দুর্গা লজ্জায় মরতে মরতে একেবারে মরে যায়। দাঁতে দাঁত চেপে নিজেকে সামলে নিয়ে সে দৃষ্টিটা মাটিতে বিঁধিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। একবার তার ইচ্ছা হয়, এক মগ চালের আশা ছেড়ে দিয়ে পালিয়ে যায়। কিন্তু পরক্ষণেই ভাবে, নন্দ সন্ধ্যার সময় শান্ত, ক্লান্ত হয়ে বাড়ি ফিরে কী খাবে? তার বড়-ভালো-মানুষ নন্দ তার জন্য প্রত্যেকদিন কয়েক ঘণ্টা ওভারটাইম করে। আর এখন তো দোকানের কাছেই এসে গেছে। কোনোরকমে এক ঘণ্টা, আধ ঘণ্টা কেটে গেলে তো সে চাল নিয়েই বাড়ি ফিরে যেতে পারবে। কিন্তু পেটে এত বেদনা হচ্ছে কেন? আর, কোন মানুষ যেন চিৎকার করছে! ব্যথায় ঘেমে নেয়ে ওঠে দুর্গা। মাথাটা আবার ঘুরতে থাকে। পেটের মধ্যে ব্যথার ঢেউ উঠছে, জোয়ার-ভাটা চলছে। মনে হচ্ছে, কোন শত্রু যেন বারবার বর্শা দিয়ে আক্রমণ করছে। একটি আঘাতের জখম সেরে উঠতে না- উঠতেই আবার আঘাত করছে। দিন কি পুরো হয়ে গেল? এতদিন থেকে সে যে দিনটির অপেক্ষা করছে, সেই দিনটি কি এসে গেল? না, তা কী করে হয়! সবেমাত্র তিন দিন হল, দাই বলেছে, এখনো দশ-পনেরো দিন বাকি আছে। এটা হয়তো অন্য কোনো বেদনা।
ব্যথা আর কষ্টের মধ্যে দুর্গা কেমন করে জানি পুরো লাইনের সঙ্গে সঙ্গে আপনা থেকেই দোকানের দরজা পর্যন্ত এসে পৌঁছয়। এখন শুধুমাত্র একটি স্ত্রীলোক রয়েছে তার সামনে। এই স্ত্রীলোকটিও যখন দোকানের ভেতরে চলে যায়, তখন দুর্গা দেখে, তাকে ও সিঁড়ি ভেঙে ভেতরে ঢুকতে হবে। এক ফুট উঁচু উঁচু দুটো ধাপ তার কাছে মনে হয়, তাদের গাঁয়ের সেই মন্দিরের টিলার মতো, যার উপরে পৌঁছতে হলে একশোর ওপর ধাপ পার হয়ে উঠতে হয়। ভগবান! এই নড়বড়ে কাঠের সিঁড়ি দিয়ে সে কী করে যাবে?
তার সামনের স্ত্রীলোকটি থলেয় এক মগ চাল নিয়ে স্মিতমুখে ঘাম মুছতে মুছতে দোকান থেকে বেরিয়ে আসে। পেছনের স্ত্রীলোকটি দুর্গাকে ধাক্কা দিয়ে বলে, যাও বাপু, যাও। ঘুমোচ্ছ নাকি?
দোকানদারও তার দিকে তাকিয়ে বলে, এস গো, দেরি করছ কেন?– কিন্তু সে দেখে না যে, দুর্গার মুখটা কেমন ফ্যাকাসে হয়ে যাচ্ছে। সিঁড়ি ভাঙবার কথা মনে আসতেই তার পা দুটি থরথর করে কাঁপছে।
: আমাকে… আমাকে… আমাকে এখান থেকেই দিয়ে দাও, ভাই।– দুর্গার ঠোঁট দুটি শুকিয়ে গেছে। কথাও বের হয় কষ্টে।
: তোমার এত গুমর কিসের? নিতে যদি হয়, ভেতরে এসে নাও!
: যাচ্ছ-না কেন?
: না-নিতে হলে রাস্তা ছেড়ে দিয়ে অন্য লোককে আসতে দাও!
প্রতি পদক্ষেপে দুর্গার মনে হয়, সে মাথা ঘুরে পড়ে যাবে। কিন্তু নিজের দেহটাকে কোনোরকমে টেনেহিঁচড়ে দোকানের মধ্যে পৌঁছে দেয় সে; তারপর কম্পিত হাতে থলেটা দোকানদারের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে দামটা সামনে রেখে দেয়। পয়সাগুলো চারঘণ্টা ধরে তার হাতের মুঠোয় থেকে থেকে ঘামে ভিজে গেছে। দোকানদার মাপের মগ উঠিয়ে চাল ভরে দুর্গার থলেয় ঢেলে দেয়। তারপর দুর্গার মনে হয়, মোটা দোকানদারটি যেন আপনা-আপনিই ঘুরছে। মাপের মগটাও। চালের থলেও। গোটা দোকানটা ঘুরছে। ঘুরতে ঘুরতে গোটা দোকান– চালের বস্তা, ঘিয়ের পিঁপে, দেয়ালে টাঙানো হনুমানজির ছবি– দুর্গার গায়ে ধাক্কা খায়। সে তীব্র আর্তনাদ করে ওঠে।
তারপর দুর্গার মনে হয়, সে যেন চালের স্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছে। তার দম বন্ধ হয়ে আসছে। কিন্তু তার গাঁয়ের উপর থেকে চাল আপনা-আপনিই সরে যায়। হনুমানজি সেই চাল মাপের মগে ভরে ভরে সমস্ত স্ত্রীলোককে বিতরণ করছে– এই নাও এক মগ চাল, এই নাও এক মগ চাল। আনন্দে হনুমানজির লেজটা নামছে। কিন্তু লেজ তো নয়। এ তো সাপ। দুর্গাকে যে গাল দিয়েছিল, সাপটির মুখখানা সেই স্ত্রীলোকটির মুখের মতো। নিশ্বাস টেনে টেনে সাপটি ফুলছে আর বাড়ছে। তারপর দোকান থেকে বেরিয়ে এঁকেবেঁকে গলির মোড় পর্যন্ত গিয়ে পৌঁছয়। ফোঁস ফোঁস করতে করতে এবার সে দুর্গার দিকে এগিয়ে আসতে থাকে। যে-কোনো মুহূর্তে দুর্গাকে গিলে ফেলবে সে। সাপ নিশ্বাস টানে, দুর্গা ছিটকে তার পেটের মধ্যে চলে যায়।
কিন্তু এটা সাপের পেট নয়, অন্ধকার ঘর। অন্ধকার এবং গরম। বাতাস স্তব্ধ। দুর্গার দম বন্ধ হয়ে আসে। অন্ধকার গহন থেকে কার যেন কণ্ঠস্বর শোনা যায়, ‘এটা হিন্দুস্তান, হিন্দুস্তান।’ অন্ধকারের মধ্যেই আবার দূর থেকে দুটি লাল আলো ঝলমল করতে থাকে। দুর্গার মনে হয়, কোনো সাপের চোখ জ্বলছে। কিন্তু কাছে এলে দেখে, দুটি লাল পতাকা। ঝাণ্ডা দুটি আপনা-আপনিই হাওয়ায় উড়ছে। এবার চারদিক আলোকিত হয়ে যায়। সহস্র সহস্র, লক্ষ লক্ষ শ্রমিক অদ্ভুত ধরনের কী এক ভাষায় গান গাইতে গাইতে এগিয়ে চলেছে। একটি কুয়োর ভেতর থেকে আওয়াজ ভেসে আসে। তারপর হঠাৎ মেঘ ঘনিয়ে আসে এবং বিদ্যুৎ চমকাতে থাকে। দূর থেকে মেঘ গর্জনের আওয়াজ আসে। কিন্তু না, মেঘের গর্জন তো নয়, কামান চলেছে, গোলাবর্ষণ হচ্ছে। যেরকম দুর্গা একদিন সিনেমায় দেখেছিল। একটা বোমা একেবারে তার পাশে এসে পড়ে, টুকরো টুকরো হয়ে বাতাসে উড়ে যায়।
এবার দুর্গার মনে হয়, সে উলঙ্গ হয়ে পড়ে রয়েছে। একেবারে উলঙ্গ। লজ্জায় সে লুটিয়ে পড়ে। কিন্তু উঠে দাঁড়াবার আগেই একটা ভীষণাকার দৈত্য এসে করাত দিয়ে তার পেট চিরতে শুরু করে। ভালো করে দেখবার পর কিন্তু দুর্গার বিস্ময়ের সীমা থাকে না। এ স্বয়ং তার স্বামী নন্দ। উচ্ছলভাবে সে দুর্গার পেট কাটছে, আর বলছে, ছেলে চাই না, ছেলেমেয়ের দরকার নেই আমার।
