ঝুড়ি মাথায় করে দুখী ভুষি বয়ে আনল। বাড়ি থেকে খামার দুফার্লংয়ের কম নয়। খুব চাপাচাপি করে ঝুড়ি যদি ভরে আনতে পারত তাহলে কাজ তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে যেত বটে, কিন্তু মাথায় তুলে দেবে কে ঝুড়ি। পুরোপুরি ঠাসা ঝুড়িটাকে একা মাথায় তুলতে পারে না। তাই অল্প-অল্প করেই আনে। চারটে নাগাদ ভুষি আনা তার শেষ হয়। পণ্ডিতমশাইয়েরও ঘুম ভাঙে। মুখ-হাত ধুয়ে, পান খেয়ে বাইরে আসেন। দেখেন ঝুড়ির ওপর মাথা রেখে দুখী ঘুমুচ্ছে। জোরে হাঁক দেন–ওরে ও দুখিয়া! বলি, ঘুমুচ্ছিস? কাঠ তো এখনো যেমনকার ঠিক তেমনি পড়ে রয়েছে। এতক্ষণ তুই করছিলি কী? একমুঠো ভূযো আনতেই দিন কাবার করে ফেললি। তার ওপর আবার পড়ে-পড়ে ঘুমুচ্ছিস? নে নে, তোল কুড়ল। কাঠটা চিরে দে! তোকে দিয়ে একটুখানি কাঠ চেরানোও যায় না। লগনও তাহলে তেমনি হবে বুঝলি, আমাকে কিন্তু তখন দুষতে পারবি না। সাধে বলে, ছোট জাতের ঘরে খাবার জুটল তো ব্যস ওদের মতিও পালটে গেল।
দুখী আবার কুড়ল হাতে নিল। যেকথা বলবে বলে ভেবে রেখেছিল, সেসব ভুলে গেল। পেট পিঠে লেগে গেছে। সেই সকাল থেকে জলটুকু পর্যন্ত খায়নি। সময়ই পায়নি। উঠে দাঁড়াতেই কষ্ট হচ্ছে। দেহ বসে যাচ্ছে। তবু মনটাকে শক্ত করে উঠে দাঁড়াল সে। পণ্ডিতমশাই শুভ সময়টা ঠিকমতো যদি না-দেখে দেন, তাহলে হয়তো সব্বনাশ হয়ে যাবে। এজন্যেই তো সংসারে তার এত খাতির, এত মান। শুভ মুহূর্তেরই তো সব খেলা। যাকে ইচ্ছে শেষ করে ফেলতে পারলে ইনি। পণ্ডিতমশাই কাঠটার কাছে এসে দাঁড়ান, আর উৎসাহ দিয়ে যান–মার কষে, আবার মার-কষে মার কী রে, মার। না রে জোরে–তোর হাতে তো যেন জোরই নেই–লাগা কষে, দাঁড়িয়ে ভাবছিস কী! হা হা, ব্যস্ এই তো ফাটল বলে! দে দে, ওই ফাটলতাতেই আবার দে।
দুখীর হুঁশ থাকে না! না-জানি কী এক গুপ্তশক্তি ওর বাহু দুটিতে ভর করেছে। ক্লান্তি, অবসাদ, ক্ষুধা সবই যেন উবে যায়। নিজের বাহুবলে নিজেই অবাক। এক-একটি আঘাত পড়ছে যেন বজ্রের মতো। আধঘণ্টা ধরে উন্মাদের মতো সে কুড়ল চালিয়ে যায়। শেষে কাঠখানাও মাঝখান দিয়ে ফেটে যায়। সেই সঙ্গে দুখীর হাত থেকে কুড়লটাও ছিটকে পড়ে। মাথা ঘুরে পড়ে যায় দুখী। ক্ষুধায়, তৃষ্ণায় ক্লান্ত অবসন্ন শরীর মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে।
পণ্ডিতমশাই ডাকেন–নে রে, উঠে দু’চার কোপ আরও দিয়ে দে। পাতলা-পাতলা চ্যালা করে দে। দুখী ওঠে না। পণ্ডিতমশাইও ওকে আর এখন বিরক্ত করা উচিত মনে করেন না। ভেতরে গিয়ে ভাঙের শরবত খান, শৌচকর্ম সারেন, স্নান করেন, তারপর পণ্ডিতমশাইয়ের পোশাকে সেজেগুজে বাইরে আসেন। দেখেন দুখী তখনো একইভাবে পড়ে রয়েছে। পণ্ডিতমশাই জোরে ডাক দেন–অ্যাই দুখী, তুই কি শুয়েই থাকবি রে, চল তোর বাড়িতেই যাচ্ছি। সব জিনিসটিনিস ঠিকঠাক জোগাড় করে রেখেছিস তো? দুঃখী কিন্তু তবু ওঠে না।
এবার পণ্ডিতমশাইয়ের মনে ভয় হয়। কাছে গিয়ে দেখেন, দুখী টানটান হয়ে পড়ে আছে। ভড়কে গিয়ে ভেতরে ছোটেন, গিয়ে বামুনগিন্নীকে বলেন, দুখিয়াটা মনে হচ্ছে মরে গেছে।
পণ্ডিতগিন্নী হকচকিয়ে বলেন–তো! এক্ষুণি তো কাঠ চিরছিল!
পণ্ডিত–হ্যাঁ, কাঠ চিরতে-চিরতে মরে গেছে। সর্বনাশ হয়েছে, এখন কী হবে?
পণ্ডিতগিন্নী ঠাণ্ডা গলায় বলেন–কী আবার হবে, চামারবস্তিতে খবর পাঠিয়ে দাও মড়া তুলে নিয়ে যাবে।
কিছুক্ষণের মধ্যে সারা গায়ে খবর রটে যায়। বামুনদেরই ঘর সব। কেবল এক ঘর গোঁড়। ওদিকের রাস্তা দিয়ে হাঁটা সবাই ছেড়ে দেয়। কুয়োতে যাবার রাস্তা ওদিক দিয়েই, জল আনবে কী করে! চামারের মড়ার পাশ দিয়ে জল আনতে যাবে কে? এক বুড়ি গিয়ে পণ্ডিতমশাইকে বলে, এখনো মড়াটা ফেলাচ্ছ না যে। গায়ে কেউ জলটল খাবে-না নাকি!
এদিকে চিখুরী চামারবস্তিতে গিয়ে সবাইকে সাবধান করে দিয়ে আসে–খবরদার, মড়া আনতে কেউ যাবি না। এক্ষুনি পুলিশ আসবে, তদন্ত হবে। মজা পেয়েছ নাকি যে একটি গরিব বেচারাকে এভাবে পরানে মেরে ফেলবে। পণ্ডিতই হন আর যেই হন, সে তো নিজের কাছে। লাশ যদি তোরা আনিস তবে পুলিশ তোদেরও বেঁধে নিয়ে যাবে।
তার কথার পর-পরই পণ্ডিতমশাই গিয়ে পৌঁছান। কিন্তু চামারবস্তির কোনও লোক লাশ তুলে আনতে রাজি হয় না। শুধু দুখীর বউটা আর মেয়েটা হাহাকার করতে-করতে ছুটে যায়। পণ্ডিতমশাইয়ের বাড়ির দরজায় গিয়ে ওরা কপাল চাপড়ে-চাপড়ে ডুকরে কাঁদতে থাকে। ওদের সঙ্গে আরও পাঁচ-দশটা চামার মেয়েছেলে–কেউ কাঁদছে, কেউ-বা ওদের সান্ত্বনা দিচ্ছে। চামার বেটাছেলে নেই কেউ। পণ্ডিতমশাই চামারদের ওপরে খুব চোটপাট করেন, বোঝান, কাকুতি-মিনতি করেন, কিন্তু চামারদের সবার মনে পুলিশের ভয় এতটা ছড়িয়ে পড়েছে যে, একজনও রাজি হয় না। শেষ পর্যন্ত হতাশ হয়ে উনি ফিরে আসেন।
চার
মাঝরাত পর্যন্ত কান্নাকাটি চলে। ব্রাহ্মণ দেবতাদের পক্ষে ঘুমোনো মুশকিল হয়ে পড়ে। লাশ নিয়ে যেতে কোনও চামারই আসে না। এদিকে বামুনরাই-বা চামারের মড়া ছোঁবে কী করে। এমন কথাও কি কোনো শাস্ত্ৰ-পুরাণে লেখা আছে? কই, দেখিয়ে দিক তো কেউ!
পণ্ডিতগিন্নী গজর-গজর করেন–এই ডাইনিগুলো তো মাথা খেয়ে ফেললে। এগুলোর গলাও ব্যথা করে না!
