সদগতি – প্রেমচন্দ
এক
বাড়ির দরজায় ঝাট দিচ্ছে দুখী চামার। ওর বৌ ঝুরিয়া গোবর দিয়ে ঘর নিকোচ্ছে। দু’জনেরই কাজ সারা হলে ঝুরিয়া দুখীকে বলল, এবার তাহলে তুই গিয়ে পণ্ডিতমশাইকে বলে আয়, উনি আবার অন্য কোথাও বেরিয়ে-টেরিয়ে যান।
দুখী–হ্যাঁ যাচ্ছি, কিন্তু ভেবে দেখ তো উনি বসবেন কিসে?
ঝুরিয়া–কোথাও একটা খাঁটিয়া-ফাটিয়া পাবি না? বামুনপাড়া থেকে না-হয় একটা চেয়ে নিয়ে আসিস।
দুখী–তুই মাঝেমাঝে এমন সব কথা বলিস যে, শুনলে পিত্তি জ্বলে যায়। বামুনপাড়ার ওনারা আমাকে খাঁটিয়া দেবে কেন! একটুকুন আগুন পর্যন্ত বাড়ি থেকে দেয় না, খাঁটিয়া দেবে! কুয়োর ধারে গিয়ে এক ঘটি জল চেয়ে পাই না, আর খাঁটিয়া দেবে! এ কি আমাদের খুঁটে, কঞ্চি, ভূষা কিংবা কাঠ যে, যার যেমন খুশি নিয়ে চলে যাবে। নে, আমাদের খাঁটিয়াটাকেই ধুয়েটুয়ে রেখে দে। গরমের দিন, ঠাকুরমশাই আসতে-আসতে শুকিয়ে যাবে।
ঝুরিয়া–আমাদের খাঁটিয়াতে উনি বসবেন না। দেখিসনি কী রকম আচারে-বিচারে থাকেন।
দুখী একটু চিন্তিত হয়ে বলল, তাও তো বটে। তাহলে মহুয়াপাতা পেড়ে এনে একটা আসন বানিয়ে নিলে হয় না। মহুয়া তো বড়-বড় লোকেরা খায়। মহুয়াপাতা পবিত্তর। দে তো লাঠিটা, ক’টা পাতা পেড়ে আনি।
ঝুরিয়া–পাতা দিয়ে আসন আমি বানিয়ে রাখবখন। তুই যা। আর হ্যাঁ, ঠাকুরমশাইয়ের জন্যে তো সিধেও নিতে হবে। আমাদের থালাটাতে সিধে সাজিয়ে রেখে দেব।
দুখী–কখনো অমন সব্বনাশটি করিস না। তাহলে সিধেও যাবে, থালাখানাও ভাঙা পড়বে। একটান মেরে বাবাঠাকুর থালাখানাকে ছুঁড়ে ফেলে দেবেন। ওনার বড় তাড়াতাড়ি রাগ চেপে যায়, রাগ চাপলে বামুনমাকেও ছেড়ে কথা কন না; ছেলেটাকে তো এই সেদিন এমন ঠ্যাঙানি ঠেঙিয়েছেন যে, বেচারা আজও ভাঙা হাত নিয়ে ঘুরছে। পাতাতে করেই সিধে দিস। হ্যাঁ, দেখিস তুই কিন্তু কিছু ছুঁস না। গোঁড়ের মেয়েকে ডেকে নিয়ে সাহুর দোকান থেকে সব জিনিস নিয়ে আসিস। সিধেতে সব জিনিস যেন ঠিক থাকে। সেখানেক আটা, আধ সের চাল, পোয়াটাক ডাল, আধপো ঘি, নুন-হলুদ না দিস আর পাতার এক কোণে চার আনা পয়সাও রেখে দিস। গোঁড়ের মেয়েকে না-পেলে তুই ভুর্জিনক হাতে-পায়ে ধরে ডেকে নিয়ে যাস। দেখিস তুই কিন্তু কিছু ঘঁস না, তাহলে সব্বনাশ হয়ে যাবে।
সব কথা ভালো করে বুঝিয়ে-পড়িয়ে দুখী লাঠিটা নিয়ে ঘাসের একটা বড়সড় গাঁটরি মাথায় চাপিয়ে পণ্ডিতমশাইকে খোশামুদি করতে চলল। খালি হাতে বাবাঠাকুরের সামনে যায় কোন মুখে। আর নজরানা বলতে ঘাস ছাড়া ওর কাছে আর কিই-বা আছে। ওকে খালি হাতে দেখলে ঠাকুরমশাই তফাৎ থেকেই যে দূর-দূর করে খেদিয়ে দেবেন।
দুই
পণ্ডিত ঘাসীরাম পরম ঈশ্বরভক্ত। ঘুম থেকে উঠেই পূজার্চনা নিয়ে পড়েন। হাতমুখ ধুতে-ধুতে আটটা বাজে। তারপর শুরু হয় পুজো। পুজোর প্রথম কাজ হল ভাঙ ঘোটা। তারপর আধঘণ্টা ধরে বসে চন্দন ঘষেন, আয়নার সামনে বসে একটা কাঠি দিয়ে কপালে তিলক আঁকেন। চন্দনের দুটো রেখার মাঝখানে সিদুরের লাল ফোঁটা কাটেন। একে-একে বুকে, হাতে, গোল-গোল মুদ্রা আঁকেন চন্দনের। এরপর ঠাকুরের বিগ্রহকে স্নান করান, চন্দন দিয়ে সাজান, সামনে ফুল দেন, আরতি করেন, ঘণ্টা বাজান। দশটা নাগাদ উনি পুজো সেরে ওঠেন। ভাঙের শরবত খেয়ে ঠাকুরঘর থেকে বেরিয়ে আসেন। ততক্ষণে দু’-চারজন যজমান এসে পড়ে বাড়িতে। ঠাকুরপুজোর ফল হাতে-হাতে পেয়ে যান। এই হল ওঁর পেশা।
আজ ঠাকুরঘর থেকে বেরিয়ে এসে উনি দেখেন দুখী চামার এক গাঁটরি ঘাস নিয়ে বসে আছে। দুখী ওকে দেখেই সাষ্টাঙ্গে দণ্ডবৎ করে জোড়হাতে উঠে দাঁড়ায়। বাবাঠাকুরের তেজোময় মূর্তি দেখে দুখীর হৃদয় শ্রদ্ধায় ভরে ওঠে! আহা কী দিব্য মূর্তি। ছোটখাট গোলগাল চেহারা, মসৃণ ভাল, প্রসন্ন বদন, ব্রহ্মতেজে প্রদীপ্ত নয়ন। সিঁদুরে আর চন্দনরেখায় দেখাচ্ছে যেন দেবতা!
দুখীকে দেখে শ্রীমুখে বলে ওঠেন, আজ কী মনে করে এলি রে দুখীয়া!
দুখী মাথা হেঁট করে বলে, মেয়েটার বিয়ে দিচ্ছি বাবাঠাকুর! পাঁজিপুঁথি দেখে একটা শুভলগ্ন দেখে দিতে হবে যে। কখন দয়া হবে বাবা?
ঘাসী–আজ তো সময় হবে না রে। ঠিক আছে, না-হয় সন্ধে নাগাদ যাব।
দুখী–না না, বাবাঠাকুর, একটু তাড়াতাড়ি চলুন। আমি সব কিছু ঠিকঠাক করে রেখে এসেছি। এই ঘাসটা কোথায় রাখি?
ঘাসী–এই গরুটার সামনে দিয়ে দে ওটা। আর ঝাড়গাছা নিয়ে বাড়ির দরজাটা একটু ঝটপাট দিয়ে পরিষ্কার করে দে তো। বৈঠকখানাটাও আজ ক’দিন ধরে লেপা-পোঁচা হয়নি। ওটাকে একটু গোবর দিয়ে লেপে দে। আমি ততক্ষণে সেবাটেবা সেরে নিই। তারপর একটুখানি বিশ্রাম নিয়ে যাব। হ্যাঁ, এই কাঠটাকেও একটু চিরে দিস তো। আর শোন, খামারে ঝুড়ি চারেক ভূষি পড়ে আছে, ওগুলোকে নিয়ে এসে ভূষি রাখার ঘরটায় রেখে দিস, কেমন।
দুখী সঙ্গে-সঙ্গে হুকুম তামিল করতে শুরু করে দিল। দরজায় ঝাড় দিল, বৈঠকখানাকে নিকিয়ে দিল গোবর দিয়ে। এসব কাজ সারতে-সারতে বেলা বারোটা বেজে গেল। পণ্ডিতমশাই খেতে যান। দুখী সকাল থেকে কিছু খায়নি। জোর খিদে পেয়েছে ওরও; কিন্তু এখানে কে ওকে খেতে বলেন। বাড়ি এখান থেকে মাইলখানেক দূরে। বাড়ি খেতে গেলে পণ্ডিতমশাই যদি রাগ করেন। বেচারা খিদে চেপে কাঠ চিরতে শুরু করল। মোটা মতন একটা গাঁট, এর ওপর এর আগে কত-না শিষ্য তাদের শক্তি পরীক্ষা করছে। দুখীও একই শক্তি আর দৃঢ়তার সঙ্গে এই কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন হল। দুখীর কাজ ঘাস কেটে বাজারে নিয়ে গিয়ে বেচা। কাঠ চোরার অভ্যাস আদৌ নেই তার। ঘাস ওর খুরপির সামনে মাথা নোয়ায়। দুখী ঠিকরে যায়। ঘেমে নেমে ওঠে দুখী, হাঁপাতে থাকে, অবসন্ন হয়ে বসে পড়ে, আবার উঠে দাঁড়ায়। হাত ওঠাতে গিয়ে ওঠাতে পারে না। পা দুটো কাঁপে, কোমর সোজা করে দাঁড়াতে পারে না। চোখে আঁধার ঘনিয়ে আসে, মাথা ঝিমঝিম করে! তবুও সে কাজ করে চলে। ভাবে, এক ছিলিম তামাক যদি টানতে পেতাম হয়তো একটু তাগদ পেতাম। কিন্তু কলকে তামাক এখানে পাব কোথায়? বামুনদের পাড়া। বামুনরা তো আর। আমাদের নিচু জাতের মতন তামাক খায় না। হঠাৎ খেয়াল হয় এ-গাঁয়ে তো এক ঘর গোড়ও আছে। ওর কাছে গেলে ঠিকই কল্কে-তামাক পাওয়া যাবে। সঙ্গে সঙ্গে দুখী ছোটে ওর বাড়ি। যাক্, পরিশ্রম সার্থক হয় সে তামাক দেয়। কিন্তু আগুন পাওয়া গেল না সেখানে। দুখী বলে, আগুনের জন্য ভেব-না ভাই! আমি যাচ্ছি, পণ্ডিতমশাইয়ের বাড়ি থেকে চেয়ে নেব। ওঁর বাড়িতে তো এই একটু আগেও রান্না হচ্ছিল।
