তারিফ করেছিল। নিন্দা করেছিল এইমাত্র যে মূর্তিটি খুব ছোট হয়েছে। তার আফসোস এই যে, মূর্তিটি যদি প্রমাণ মানুষের উচ্চতাবিশিষ্ট হতো তবে কেবল কীর্তির নয়, মগনেরও অনেক উপকার হতো।
মগন যক্ষীমূর্তি হাতে নিয়ে সযত্নে দেখছিল। কীর্তি সত্যিসত্যি ন্যুড’ বানাতে পারেনি। মূর্তির মুখের উপর ছিল ভেজা কাপড়। আশ্চর্য ওই কাপড় থেকে এখনো পর্যন্ত জলবিন্দু ঝরে পড়ছে বলে মনে হচ্ছে। সেই জলবিন্দুর কিছুটা মুখের সঙ্গে লেগে আছে, কিছুটা অন্যান্য জায়গায়। উপর থেকে মুখ ঢাকার চেষ্টায় ওই রমণীর দেহ আরো স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল।
মূর্তি থেকে নজর তুলে নিয়ে মগন টকলা কীর্তির দিকে তাকাতেই হঠাৎ তার মুখ থেকে বেরিয়ে পড়ল–’বাহ’। কীর্তি লজ্জিত হয়ে নিজের জামদানি শাড়িটিকে কিছুটা সামনে টানল, কিছুটা দিয়ে পেছন দিকে ঢাকতে লাগল। কিন্তু মগন ঠিক বুঝে নিয়েছিল। যে, আয়নার সামনে নগ্ন হয়ে নিজের প্রতিবিম্ব দেখে ওই মূর্তি সে বানিয়েছে। এতবার তাকে কাপড় ভিজিয়ে নিজের মুখের উপর রাখতে হয়েছে যার ফলে তার ঠাণ্ডা লেগে গেছে আর সে এখন পর্যন্ত কাশছে। এ কেবল পয়সার কথা নয়। নারীর মধ্যে আত্মপ্রদর্শন আর আত্মসমর্পণের ভাবও তো আছে। মগন সবকিছু বুঝে ফেলেছিল। কিন্তু জেনে-বুঝে না-জানার ভান করে তাকে শুধিয়ে নিল–
মা কেমন আছে?’
এ-কথায় খুব চটে গিয়েছিল কীর্তি। তার কাশির দমক এসেছিল আর নিজেকে সামলাতে তার লেগেছিল বেশখানিকটা সময়। মগন ঘাবড়ে গিয়েছিল, আর লজ্জিতও হয়েছিল। তারপর মাথা হেলিয়ে যে প্রশ্ন সে করেছিল তা-ও জরুরি ছিল না–
‘তা হলে তুমি মডেল পেয়েছিলে?’
কীর্তি প্রথমে দৃষ্টি নত করেছিল, তারপর দোকানের বাইরে তাকিয়ে সেই দিকে দেখেছিল যেদিকে সড়ক আকাশ ছুঁতে গিয়ে হঠাৎ নিচে নেমে গেয়েছে। মগন চেয়েছিল কীর্তির দুর্বলতা ধরে ফেলে আর প্রাপ্য তারিফ তাকে দেয়, আর বোধহয় দিতে চেয়েছিলও। কিন্তু মগন ভাবল এতে মূর্তির দাম বেড়ে যাবে। সে মনে-মনে স্থির করেছিল এবার সে কীর্তিকে একশ’ টাকা দেবে। ওষুধের বোতল আর বাকি জিনিসপত্রের দাম একশ’ টাকা না-হলেও সে একশ’ টাকাই দেবে। ভেতরে-ভেতরে সে ভয় পাচ্ছিল, কীর্তি আরো বেশি টাকা-না চায়।
