এই বলে জিনিস দুটো নিয়ে দুখী চলে আসে। পণ্ডিতমশাইয়ের বাড়ির দেউড়িতে দাঁড়িয়ে ডাকে, বাবাঠাকুর, একটুন আগুন যদি পেতাম এক ছিলিম তামাক টেনে নিতাম।
পণ্ডিতমশাই খেতে বসেছিল। বামুনগিন্নী জিজ্ঞেস করেন, আগুন চাইছে কে এটা?
পণ্ডিত–আরে ওই শালা দুখিয়া চামার। ওকে বলেছি কাঠটাকে একটু চিরে দিতে। আগুন তো রয়েছে, দাও-না একটু।
বামুনগিন্নী ভুরু কুঁচকে বলে ওঠেন, পুঁথিপত্তরের ফেরে পড়ে ধরম-করম সব কিছুর তো মাথা খেয়ে বসে আছ। চামার হোক, ধোপা হোক, নাপিত হোক, মাথা উঁচু করে একেবারে ভেতরবাড়িতে চলে আসবে! এ যেন হিন্দুর বাড়ি নয়, একটা সরাইখানা। বলে দাও পোড়ারমুখোকে চলে যেতে, না হলে এই পোড়াকাঠ দিয়ে মুখ পুড়িয়ে দেব। আগুন চাইতে এসেছে!
পণ্ডিতমশাই বুঝিয়ে বলেন, ভেতরে চলে এসেছে তো কী হয়েছে? তোমার তো। কোনো কিছু ছোঁয়নি। মাটি হল পবিত্র। একটুখানি আগুন দিয়ে দিচ্ছ-না কেন? কাজটা। তো আমাদেরই করছে। কোনো মজুর লাগিয়ে এই কাঠ চেলাতে গেলে কম করে চার আনা পয়সা তো নিত।
বামুনগিন্নি মুখঝামটা দিয়ে বলেন, ওটা বাড়িতে ঢুকেছে কেন?
হার মেনে বলেন পণ্ডিতমশাই-শালার কপাল খারাপ, এছাড়া আর কী?
বামুনগিন্নী–বেশ, এবারের মতো আগুন দিয়ে দিচ্ছি; কিন্তু আবার যদি এভাবে কোনো ব্যাটা বাড়িতে ঢোকে তো তার মুখে নুড়ো জ্বেলে দেব।
সব কথাই কানে আসে দুখীর। মনে-মনে পস্তাচ্ছে–কেন যে শুধু-শুধু এলাম। সত্যি কথাই তো। বামুনপণ্ডিতের বাড়ির ভেতরে চামার ঢোকে কী করে! বড় পবিত্তর এনারা, তাই তো দুনিয়ার সবাই এত খাতির করে, তাই তো এত মান্যিগন্যি। মুচি-চামার তো নয়। এই গাঁয়েই বুড়ো হলাম। আর এ আক্কেলটুকুন হল-না আমার। তাই বামুনগিন্নী আগুন নিয়ে বেরুলে দুখী যেন হাতে স্বর্গ পায়। জোড় হাত করে মাটিতে মাথা ঠেকিয়ে বলে, মা-ঠাকরুণ, বড় ভুল হয়ে গেছে গো। বাড়ির ভেতরে চলে এসেছি। চামারের বুদ্ধি তো মা! এতটা মুখ্যসুখ্য যদি নাই হব, তাহলে লাথিঝেটা খাব কেন?
বামুনগিন্নী চিমটেয় ধরে আগুন এনেছেন। হাতপাঁচেক দূরে দাঁড়িয়ে ঘোমটার আড়াল থেকে আগুনটাকে দুখীর দিকে ছুঁড়ে দিলেন। বড় একটা আগুনের টুকরো এসে দুখীর মাথায় পড়ল। তাড়াতাড়ি পিছু হটে সে মাথা ঝাঁকাল। তার মন বলে উঠল, এ হল গে পবিত্তর বামুনের বাড়িকে অপবিত্তর করার সাজা। ভগবান হাতে-হাতে সাজা দিয়ে দিয়েছেন। এজন্যেই তো সারা দুনিয়া বামুনদের এত ভয় করে। অন্যসব লোকের টাকা-পয়সা মার যায়। কই বামুনদের পয়সা মেরে নিক তো কেউ। গুষ্টিসুষ্ঠু সবার সব্বনাশ হয়ে যাবে না, পা পচে-পড়ে খসে পড়বে-না!
বাইরে এসে সে তামাক খায়, তারপর আবার কুড়ল নিয়ে কাজে লেগে পড়ে। খটাখট আওয়াজ আসতে থাকে।
ওর গায়ে আগুন পড়েছে, তাই বামুনঠাকরুনের একটু মায়া হয় দুখীর ওপর। পণ্ডিতমশাই খেয়ে উঠলে বলেন, চামারটাকে একটু কিছু খেতেটেতে দাও, বেচারা সেই কখন থেকে কাজ করছে, খিদে থাকতেই পারে।
পণ্ডিতমশাই এই প্রস্তাবটার বাস্তব দিকটা উপলব্ধি করে জিজ্ঞেস করেন, রুটি আছে?
পণ্ডিতগিন্নী–দু’চারখানা হয়তো বেঁচে যাবে।
পণ্ডিত দু’চারখানা রুটিতে কী হবে? ব্যাটা চামার, কম করে সেরখানেক তো গিলবে।
পণ্ডিতগিন্নী কানে হাত দিয়ে বলেন, ওরে বাপ রে! সেরখানেক! তাহলে থাকগে।
পণ্ডিতমশাই এবার উল্টো চাপ দেন, বলেন–কিছু ভুষি-টুষি থাকলে আটার সঙ্গে মিশিয়ে দু’খানা মোটা চাপাটি সেঁকে দাও না, শালার পেট ভরে যাবে। ওই পাতলা-পাতলা রুটিতে এসব ছোটলোকের পেট ভরে না। এদের তো জোয়ারের মোটা চাপাটি চাই।
পণ্ডিতগিন্নী বলেন, ছাড়ো তো, এই দুপুর-রোদে কে মরতে যাবে ওসব করে।
তিন
দুখী তামাক খেয়ে আবার কুড়ল নেয়। দম নিয়ে হাতে একটু জোর পায়। প্রায় আধ ঘণ্টা ধরে একনাগাড়ে কুড়ল চালিয়ে যায়। তারপর অবসন্ন হয়ে সেখানে মাথাটা চেপে ধরে বসে পড়ে।
এর মধ্যে গোঁড় এসে পড়ে। বলে–কেন জানটা খোয়াচ্ছ বুড়োদাদা। কোপানিতে এই গাঁট ফাটবে না। শুধু-শুধু হয়রান হচ্ছ।
কপালের ঘাম মুছে দুখী বলে–এখনো একগাড়ি ভুষি বয়ে আনতে হবে রে ভাই।
গোঁড়–খেতে-টেতে কিছু দিয়েছে, না শুধু কাজই করিয়ে চলেছে। গিয়ে চেয়েটেয়ে কিছু নিচ্ছ-না কেন?
দুখী–বলছ কী চিখুরী! বামুনের অন্ন কি আমাদের পেটে হজম হবে?
গোঁড়া–হজম ঠিকই হবে, আগে পাও তো। গোঁফে তা দিয়ে তো ঠিকই খেয়ে নিয়ে তোমাকে কাঠ চেরার হুকুম দিয়ে আরাম করে ঘুমুচ্ছে, জমিদারও তো কিছু না-কিছু খেতে দেন। হাকিমও বেগার খাটালে কিছু না-কিছু মজুরি দেন। ইনি ওঁদেরও ছাড়িয়ে গেছেন। নিজেকে ধাম্মিক বলে জাহির করছেন।
দুখী–আস্তে-আস্তে বল্রে ভাই, শুনে-টুনে ফেললে বিপদ হবে। বলে দুখী আবার কুড়ল চালাতে লাগল। দুখীকে দেখে চিখুরীর দয়া হল। এগিয়ে এসে ওর হাত থেকে কুড়লখানাকে কেড়ে নিয়ে একনাগাড়ে আধঘণ্টা খুব জোরে-জোরে কুড়ল চালাল; কিন্তু গাঁটে একটুখানি ফাটও ধরল না। কুড়লটাকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে সে বলতে চাইলে–এ ঘাট চেরা তোমার কম্ম না, জান গেলেও পারবে না।
দুখী ভাবে–বাবাঠাকুর এই গাটটা পেলেন কোথায়, যাকে এত কুপিয়েও চেরা যাচ্ছে না। কোথাও একটুখানি চিড় পর্যন্ত খাচ্ছে না। আমি কতক্ষণ ধরে কোপাব এটাকে? ওদিকে বাড়িতে এখনও শতেক কাজ পড়ে রয়েছে। কাজকম্মের বাড়ি, একটা-না-একটা কাজ তো লেগেই আছে। কিন্তু এতে কার কী মাথাব্যথা! যাই ততক্ষণে না-হয় ভুষিগুলোই নিয়ে আসি। বলব, বাবাঠাকুর, আজ তো কাঠ চিরতে পারলাম না, কাল এসে না-হয় চিরে দেব।
